কারামুক্তির পর আনোয়ার ইব্রাহিম
কারামুক্তির পর আনোয়ার ইব্রাহিম

মালয়েশিয়ার রাজনীতির নায়ক-মহানায়ক

আহমেদ বায়েজীদ

একটি নির্বাচন, একটি বিজয় কিন্তু সেই নির্বাচন জন্ম দিলো অনেকগুলো ঘটনার। দীর্ঘ ১৫ বছর পর মালয়েশিয়ায় আবার ফিরল মাহাথির যুগ। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করলেন ডা: মাহাথির মোহাম্মদ। অবসান হলো বারিসন ন্যাশনাল দলের দীর্ঘ ছয় দশকের শাসন। মিত্র থেকে শত্রুতে পরিণত হওয়া মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিম আবার বৈরিতা ভুলে এসেছেন পাশাপাশি মঞ্চে। রাজ ক্ষমায় মুক্তি পেয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর জানিয়েছিলেন রাজার সাথে আনোয়ারের মুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুতই তিনি মুক্তি পাবেন। মুক্তি পাওয়ার পর এখন দুই নেতা কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যান তা দেখার বিষয়।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে মাহাথির নায়ক হলে আনোয়ার মহানায়ক। কারণ দেশের মানুষের চোখ আসলে আনোয়ার ইব্রাহিমের দিকে। আগামী দুই বছরের মধ্যে মাহাথির সরে যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন আনোয়ার ইব্রাহিম। যিনি এক সময় ছিলেন মাহাথিরের উপপ্রধানমন্ত্রী। এই সময়ে উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন তার স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল । একাধিক মন্ত্রী থাকবেন তার দল পিপলস জাস্টিস পার্টি থেকে। আনোয়ার ইব্রাহিমের দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য কোনো তাড়াহুড়ো নেই। মাহাথিরের ওপর তাদের আস্থা আছে।
সব কিছু মিলিয়ে এবারের নির্বাচনটি মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচন। ৯২ বছরের মাহাথির কি পারবেন আবার পুরনো ছন্দে ফিরতে? প্রায় দেড় দশকের অনিয়ম আর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে মালয়েশিয়াকে সেই পুরনো উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির গতি ফেরাতে? পারবেন কি না সেটি বলতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু দিন, আপাতত এটুকু বলা যায় যে, এই কাজে হাত দিতে হলে এক সময়ের সফল শাসক মাহাথির মোহাম্মদকে জিততে হবে ঘরে-বাইরে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জে।
নির্বাচনের আগে অনেকেরই কল্পনার বাইরে ছিল মাহাথির মোহাম্মদের জোটের এই বিশাল বিজয়। বিরোধী দলের সাথে যোগ দিয়ে নিজের পুরনো দলÑ যারা স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতায়Ñ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ জানানোর বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কঠিন শুধুই নয়, অনেকের কাছেই অসম্ভবও মনে হতে পারে। তবে মাহাথির মোহাম্মদের জাদুকরী অতীত আর পাকাতান হারাপানের (অ্যালায়েন্স অব হোপ) সাংগঠনিক কার্যক্রম ছিল এই জয়ের মূল কারিগর। ২০১৫ সালে এই জোট গঠিত হওয়ার পরই মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কারাবন্দী সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অবর্তমানে তার স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল পাকাতান জোটকে নেতৃত্ব দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলে দেন। এই জোটই প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক দল বারিসন ন্যাশনালের শাসনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
ষাট দশক ধরে একচেটিয়াভাবে দেশ শাসন করা দলটির আধিপত্য হুমকির মুখে পড়ে পাকাতানের উত্থানে। এমন পরিস্থিতিতে সেই জোটের সাথে মাহাথির মোহাম্মদের যোগদান আরো বেগবান করে দলটির প্রতি মালয়েশিয়াদের সমর্থন। ক্ষমতাসীন দলের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলাও ছিল এর অন্যতম কারণ।
