জোছনার আলো ছায়া

হাসান হুদা

যমুনার তীর ঘেঁষে সাজানো গোছানো সুবাসপুর গ্রাম। নদীর তীরে গ্রামটি গড়ে ওঠেনি। বছর বছর নদী ভেঙে গ্রামের কাছে এসেছে। পরপর দুটি বেড়িবাঁধ দিয়ে নদী থেকে গ্রামটিকে আলাদা করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কাঁচা রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি বিভিন্ন ধরনের গাছের মনোরম দৃশ্য। সাপের লেজের মতো এঁকে বেঁকে মেঠোপথ চলে গেছে সুবাসপুরের বুকচিরে জেলা শহরে। মোরগ ডাকা সকাল থেকে শুরু হয় সবার ব্যস্ততা। কৃষকেরা ক্ষেতে যায়। কেউ আবর লাঙ্গল কাঁধে গরুজোড়া নিয়ে যায় জমিতে হালচাষ করতে। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে যায় স্কুলে। দুই একজন অফিস করতে যায় সদর শহরে। সৃষ্টিকর্তার দক্ষ হাতে নিপুণ মনে আঁকা ছবি সুবাসপুর।
সুবাসপুর হাইস্কুলের দুবলা ঘাস বিছানো মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে বসে আছি। রাতের পাখিগুলো কিচিরমিচির করে উঠল আরেকবার।
নানাজানের কাঁসার থালার মতো চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে নিরন্তর। জোছনার আলোয় গাছের নীরব পাতাগুলো চকচক করছে। রাত তার প্রকৃত রূপের ডালা খুলে উসলায়ে পড়ছে সুবাসপুর গ্রামের বুকের ওপর। গলে পড়া রূপের আলো আজলা দিয়ে ধরে ধরে গায়ে মাখছি সযতনে।
এক ঝাপটা দমকা বাতাস চুমু দিয়ে গেল পরম ভালোবাসায়। দেহের বাঁকে বাঁকে শির শির আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। মনটা উদাস উদাস লাগছে। এই সময় কোকিলের কহু কহু ডাক শুনতে মন চায়। উড়ন্ত শাদা বকের ঝাঁক দেখতে ইচ্ছে করে। উড়ে যেতে মন চায় নীল আকাশে। বাতাসে ভর দিয়ে মেঘের সাথে গল্প করতে মন চায়। কিন্তু সেটা অবাস্তব। অবাস্তব কোন কিছু জীবনের সহ-সঙ্গ হতে পারে না।
রাতের একটা আলাদা ঘ্রাণ আছ। সে ঘ্রাণ কেমন তা বলা যায় না তবে অনুভব করা যায়। সেই গন্ধ হৃদয়ে মাঝে ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে দেয়। স্মৃতির জানালা খুলে দেয়।
মাথায় নানা ভাবনার জটলা উঁকি দেয়। ভাবনাগুলো স্বাধীন। শাদা বকের ডানার মতো। কখনো শঙ্খ চিল হয়ে নীল আকাশ ভেদ করে উড়ে চলে মেঘের ওপারে। আবার হঠাৎ মানুষের মনের দোলনায় দোল খায় জেদি প্রেয়সীর মতো। ভাবনার হাত পা নাই তবুও মাথায় এসে চুলকায়। নাড়া দেয় মনের জানালায়।
আজ কেমন যেন মাকে বেশি দেখতে ইচ্ছে করছে। এখন যদি দেখতে পেতাম। খুব যে বেশি ভালো লাগত তা না, তবে ভালো লাগত। মায়ের চেহারা ভাসা ভাসা মনে পড়ে। ছোট বেলায় যখন গান গাইতাম তখন মা শব্দ করে হাসত। কারণ, গানের লিরিক ভুল বলতাম। বেসুরে গলায় নাকি চিল্লাতাম। সেই হাসির শব্দ আজ বেশি কানে বাজছে। সেই গলে পড়া হাসি চোখে ভাসছে কিন্তু মায়ের চেহারা ছায়ার মতো মনে ভাসে।
মা যখন নানা বাড়ি আসত আমি তখন বাবার সাথে বগুড়ায় থাকতাম। ভাবতাম, মা এবার
এলে আমাকে দেখা দেবে। আমাকে সংবাদ দেবে। আমাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হবে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। আদর করবে। বলবে, ‘রিয়ন চলে আয়। কত দিন তোকে দেখি না’। হয়তো মনু মামা এসে বলবে,
Ñচল রিয়ন। বড় বুবু এসেছে।
আমি বলবÑমা কখন এসেছে।
মনু মামা বলবেÑরাতে এসেছে। বুবু কী বলল জানিস?
বলবÑআমি কী করে জানব মামা?
মামা তখন বলবেÑ বুবু এসেই তোকে দেখার জন্য ছটফট করছে। আমাকে বলল, ‘কাল সকালে গিয়ে রিয়নকে নিয়ে আসবি। ওর জন্য অনেক ধরনের চকলেট এনেছি।’ তাই আমি এসেছি। চল তাড়াতাড়ি যাই। বুবু অপেক্ষা করছে। তুই গেলে তারপর সকালের নাশতা করবে।
আমি পাখি হয়ে উড়ে যাব। অভিমানে গাল ফুলে থাকবে। বলব, তোমার সাথে আড়ি। তখন মা ¯েœহমাখা হাসি দিয়ে বুকে টেনে নেবে। বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কাঁদব। বলব, তুমি পচা, আমাকে ভুলে গেছো। আমাকে আর আদর করো না। আমি যে তোমার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদি। অসুস্থ হলে তোমার সেবা পাই না। মাথায় কেউ হাত বুলিয়ে দেয় না। তখন শুধু নীরবে কাঁদি। স্কুল থেকে এসে মা বলে ডাকতে পারি না। ক্ষুধা পেলে নানী খাবার দেয় কিন্তু তুমি খাওয়ানোর মতো না। বৃষ্টিতে ভিজলে কেউ নিষেধ করে না। কারেন্ট চলে গেলে কেউ বাতাস করে না। রাতে শোবার সময় তোমাকে না পেয়ে মন হু হু করে কেঁদে ওঠে মা।
ওখানে তুমি অনেক ভালো আছো, তাই না মা? তোমার ওই মেয়েটা আমার থেকে ভালো। তাই তো আমাকে আর মনে পড়ে না তোমার। তোমার গা থেকে ভেসে আসা মা মা গন্ধ খুব ভালো লাগে মা। স্কুল ভালো লাগে না, খেলা ভালো লাগে না। ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে না। বাবা অনেক আদর করে। ঘুমানোর আগে গল্প শোনায়। আমার সাথে খেলে। তবুও তোমার ¯েœহের মতো নয়। এখানে আমার আর কিছু ভালো লাগে না। তুমি আমাকে সাথে নিয়ে চলো মা।
কিন্তু এই ভাবনাগুলো স্বপ্নই রয়ে গেল। মা আমাকে আর দেখা দিল না। ইচ্ছে করলেই মা আমাকে দেখা দিতে পারত। হয়তো সেই ইচ্ছা আমার জন্য বরাদ্দ নেই। চোখের আড়াল হলে মনেরও আড়াল হয়।

