সাহিত্যের অনুভূতি অনুভূতির সাহিত্য

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

সাহিত্য জীবনের অনুষঙ্গ। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই কান্নার যে সুর তোলে তার মধ্যেও সাহিত্য লুকিয়ে থাকে। সাহিত্য ছড়িয়ে আছে অবুঝ শিশুটির আনমনা হাসির মধ্যেও। হাত-পায়ের নড়াচড়া, অঙ্কুরিত চোখের মিটিমিটি চাহনি এবং অবলিলায় বেরিয়ে আসা আধোবোলের মধ্যেও ছড়িয়ে থাকে সাহিত্য। তাইতো একটি অবুঝ শিশুর সাথেও আমারা খেলা করি। মজা করে গল্প করি। নানা ধরনের কথা বলি। গান গাই। ছড়া-কবিতা আওড়াই। হাততালি দেই। নাম ধরে ডাকি। নানা সম্বন্ধের অভিধায় আহ্বান করি। আমার দাদুমণি, আব্বাজান, আম্মাজান নানা সম্বন্ধ। এমনকি আদুরে ভাষায় ডাকতে গিয়ে শব্দগুলোকে কোমল বানিয়ে ফেলি। উচ্চারণেও শিশুসুলভ ভাবভঙ্গি প্রকাশ করে থাকি। একজন পরিপূর্ণ মানুষও শিশুটির সাথে শিশু বনে যাই। শিশুর সাথে নিমগ্ন হয়ে খেয়াল করি না যে আমি কোন ধরনের ভাষা বলছি কিংবা শব্দ উচ্চারণ করছি। একটু দূরে অবস্থানকারী কোনো মানুষ শিশুর সাথে দেয়া আমার সংলাপে হেসে কুটি কুটি হচ্ছেন। অথচ আমি শিশু-সংলাপে ভীষণ মজা পাচ্ছি।
শিশুটি কথা বলতে শেখেনি। বুঝতেও শেখেনি। কিন্তু গল্প-কথা, গান কিংবা ছড়া-কবিতা আওড়ানোর সাথে সাথে খিকখিক করে হেসে উঠছে। হাততালির দেয়ার সাথে সাথে মজা পাচ্ছে। নানা রকমের দুষ্টুমিসুলভ অঙ্গভঙ্গির সময় নিজেকে মজায় মজায় লুটিয়ে নিচ্ছে। এমনকি ঠোঁট দুটো ভাঁজ করে গল্পের অভিনয় করে শিশুটি। শব্দও করে ওঠে। হাত-পা নাড়িয়ে মজার অনুভূতি জানান দেয়। এ সবই তো সাহিত্য। কেননা সাহিত্যের মধ্যে শুধু শব্দ-কথাই থাকে না, থাকে অনুভূতি প্রকাশের অনন্য শিহরণ। সাহিত্যের পরতে পরতে বয়ে যায় ঠাণ্ডা হাওয়া। শব্দে শব্দে ধরা দেয় আলোর কণা। চোখের তারায় ছড়িয়ে দেয় সবুজ স্বপ্ন। অবারিত ফসলের মাঠ। দমকা হাওয়ার দোল। কখনো মিঠে পানির নদী-পুকুরের আলতো পরশ অথবা সাগরের বিশাল ঢেউ এনে দেয় সাহিত্য।
শুধু অবুঝ শিশুটি নয়, জীবনের প্রতিটি পর্ব, প্রতিটি অঙ্গ-ইশারা এবং চরম আনন্দ কিংবা কষ্টের বহিঃপ্রকাশের মধ্যে সাহিত্যের নীরব কিংবা সরব বসবাস। ছোটবড় নানা বয়সী মানুষের স্বপ্নকথার ফুলঝুরিতেও সাহিত্যের বসবাস। কৃষকের হালচাষ। গরুর সাথে গল্পকথা। লাঙল টানার আদেশ নিষেধ, দিকনির্দেশনা। লাঙলের মুঠো ধরে হাতের পান্টি দিয়ে ভয় দেখানো। আদর সোহাগের ভাষায় লাঙল টানতে উপদেশ দেয়া। মুখের শব্দে চুটকি ফোটানো। সব কিছুর মধ্যেই সাহিত্যের বুনন। সাহিত্যে সরব উপস্থিতি। রাখাল গরু নিয়ে যায় মাঠে। কথা বলে গরুর সাথে। গান গায়। গরুকে উপদেশ দেয়। আদর করে। কখনো বা চোখ রাঙিয়ে তাড়তে যায়। রাগত ভাষায় গালি দেয়। এর মধ্যেও সাহিত্য অবস্থান করে পরিপূর্ণ অবয়বে।
