নাক ডাকা কেদার

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

আমার সহপাঠী কেদার। হাইস্কুলে থাকাকালীন দেখেছি কেদার খুব বাচাল টাইপের ছিল। কলেজে আসার পর এই বাচাল ছেলেটির আচরণে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন হয়ে গেল। ভুঁড়ি অসাধারণভাবে বেড়ে গেলো। চোখের পাওয়ারের অবনতি হলো। হাই পাওয়ার চমশা পরে রাস্তায় বের হয়। আগের মতো আর কথা বলে না। কাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে বসে ঝিমায়। আরো একটা দিকে কেদারের অভিনব পরিবর্তন হয়ে গেল, তাহলো নাক ডাকা। কাস থেকে স্যার চলে যাওয়ার পর সবাই যখন এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করে কেদার তখন বেঞ্চে মাথা রেখে ঘুমায় আর নাকের গুড়গুড় শব্দ বেহালার সুরের মতো রিদম তুলে। কেউ তার ঘুম কিংবা নাক ডাকা নিয়ে কোনো কথা বললে কেদার রাগে অগ্নিমূর্তি হয়ে ওঠে। বলে, ‘আমার ঘুম নিয়ে তোদের এত মাথা ব্যথা কেন!’
একদিন কাদের স্যার কাস নিচ্ছেন। ওদিকে লাস্ট বেঞ্চে কেদারের অনবরত নাক ডাকা শুরু হয়ে গেল। কাদের স্যার পড়ানো বন্ধ করে ঝিম মারলেন। তিনি কান খাড়া করে শুনছেন নাক ডাকার গুড়গুড় শব্দ। বললেন, ‘এমন মধুর সুরে ভায়োলিন বাজায় কে রে?’
আমরা সবাই মুখ চেপে ধরে হাসতে লাগলাম। কাদের স্যার মুখ গম্ভীর করে বললেন, ‘এই মুহূর্তে তবলা হলে তো ভালোই আসর জমত!’
চাপা হাসি অচিরেই অট্টহাসিতে রূপ নিলো। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এত সোরগোলও কেদারের নাক ডাকা ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি। সে নাক ডেকে চলেছে অবিরাম। অবশেষে কাদের স্যারের বেতের গুঁতায় কেদারের ঘুম ভাঙলো। কেদার চোখ কচলাতে কচলাতে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ালো। স্যার বললেন, ‘কান ধরে দশবার উঠবোস কর, নতুবা তোর রাজকীয় ঘুম ছাড়বে না। আরে বেটা, তোর নামের সাথে আমার নামেরও তো যথেষ্ট মিল আছে। তোর সঙ্গে আরেক দিক দিয়ে আমার মিল আছে তা হলো তুইও ঘুমাস আমিও ঘুমাই, কিন্তু তোর মতো আমি নাক ডাকি না।’
কেদারের ভাবলেশহীন জবাব, ‘এটা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য স্যার! আমার দাদার কাছ থেকে পেয়েছে বাবা, আমার বাবার কাছ থেকে পৈতৃক সূত্রে এই গুণাবলি আমি পেয়েছি স্যার।’
কাসে আবার অট্টহাসির সৃষ্টি হলো।