মাহাথির মোহাম্মদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেশটির অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছরে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও দেশটি ডুবে গেছে ঋণের মধ্যে। নাজিব রাজাকের শাসন আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এই জায়গা থেকে দেশটিকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি মাহাথির মোহাম্মদ দিয়েছিলেন নির্বাচনী প্রচারণায়। পাকাতান হারাপান জোটের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহীদের একই পদে দুই বারের অধিক নির্বাচন বন্ধ করা, প্রধানমন্ত্রীর দফতরের বাজেট অর্ধেকে নামিয়ে আনা, নির্বাচন কমিশনকে পার্লামেন্টের অধীনে আনা, গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (জিটিএস) সংস্কার, বিরোধী দলের নেতার সাংবিধানিক মর্যাদা বাড়ান, আগামী তিন বছর উন্নয়ন বাজেটের অর্ধেক দরিদ্র ৫ অঞ্চলে ব্যয় করা, বিদেশীদের বরাদ্দ দেয়া বড় বড় প্রকল্পের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত করা; দুর্নীতির তথ্যদাতাদের জন্য আইনি শূরা বাড়ানো প্রভৃতি।
এ ছাড়া ছিল তথ্য স্বাধীনতা আইন কার্যকর করা, আগামী এক দশকের মধ্যে মালয়েশিয়াকে শীর্ষ দশ ‘কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেশে অন্তর্ভুক্ত করা, ন্যূনতম মজুরি ৫০ শতাংশ বাড়ানো, স্বল্প ব্যবহারকারীদের জন্য পেট্রলে ভর্তুকি, তেল উত্তোলনকারী রাজ্যগুলোর পেট্রোলিয়াম রয়্যালটি ২০ শতাংশে উন্নীত করা, রিঙ্গিতের মুদ্রা মান তিন বছরের মধ্যে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
তবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হবে গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস (জিটিএস) ট্যাক্স তুলে দেয়া। ১০০ দিনের মধ্যেই এ ট্যাক্সটি তুলে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। ২০১৫ সালে এ ট্যাক্সটি দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেয় নাজিব রাজাকের সরকার। সে সময় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এ ট্যাক্সের বিরুদ্ধে, এখন মালয়েশিয়ানরা যেকোনো কিছুর আগে এই ট্যাক্স প্রত্যাহার চান। তাই মাহাথির মোহাম্মদের এই ট্যাক্স বাতিলের অঙ্গীকারকে তারা লুফে নিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ট্যাক্স বাতিল করা সহজ হবে না নতুন সরকারের জন্য। কারণ অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এতে। জিটিএস ট্যাক্স তুলে দিলে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে দেশটির অর্থনীতিতে গতিশীল রাখতেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে মাহাথিরকে। সিঙ্গাপুরে ইনস্টিটিউশন ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের মালয়েশিয়ান প্রোগ্রামের সমন্বয়ক ফ্রান্সিস হাচিনসন বলেন, ‘জিটিএস ট্যাক্স নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে সরকার জনপ্রিয়তা পেলেও এটা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এতে মালয়েশিয়ার রিস্ক রেটিং বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।’ তবে অভিজ্ঞ মাহাথির তো এসব জেনেই আবার রাজনীতিতে এসেছেন। নাজিব যুগ থেকে দেশকে উত্তরণে কী কী সমস্যায় পড়তে হবে সেই রূপরেখা তার সামনেই ছিল।
নতুন শাসক দলের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হবে জোটের মধ্যে সমন্বয় করা। চারটি দলের মধ্যে ইতোমধ্যেই দু-একটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতবিরোধের আভাস পাওয়া গেছে। একদলীয় রাজনীতিতে অভ্যস্ত; আরো স্পষ্ট করে বললে একক নেতৃত্বে ২২ বছর দেশ শাসন করেছেন মাহাথির। তাই এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়নি অতীতে। তাই এবার ঘর সামলানোর দায়িত্বও নিতে হবে তাকে। আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, যে আনোয়ার ইব্রাহিমকে এগারোটি বছর কারাগারে রেখেছেন তার সাথে আবার তাকে একসাথে কাজ করতে হবে। নির্বাচনে জেতার পর এক ইন্টারভিউতে এ নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিমের মেয়ে নুরুল ইজ্জাজ আনোয়ার বলেছেন, ‘চাইলেও সব কিছু ভুলতে পারব না। আমার ছোট বোন এগারো বছর বয়স থেকেই বাবাকে কারাগারে দেখছে। আমার মেয়ে জন্মের পর থেকেই শুনছে তার নানা কারাগারে। তাই এ তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো চাইলেও আমরা ভুলতে পারব না।’
তাই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা থেকে শত্রুতে পরিণত হওয়া এই দ্ইু নেতার নতুন রাজনৈতিক রসায়ন কেমন হবে সেটিও মালয়েশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.