শিশুটি ভাষা জানে না। তবুও সে হাসে। গল্পকারীর সাথে উ আ শব্দে গল্প করে। হাত নাড়িয়ে অভিনয় করে। শিশু এবং শিশুর সাথী হিসেবে থাকা মানুষটিও ভীষণ মজা পান। দু’জনের মধ্যে অদৃশ্য পৃথিবী তৈরি হয়। সে পৃথিবীতে শুধু তারাই রাজা। তাদের মধ্যে আর কেউ থাকে না। থাকে না বয়সের পার্থক্য কিংবা অন্য কোনো দেয়াল। তাইতো তারা দু’জনেই তৃপ্তি পান। এখানে তৃপ্তির অদৃশ্য শক্তিটাই সাহিত্য। শিশুর সাথে সঙ্গদানকারী একজন সাহিত্যিক।
চাষির হালচাষ কিংবা রাখালের গরু-ছাগল চরানোর সময় পশুদের সাথে যে গল্পকথা কিংবা দিকনির্দেশনা প্রদান অথবা রাগ-অনুরাগ, আদর সোহাগের যে দৃশ্য চিত্রায়িত হয়Ñ এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মজার সাহিত্য। গরু কথা বলতে পারে না। চাষি কিংবা রাখালের কথা ওরা বোঝে সেটাও বলতে পারে না পশুরা। তবুও তাদের মধ্যে কথা হয়। হয় সার্বক্ষণিক লেন দেন। গরুর কোনো কষ্ট হলেই চাষি কিংবা রাখালের কাছে সে তা ব্যক্ত করে। রাখাল কিংবা চাষিও বোঝে তার কষ্ট। অথচ কারো কোন ভাষা কেউ জানে না; বা বলতে পারে না। এর মধ্যেই সাহিত্যের প্রাণচিত্র। চাষি এবং রাখাল দু’জনেই সার্থক সাহিত্যিক।
শিশু-অভিভাবক বা শিশুর সাথী, কৃষক এবং রাখাল সবাই একেকজন কবি। প্রত্যেকেই অভিনেতা। প্রত্যেকেই সাহিত্যিক। তারা প্রত্যেককেই একেকটি সফল বলয়ের নির্মাতা। তারা অবুঝ শিশুকেও বুঝমান করেন। গরুকেও মানুষ বানিয়ে ফেলেন। এখানে যতটা ভাষার কারিশমা তার চেয়েও বড় কারিশমা অনুভূতির। যিনি যতটা অনুভূতির মিষ্টতা ছড়াতে পারেন তিনি যতটা সফল শিশুবন্ধু। যিনি যতটা ভালো অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারেন তিনি ততো ভালো চাষি, ভালো রাখাল। অনুভূতির কারিশমা ছড়ানোর মধ্যেই তাদের সার্থকতা। তাদের পূর্ণতা।
প্রত্যেক লেখকই শিশুবন্ধু। প্রত্যেক সাহিত্যিকই চাষি। রাখালের ভূমিকায় প্রত্যেক কবিই। তিনি বাকহীন মানুষের কণ্ঠেও কথা ফোটান। গোমড়ামুখো মানুষের মুখে হাসি ফোটান। স্বপ্নহীন চোখে সবুজ স্বপ্নের বিপ্লব ঘটান। হাতাশার আঁধারে আলোর প্রভাত আনেন। তার সামনে থাকে না কোনো শিশু। তার সামনে থাকে না গরু-ছাগল। তার হাতে থাকে না লাঙলের মুঠো কিংবা পান্টি। তবু তিনি কথা বলাতে পারেন। শিশুকে হাসাতে পারেন। নির্দেশনা দিতে পারেন অবলা প্রাণীকেও। ঢেউ খেলাতে ফসলের মাঠ না থাকলেও তিনি ভ্রমণ করেন সে মাঠে। অন্যকেও ভ্রমণ করিয়ে নেন।