বসন্তের প্রথম বৃহস্পতিবার বিকেলে মা বাবার মধ্যে ডিভোর্স হয়। এটা ছিল আমার জন্মের আঠারোতম দিনে। আমাকে নিয়ে যখন সারা বাড়িজুড়ে আনন্দের ঢেউ তখন ছড়িয়ে পড়ল সম্পর্কের বিচ্ছেদের সুর। এটা আরো আগে হওয়ার কথা ছিল কিন্তু নানার অনুরোধে থেমে ছিল। নানা ভেবেছিলেন, আমার জন্মের পর মা বাবার মধ্যে সম্পর্ক ঠিক হবে। হয়তো আমর মুখপানে চেয়ে দুজনের জেদ কমে যাবে। ভেঙে যাবে ভুল। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গলে তরল হয়ে যাবে দুজনের অভিমানের বরফের পাহাড়। তা আর হলো না।
মা বাবার সম্মতিতে ডিভোর্স হয়। ডিভোর্সের পরের দিন বাবা নানা বাড়ি থেকে চলে যায়। নানা বাবাকে বলেছিলেন, ‘তুমি আর কয়েকটা দিন থেকে যাও।’
কিন্তু বাবা এই প্রথম নানার কথা অমান্য করে চলে যায়। আর কোনো দিন আসেনি এই বাড়িতে। নানীর মৃত্যুর দিন এসেছিলেন। তবে সুবাসপুর হাইস্কুল মাঠে জানাজায় শরিক হয়েছিলেন। তারপর গোরস্থান থেকে সোজা বগুড়ায় চলে গেছেন।
সময়ের ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে গেল জীবনের আরো সময়। ভারী হতে লাগল স্মৃতির গুদাম। বেড়েই চলল মনের একাকিত্ব। দুঃখের জানালা খুলে খুলে ঝরে পড়ছে হৃদয় বাগানের ফুলের কলি। শুকনো পাপড়িরা মর্মর সুরের মূর্ছনায় নিষ্পেতি হয় স্বার্থের পায়ের তলায়। এভাবে কেটে গেল কয়েক বছর।
যেদিন মাকে বিয়ে করে নিয় গেল লোকটি তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কাঁদছিল। সেই কান্না ছিল হৃদয় ভাঙা করুণ আর্তনাদ। মা বলেছিল, ‘ভালো থাকিস। মাঝে মাঝে তোকে দেখতে আসব।’
আমি সেই লোকটার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। মা আমার কপালে চুমু দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়ি চলে গেল মাকে নিয়ে। গাড়ির শাঁ শাঁ শব্দ কানে বাজছে বজ্রপাতের মতো। গাড়ির হর্ন বিচ্ছেদের সুর হয়ে ভাসে আমার মনের আকাশে। গাড়ির চাকা আমার কচি বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল নতুন দিগন্তে।
সেদিন অনেক কেঁদেছি। ঘুমাতে পারিনি কয়েক রাত। সেদিনই শেষ দেখা। মাকে আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি। মনু মামার মাধ্যমে বাবা আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন।
বাবার ছবিটাও মনে পড়ে। পৌরুষদীপ্ত চেহারা। দৃঢ়সিদ্ধান্তের লোক। বাবা সরকারি আযিযুল হক কলেজের সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
কলেজের সামনে জামিলনগর জানে সাবা হাউজিং সোসাইটিতে দুইতলা বাড়িতে থাকেন। অবশ্য নিচের তলা ভাড়া দেয়া আছে।
তখন ওখানেই থাকতাম। মাঝে মাঝে বাবা আমাকে তার কলেজে নিয়ে যেতেন। বাবা যখন কাস নিতেন তখন পাশের ডিপার্টমেন্টের বরান্দা দিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। সারি সারি সুন্দর ভবন। ভবনের সামনে ফুলবাগান। বিশাল খেলার মাঠ। অনেক শিক্ষার্থী। ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়ে মেলার মতো গম গম করে কলেজের পরিবেশ।
এক দিন বাবাকে বললাম, আমি কবে তোমার কলেজে পড়ব বাবা?
বাবা বললেন, ‘তোর এখানে পড়া হবে না।’
বাবার কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। মুখ গোমরা করে বললাম, কেন হবে না? আমি এখানে পড়ব। আমি এই বড় কলেজেই পড়ব।
বাবা তখন বললেনÑ মন খারাপ করলি রিয়ন? আরে তুই তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বি। তোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে। পিএইচডি করবি। অনেক বড় হতে হবে তোকে। আমার ইচ্ছে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার।
বাবা আরো কিছু বলতে চাইছিলেন। কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললাম,
বাবা পিএইচডি কী?
পিএইচ ডি হলো কোন বিষয়ে গবেষণা করা। জ্ঞানী হওয়া।
বাহ্! আমি গবেষক হবো। কী মজা।
সেদিন বাবার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেয়েছিলাম। আর কিছু না বুঝলেও ‘গবেষক’ যে বড় কিছু সেটা বুঝতাম।

