কর্তৃত্বশালীরা আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ

ড. এম উমর চাপরা


একটি ভালো-সরকার গঠনের জন্য ইসলামের নিজস্ব শক্তিশালী রূপরেখা রয়েছে। ওই রূপরেখার প্রথম কথা হচ্ছেÑ সরকার আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। কেননা, আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন চূড়ান্ত অর্থে একমাত্র স্বাধীন-সার্বভৌম সত্তা; যিনি যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে মানুষের আচার-আচরণের রূপরেখা তথা আইন প্রণয়ন করেছেন। তার মানে হলো, সরকারের কর্তৃত্ব হচ্ছে সীমিত এবং কিছুতেই নিরঙ্কুশ নয়। সুতরাং, প্রথমেই সরকারকে ইসলামি শরিয়তের বিধান মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনীয় সম্পদের দক্ষ ও সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণ সাধনের জন্য সরকারকে ব্রতী হতে হবে।
রাসূল সা: বলেছেনÑ তোমাদের প্রত্যেকে এক একজন রাখালের মতো, যাকে তার অধীনস্থদের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
যাকে জনগণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সে যদি তা বিশ্বস্ততার সাথে পালন না করে তবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
শেষ বিচারের দিন আল্লাহর নিকটতম এবং প্রিয় ব্যক্তি হবেন ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং হতভাগ্য জালেম শাসক আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, শাসকদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে। কেননা, সরকার হচ্ছে একটি ট্রাস্ট মাত্র। এই ট্রাস্ট আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং জনগণের পক্ষ থেকেও। জনগণ তাদের এই ট্রাস্ট পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে থাকেন, যারা জনগণের প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থাপনা করে থাকে। রাসূল সা: এই ধারণাটি পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করেছেন আবু জার গিফারী রা:-এর কাছে, যখন তিনি সরকারি উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছেন। রাসূল সা: বলেনÑ হে আবু যার; এই পদ হচ্ছে একটি ট্রাস্ট, কিন্তু তুমি দুর্বল। শেষ বিচারের দিন এটা দুর্ভাগ্যের কারণ হবে না তার জন্য; যে যোগ্যতাবলে ওই পদ অর্জন করবে এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। অতএব, যেখানে সরকার ট্রাস্টের গণ্ডির মধ্যে থেকে সফলতা কিংবা বিফলতার জন্য আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সেখানে ওই সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে ট্রাস্টের আলোকে জনগণের আশা-আকক্সক্ষা পূরণ করতে।
মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের সমালোচনা ও পরামর্শ ছাড়া সরকার জনগণের আশা-আকাক্সা পূরণের জন্য কাক্সিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। সুতরাং, রাসূল সা: এই বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এই বলে, মুসলিম বিশ্বাসের একটি প্রয়োজনীয় দিক হচ্ছেÑ তাদের শাসককে পরামর্শ প্রদান করা, এমন পরমার্শ; যা তাদের শাসককে যথাযথ দায়িত্ব পালনে সহায়তা করতে পারে।
কিন্তু জনগণের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা যদি না থাকে এবং সরকারি নীতির আলোচনা এবং সমালোচনা যদি জনগণ মুক্ত কণ্ঠে করতে না পারে তাহলে কিভাবে জনগণ সরকারকে বস্তুনিষ্ঠ পরামর্শ প্রদান করবে। শাসকেরা যদি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে বা করা উচিত বলে মনে না করেন এবং সরকারি নীতি সম্পর্কে জনগণের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে অনীহা দেখান তাহলে সংস্কার কার্যক্রমের আওতা মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে। এমন একটি ধারণা প্রকাশ পেয়েছিল প্রথম খলিফা হিসেবে হজরত আবুবকর রা:-এর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের সময় প্রদত্ত বক্তব্য থেকে। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমি ঠিকভাবে কাজ করি তবে আপনারা আমাকে সহায়তা করবেন কিন্তু যদি আমি ভুল করি তবে আপনারা আমাকে সংশোধন করে সঠিক পথে পরিচালিত হতে সহায়তা করবেন।’
হজরত আবুবকর রা:-এর উপরোল্লিখিত নীতিনির্ধারণী বক্তব্য একটি জনগণ নন্দিত সরকারের সাধারণ ধ্যান-ধারণা হওয়া উচিত। এটি শুধু ব্যক্তি আবুবকর (রা:)-এর নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে পরিগণিত হওয়া উচিত নয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা:-এর সময়কার একটি বাস্তব ঘটনা থেকেও আবুবকর রা:-এর উপরিউক্ত বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার হজরত ওমর রা:-এর সমালোচনা করা থেকে এক ব্যক্তিকে বিরত করার জন্য জনৈক ব্যক্তি চেষ্টা চালালে হজরত ওমর রা: ওই ব্যক্তিকে তার সমালোচনা চালিয়ে যেতে বললেন এই বলে যে, ‘তাদের (জনগণের) মধ্যে কোনো ভালো জিনিস থাকতে পারে না, যদি তারা সমালোচনা না করে, এবং আমাদের মধ্যে কোনো ভালো জিনিস থাকতে পারে না, যদি আমরা তাদের সমালোচনা না শুনি।’