চৌধুরী স্যার আমাদের কলেজের মধ্যে সবচেয়ে রাগী স্যার। চৌধুরী স্যারের রাগ দেখে অনেকে প্যান্টে প্রাকৃতিক কাজ সেরেছেÑ এমন কথা আমাদের বড় ভাইদের মুখে অনেক শুনেছি। তো চৌধুরী স্যার অঙ্ক কাস নিচ্ছেন। সবাই খুব গুরুত্ব দিয়ে খাতায় অঙ্ক উঠাচ্ছে। কাসের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ পেছন থেকে শুরু হয়ে গেলো কেদারের জোরসে নাক ডাকা। আমরা সবাই ভয়ে মরছি, ‘খাইছেরে! আজ কেদারের বারোটা বেজে গেছে!’
স্যার অঙ্ক কষা বন্ধ করলেন। আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। নাকটা বড় বড় করে স্ফীত করে বললেন, ‘কিসের শব্দ আসছেরে?’
কেউ টুঁ শব্দটিও করছে না। চুপচাপ, সুনসান নীরবতা। শুধু পিছন থেকে কেদারের নাক ডাকার গুড়গুড় শব্দ ভেসে আসছে। নীরবতায় তার নাক ডাকার শব্দ আরো চাঙ্গা হলো। চৌধুরী স্যার টেবিলে কনুই দিয়ে ভর করে দাঁড়ালেন। মিটমিট করে তাকালেন আমাদের দিকে। বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘বোকা চণ্ডির দল, কে এমন অদ্ভুত শব্দটা করছিস রে?’
কেউ একজন মাথা বেঞ্চের নিচে নিয়ে ফিস করে বলে ফেললো, ‘স্যার কাসে ব্যাঙ ঢুকেছে।’
স্যারের চোখ কপালে উঠাল। ‘কী, কাসে ব্যাঙ ঢুকল কোত্থেকে? দাঁড়া, ব্যাঙের ওস্তাদও আমায় দেখে ভয় পায়। আর এখন ব্যাঙ কাসে ঢুকে গেল। এত বড় সাহস ওই ব্যাঙের! ব্যাঙও শিক্ষিত হতে চায়? ব্যাঙের শিক্ষিত হওয়ার সাধ আমি মিটিয়ে দিচ্ছি’
বলেই স্যার সাঁ সাঁ করে পেছন দিকে চলে গেল। কান ধরে কেদারকে দাঁড় করালেন। এতক্ষণে কেদারের অর্ধেক ঘুম মনে হয় ভেঙেছে। স্যার বললেন, ‘এই, তুই কোথায় আছিস বলতো শুনি?’
‘স্যার, আমি এখন ট্রেনে আছি!’
‘ট্রেনে করছিসটা কি শুনি?’
‘স্যার, ঢাকায় যাচ্ছিলাম!’
‘ঢাকায় যাচ্ছিলাম? তার মানে, দিবা স্বপ্ন দেখছিলি, তাই না?’ বলেই চৌধুরী স্যার পটাস পটাস করে কেদারের পশ্চাদ দেশে দুই-তিন ঘা বসিয়ে দিলো যেন দুই-তিনটা পটাস ফুটল আরকি!
আমরা সবাই জিহ্বায় কামড় দিয়ে বসে রইলাম। কেদার এবার বানর লাফানো লাফাচ্ছে। কেদারের মহিষ মার্কা ভুঁড়ি নিয়ে অভিনব কায়দায় লাফানোর দৃশ্য দেখে আমরা হাসি ধরে রাখতে পারলাম না। কেউ ফিক ফিক করে হাসছে। কেউ হাসতে হাসতে সামনে পেছনে দোলছে। আর মেয়েরা একমুখে দু’হাত দিয়ে ধরে হাসছে, যাতে ছেলেরা আবার তাদের মুক্তা ঝরানো হাসি কিংবা হলুদ ময়লা যুক্ত দাঁত দেখতে না পারে। কোনো কোনো মেয়েরা আবার হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। হাসতে হাসতে সবারই বেতাল অবস্থা। স্যার, এমন বেতাল হাসির মুহূর্তে বেত উঁচিয়ে দিলেন এক রাম ধমক, ‘খামোশ! এখানে এক মক্কেল কাঁদছে, আর তোরা সবাই দাঁতে তা লাগিয়ে হাসছিস।’
স্যারের হঠাৎ এমন গর্জনে কাসে আবার নীরবতা। শুধু কেদারের ঠোঁট বাঁকানো কান্নার শুব্দ বাকি রইলো। স্যার, আবারো নাক ফুলিয়ে কেদারকে বললেন, ‘কাসে এভাবে নাক ডেকে ঘুমানোর অভ্যাসটা কোত্থেকে শিখলে শুনি?’
কেদার কান্নার রেশ রেখে বলল, ‘আমার বাবার কাছ থেকে!’
‘বাবার কাছ থেকে?’ উত্তেজিত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন স্যার।
‘স্যার, আমার বাবাও কাসে নাক ডেকে ঘুমাতো।’
‘আগামীকাল তোর বাবাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবে। কথাটা মনে থাকে যেন।’
কেদার ‘হ্যাঁ’ বোধক মাথা নাড়ালো।

পরের দিন চৌধুরী স্যারের কাসের সময় কেদারের বাবা এসে উপস্থিত। চৌধুরী স্যার যথাযথ সম্মান দেখিয়ে কেদারের বাবাকে বললেন, ‘ভাই, আপনার ছেলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাই আপনাকে ডাকা। তো সামনের বেঞ্চে একটু বসুন। কাস শেষে আপনার সঙ্গে কথা বলি।’
‘না, সামনের বেঞ্চে নয় আমি বরং ছেলের সাথে পেছনের বেঞ্চেই বসি।’
কাস চলছে। মিনিট পনেরো যেতে-না-যেতেই পেছন থেকে গুড়গুড় শব্দ শোনা গেলো। আমরা একবার পেছনের দিকে আরেকবার স্যারের দিকে তাকাই। দুই বাপবেটা পাল্লা দিয়ে নাক ডাকছে। কাসের সবাই মুখ চেপে হাসছে। কারো কারো মুখ ফসকে ফিক করে হাসির শব্দ বেরিয়ে আসছে। এই ফিক ফিক শব্দ শুনে হাসির মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। চৌধুরী স্যার নাক বড় বড় করলেন। মুখে ভেংচি কাটলেন। বললেন, ‘এই’। স্যার হয়তো আমাদের ধমক দিবেন ভেবে সবাই হাত দিয়ে আবার মুখ চেপে ধরলাম এবং স্যারের মুখের দিকে তাকালাম। চৌধুরী স্যার বললেন, ‘ওরে, কেউ একটা তবলা আনার ব্যবস্থা করো।’
চৌধুরী স্যারের এমন রসিকতাপূর্ণ কথায় সবাই মুক্তভাবে হাসার সুযোগ পেল। কাসে হাসির ঢেউ খেলে যাচ্ছে। চৌধুরী স্যার কেদারের বাবার সামনে গিয়ে ডাকলেন, ‘এই যে ভাই, এই যে ভাই শুনতে পাচ্ছেন?’
লাফ দিয়ে উঠলেন কেদারের বাবা।
‘মশাই আপনিও দেখছি ছেলের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন। তাহলে ছেলের দোষ কী?’
‘বহু দিনের অভ্যাস ত্যাগ করি কী করে মাস্টার সাব।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.