কলেজ ক্যাম্পাসে অনেক লোকের ভিড়। দু-একজন ছাড়া সবাই হলুদ কাপড় পড়েছে। চারদিকে রঙ বেরঙের ঝলক। লেকের দক্ষিণ পাশে রক্তচূড়া গাছের নিচে মঞ্চ সাজানো হয়েছে। বসন্তবরণ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করবে কলেজ সাংস্কৃতিক সংসদ।
বাবা আমাকে দর্শক সারিতে রেখে মঞ্চে গেলেন বিশেষ অতিথির আসনে। আমি বাবার স্টুডেন্টদের সাথে বসে আছি। কেউ চকলেট এনে দিলো। কেউ দিলো আইসক্রিম। কেউ গাল টিপে দিচ্ছে। এক আপু আমাকে কোলে তুলে নিলো। কয়েকজন বান্ধবীসহ বসে আছে। আমার সাথে দুষ্টমিতে মেতে ওঠে সবাই। আপু বলল,
Ñতুমি কিসে পড়?
Ñকাস ফোরে পড়ি।
Ñকোন স্কুলে পড়ো?
Ñআর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে।

Ñরিয়ন, তুমি কিউট বয়। হ্যান্ডসাম। আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। আমাকে বিয়ে করবে।
তখন আমি বললাম, তুমি পিইচডি গবেষক হও তখন বিয়ে করব। এই কথা বলার সাথেই সবাই উচ্চস্বরে হাসতে লাগল।