খলিফা (ইসলামি সরকার প্রধান) সম্বন্ধে সাধারণ লোকের সমালোচনা করার এবং খলিফা কর্তৃক সে সমালোচনা গ্রহণ করার উপরিউক্ত দৃষ্টান্ত ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার। তাই সহজে এ কথা বলা যেতে পারে, জনগণের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে তাদের অধিকার এবং নেতাদের দায়িত্ব হচ্ছে সমালোচনা শুনার উন্মুখ থাকা। এটাই ছিল মুসলিম রাজনৈতিক পদ্ধতির অপরিহার্য অঙ্গ। বস্তুত, এই ট্রেডিশন ধর্মীয়ভাবে উদ্বুদ্ধ খেলাফত পদ্ধতির সরকার-পরবর্তী যুগ পর্যন্তও চালু ছিল, সে যুগে সরকারগুলো প্রথমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চাইতো বটে, তবে তাদের কর্মকাণ্ডে পার্থিব চাওয়া-পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার তৃতীয় শর্ত হচ্ছেÑ পরামর্শ করার জন্য একটি সাধারণ পরিবেশ, যার কথা আল কুরআনে রয়েছে। শাসকরা পারস্পরিক পরামর্শ করে মুসলমানদের সব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে ধর্মীয় আদেশে বলা হয়েছে। অতএব জনগণের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে পরামর্শ করে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি শুধু সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর আর রইল না বরং এ বিষয়টি ইসলামি রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হিসেবে অনুসৃত হতো বলে ১৪০০ শতাব্দীজুড়ে ধর্মীয় পণ্ডিতদের রচিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, যে বিষয়ে বর্তমানের আধুনিক পণ্ডিতরাও গুরুত্বারোপ করছেন।
ইসলামে স্বৈরাচার বা একনায়কতন্ত্রের কোনো ভিত্তি নেই। শেখ মোহাম্মদ আবদুহুর মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে শেখ রশীদ রিদা উল্লেখ করেন, একজন ব্যক্তির চেয়ে একটি দল ভুল করা থেকে দূরে থাকে। উম্মাহর জন্য এটা বড় বিপদ হবে; যদি সে তার সব বিষয় একজন ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেয়। ইসলামে বর্ণিত শূরা বা পরামর্শ সভা লোক দেখান কোনো বিষয় নয়; যেখানে শাসকরা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরমার্শসভাকে রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
আসলে যেটা দরকার তা হলোÑ জনকল্যাণমূলক সব নীতির বিষয়ে দ্বিধাহীন এবং মুক্ত আলোচনার জন্য ইসলামি শরিয়তের কাঠামোর মধ্যে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যার নির্বাহীরা গৃহীত নীতিসমূহ আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করবেন। পরামর্শসভা নামক প্রতিষ্ঠানটির দাবি হচ্ছেÑ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ডে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ। জনগণের ওই অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষভাবে কিংবা তাদের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে পরোক্ষভাবেও হতে পারে। উম্মাহর জন্য কোন পদ্ধতি ভালো হবে, তা দেশ-কাল-পাত্রভেদে আপেক্ষিক।
একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পদ্ধতির চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ আইনের চোখে সবাই সমান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ। কুরআনে বলা হয়েছেÑ যখন তোমরা জনগণের মধ্যে বিচার কর, তখন ন্যায়বিচার করবে। ইসলামি শরিয়তের আইন সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ ও অবস্থান নির্বিশেষে সবার প্রতি সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এর ব্যতিক্রম কিছু হলে তা হবে অবিচার এবং জুলুম। শেখ মোহাম্মদ আবদুহুর ঠিকই বলেছেন যে, জুলুম হচ্ছে জঘন্য অন্যায়। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক, খলিফা আবুবকর রা: তার উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে দুর্বল লোকটি আমার দৃষ্টিতে সবল, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার অধিকার ফিরিযে দিতে পেরেছি। সবল লোকটি আমারে দৃষ্টিতে দুর্বল যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছ থেকে অন্যের অধিকার কেড়ে নিতে পেরেছি। অতএব, বুঝা যায়Ñ সরকারের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করা, দুর্বল-গরিবকে সাহায্য করা ও তাদের অধিকার সমুন্নত রাখা।
অনুবাদ : ড. মাহমুদ আহমদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.