কিন্তু কিভাবে? অদৃশ্য বিষয়কে তিনি কিভাবে দৃশ্যমান করবেন? কোন জাদুমন্ত্র? অলৌকিক কোনো কারিশমা? না এসব কিছুই না। মূল কারিশমা অনুভূতির। তিনি অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করেন। জন্ম দেন অনুভূতির সজীব বৃক্ষ। হাতে কলম এবং সামনে খাতা থাকলেও তিনি ঘুরে বেড়ান অনুভূতির মাঠে। তিনি খেলেন অবোধ শিশুর সাথে। অভিনয় করেন চাষির। খেলেন লাঙল নিয়ে গরুর সাথে। তিনি বনে যান রাখাল। খেলেন পশুদের সাথে। তবে এ খেলা অনুভূতি দিয়ে। এ খেলার বহিঃপ্রকাশ শব্দের মাধ্যমে। চোখের তারায় স্বপ্নের দৃশ্যপট। হৃদয় ক্যানভাসে সজীব অনুভূতি। হাতে কলম-খাতা। এই তো কবি। এই তো সাহিত্যিক। এই তো নাট্যকার। এখানে যার অনুভূতি যতো সজীব, যত বেশি গাঢ়, যত বেশি প্রাণবন্ত, যত বেশি ধারালো তিনি তত বেশি এগিয়ে। শব্দের কারিশমা, উপমার সজীবতা এবং প্রাণবন্ত কাহিনীর ¯্রষ্টা হিসেবে তিনি হবেন তত বেশি সফল সাহিত্যিক।
অনুভূতিগুলো হবে সাহিত্যের জন্য। সাহিত্যের বিষয়, সাহিত্যের আঙ্গিক এবং মূল্যবোধের অনুভূতি। হাইপোথিসিসি বা লক্ষ্যবস্তু শব্দটিকে গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হলেও সাহিত্যেরও হাইপোথিসিস থাকে। হাইপোথিসিসটিও যুক্ত হয় অনুভূতি শব্দের সাথে। অনুভূতির বিষয়বস্তু যেমন হবে হাইপোথিসিস তেমনই হবে। তাই এর সাথে দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গটিও যুক্ত হয় অবলীলায়। শিল্পের জন্য শিল্প নাকি শিল্প জীবনের জন্য। বিনোদনের জন্য সাহিত্য নাকি সাহিত্যের জন্য বিনোদন? কিংবা বিনোদনশিল্পের জন্য সাহিত্য নাকি সাহিত্যশিল্প জীবনের জন্য। বিশ্বাসী মানুষেরা নির্দ্বিধায় ঘোষণা করে যে, শিল্প-সাহিত্য জীবনের জন্য। জীবনের গতিময়তা নির্মাণে সাহিত্য ভূমিকা রাখে। সাহিত্য জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তুকেও গুরুত্ব দেয়। মানবজীবনের শেষ মঞ্জিলের দিকেও দিকনির্দেশনা দেয় সাহিত্য। তাইতো সাহিত্যিকের অনুভূতি একটি জরুরি বিষয়। অনুভূতি সজীব ও তীক্ষè না হলে সৃজিত সাহিত্য যেমন জীবনের জন্য হবে না তেমনি সাহিত্যও শিল্প হয়ে উঠবে না। সাহিত্য যেমন জীবনের জন্য তেমনি জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যকেও হতে হবে শিল্পসম্মত। শিল্পসম্মত সাহিত্য নির্মাণে চাই স্বচ্ছ অনুভূতি এবং শিল্পসম্মত প্রাণশক্তি। তাহলেই সজীব হবে সাহিত্যের অনুভূতি। সাহিত্যের অনুভূতি সঠিক হলে নির্মিত হবে অনুভূতির সাহিত্য। আর অনুভূতির সাহিত্য মানেই জীবনের সাহিত্য। সজীব ও প্রাণবন্ত সাহিত্য। হ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.