বাবার সাথে বিকালে খোকন পার্কে ঘুরে বেড়াতাম। সাইকেল চালানো বাবাই শিখিয়েছিল। নতুন নতুন শার্ট প্যান্ট কিনে দিতেন। আর বলতেন, ‘রিয়ন তোকে স্মার্টবয় হতে হবে।’
মনু মামা আমাকে নিয়ে আসা করতেন। সুবাসপুর গ্রামে ফাগুন মাসের প্রথম বুধবার বড় মেলা বসে। ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য মেলা। সুবাসপুর ঐতিহাসিক গ্রাম। এই মেলার নেপথ্যে মজার ইতিহাস আছে।
মেলায় হরেক রকম খেলনার দোকান। হাতের চুড়ি, নাক ফুল, কানের দুল, লেস ফিতার দোকান। সস্তা কসমেটিকের দোকান। জিলাপি মুড়ি মুড়কি আর মিষ্টির দোকান। লাঠি খেলা। পাতা খেলা। মোটরসাইকেল খেলা। জাদু খেলা। সার্কাস খেলা। আমি মৃত্যুকূপ মোটরসাইকেল খেলা বেশি দেখতাম।
মেলার পশ্চিম পাশে ডেকোরেটরের কাপড় দিয়ে প্যান্ডেল করা হয়। সেখানে ভিসিআর দেখায় সুবাসপুর খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে। সিনেমা দেখায়, নাটক দেখায় আর গান। টিকিট পাঁচ টাকা। মনু মামা সেই মেলা উপলক্ষে আমাকে নিয়ে এলেন। তারপর কেটে গেল জীবনের দুই দশক। মন ও পরিবেশতান্ত্রিক জটিলতায় বাবার কাছে আর ফিরে যাওয়া হয়নি।
বাবা বিয়ে করলেন। একই কলেজের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক।
মনু মামার থেকে শুনেছি, বাবার নতুন বউ আমার মায়ের ভার্সিটির বান্ধবী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একই হলে থাকত। মার সাথে নানার বাড়িতে এসেছে কয়েকবার। মার বিয়েতে এসেছিল। ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হলে যা হয়। মা অবশ্য সমাজবিজ্ঞানে পড়েছেন। মা এখন একটি এনজিওর নারী ও শিশু পুনর্বাসন সোসাইটির ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন।
বাবাকে ইচ্ছে করলেই দেখতে পারি কিন্তু সেই ইচ্ছাটা হয় না। ইচ্ছা করার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ইচ্ছেকে সফল করতে সাড়া দেয়নি মন। বাবার আশা পূরণ করতে পারিনি। তবে অন্য ছেলেমেয়ে সেই আশা পূরণ করেছে। ছেলেটি পিইচডি গবষেক। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। আর মেয়ে শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ডাক্তার।

নানী মারা যাওয়ার পর গাইবান্ধায় গেলাম বড় মামার কাছে। গফুর মামা একটি ওষুধ কোম্পানির মেডিক্যাল ইনফরমেশন অফিসার। সহজ কথায় ওষুধ সেল করে। দিনের সত্তর ভাগ বাইরে থাকলেও আমার প্রতি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। মামি কখনো তার সন্তানদের থেকে আমাকে আলাদা করে দেখেননি। মাঝে মধ্যে ইংরেজি বুঝিয়ে দিতেন। কিন্তু গণিত নিয়মিত করাতেন।
এসএসসি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করলেও ইন্টারমিডিয়েটে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় পড়লাম। আশা ছিল গণিতে অর্নাস মাস্টার্স করব। তার পরে ভাবলাম কার্ডিওলজিস্ট হবো। হার্ট নিয়ে গবেষণা করব। মেডিক্যাল কলেজে পড়াব। এইচএসসি ভর্তি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে সুযোগ হলো সরকারি নাজির আখতার কলেজে। ভর্তি হলাম। কøাস করলাম তিন মাস। সব প্রাইভেট পড়া বাদ দিয়ে বাণিজ্য শাখায় বিভাগ পরিবর্তন করলাম।
বাণিজ্য বিভাগের মোস্তাফিজুর রহমান স্যারের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লাম। তাকে দেখলেই মুগ্ধ হই। ভালো লাগে। কয়েক দিন কাস করলাম। তার পড়ানো এবং ব্যবহারে প্রভাবিত হলাম। তারপর পদার্থবিজ্ঞানের সরণ দূরত্ব কম্পাঙ্ক, রসায়নের রস ছেড়ে দিয়ে ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আর হিসাববিজ্ঞান পড়া শুরু করলাম। হিসাববিজ্ঞানের লেনদেন, জাবেদা, রেওয়ামিল, খতিয়ান ও চূড়ান্ত হিসাব সহজে মিলাতে পারছি। মা বাবার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আলাদা আত্মমর্যাদা এবং আত্মদাম্ভিকতার কারণে আমার জীবনের হিসাব মেলাতে পারিনি। জোছনার আলোছায়ার মতো জীবন নিয়ে আমার অনিশ্চিত পথচলা। সজোরে দেয়ালে ছুড়ে ফেলা গ্লাসের মতো চুরমার হয়ে গেছে এই জীবন। বিচূর্ণ আয়নায় দেখি জীবনের প্রতিচ্ছায়া।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.