বাংলাভাষার সৌন্দর্য বিকাশ ও বিশ্বায়ন

মনোজিৎকুমার দাস

পৃথিবীর কোনো জাতিগোষ্ঠীর ভাষাই এক দিনে জন্ম হয়ে বর্তমান অবস্থায় আসেনি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বাঙালি ও তার ভাষা বাংলা ক্রমবিবর্তনের ধারায় এক হাজারের বেশি সময় ধরে নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। বাংলা ভাষা বিশ্বে আজ একটি সুপরিচিত ভাষা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ জাতিসঙ্ঘের ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে ১৯৯৯ সালে। বর্তমানে বিশ্বের দুই শতাধিক রাষ্ট্রে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্রকৃতপে অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়েও বিশ্ব দরবারে বাংলাভাষা অবস্থান আজ সুসংহত হয়েছে। আর এ ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনের জন্য আত্মত্যাগ করে বিশ্ববরণীয় হয়ে আছেন বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষাশহীদেরা।
বাংলা ভাষা বিশ্বে আজ একটি সুপরিচিত ভাষা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ছয় হাজার ৯০০ ভাষার মধ্যে এর অবস্থান পঞ্চম। কেননা, জনসংখ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী সারা বিশ্বে বাঙালি জনসংখ্যা এখন প্রায় ২৭ কোটির কাছাকাছি। বাংলা বাংলাদেশের প্রধানতম ভাষা। এশিয়া মহাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা। পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা রাজ্যের বেশির ভাগই বাঙালি। দণি এশিয়ার এই দু’টি দেশের জাতীয় সঙ্গীত, ভারতের জাতীয় স্ত্রোত্রও বাঙালি কবির বাংলা ভাষায় রচিত। কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠে আবেগে ভালোবাসায় যা উচ্চারিত হয় প্রতিদিন।
হাজার বছরেরও আগে আজকের বাংলা ভাষা শুনতে আজকের মতো ছিল না, বর্ণমালাও কিন্তু এরকম ছিল না। শত শত বছর ধরে পরিবর্তিত হতে হতে আজকে বাংলা ভাষা বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধশালী হয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো, প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সত্তার প্রধান বাহক হলো তার মুখে বলার ভাষা। দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া মুখে বলা ভাষাই একসময় লেখ্য রূপ নেয়। বাঙালি জাতির মুখের ভাষা হলো বাংলা ভাষা। আদিতে বাঙালির মুখের ভাষার লেখ্যরূপ ছিল সাধু ভাষায়, যা একসময় চলিত বা চলতি লেখ্য রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এর বাইরে প্রমিত ভাষার চলিত রূপের পাশাপাশি প্রচলিত অঞ্চলবিশেষের জনগোষ্ঠী কর্তৃক ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে, আজ তার মৌখিক রূপ থেকে বাংলা সাহিত্যে লেখ্যরূপের মর্যাদা লাভ করেছে।
উনিশ শতকে বাংলা গদ্যের প্রসারকালে সাধু ভাষার দু’টি রূপ দেখা গিয়েছিল : বিদ্যাসাগরী ও বঙ্কিমী। প্রথমটিতে খ্যাত ছিলেন বাংলা গদ্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর ভাষা বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দবহুল, যাতে অসংস্কৃত শব্দ পরিহারের প্রয়াস দেখা যায়।
বিদ্যাসাগরের লেখা বেতালপঞ্চবিংশতি থেকে সাধু ভাষার লেখ্যরূপের উদাহরণ এমন : ‘এই পরম রমণীয় স্থানে কিয়ৎণ সঞ্চরণ করিয়া, রাজকুমার অশ্ব হইতে অবতীর্ণ হইলেন এবং সমীপবর্তী বকুলবৃরে স্কন্ধে অশ্ববন্ধন ও সরোবরে অবগাহনপূর্বক, স্নান করিলেন; অনন্তর, অনতিদূরবর্তী দেবাদিদেব মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশপূর্বক দর্শন, পূজা ও প্রণাম করিয়া কিয়ৎণ পরে বহির্গত হইলেন।’
অন্য দিকে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে সাধু ভাষার লেখ্যরূপ এমন : ‘অনেক দিন আনন্দোত্থিত সঙ্গীত শুনি নাই, অনেক দিন আনন্দ অনুভব করি নাই। যৌবনে যখন পৃথিবী সুন্দর ছিল, যখন প্রতি পুষ্পে পুষ্পে সুগন্ধ পাইতাম, প্রতি পত্রমর্মরে মধুর শব্দ শুনিতাম, প্রতি নত্রে চিত্রা-রোহিণীর শোভা দেখিতাম, প্রতি মনুষ্য-মুখে সরলতা দেখিতাম, তখন আনন্দ ছিল। পৃথিবী এখনো তাই আছে, কিন্তু এ হৃদয় আর তাই নাই।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্প-উপন্যাসে সাধু ভাষার বহুল প্রয়োগ দেখা যায়। তিনি ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বাংলা ভাষা বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠা পায়। নদীয়ার শান্তিপুরের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা আদর্শ চলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। মূলত তাদের মুখের চলিত মুখের ভাষার আদলে লেখ্যরূপ হিসেবে গল্প-উপন্যাসের ভাষার মর্যাদা লাভ করে একসময়। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীর স্বামী সুসাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী চলিত ভাষায় গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্র লিখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আসলে নদীয়া অঞ্চলের চলিত ভাষাই কলকাতা ও কলকাতার আশপাশের অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে সমাদৃত হয়। ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় স্বতন্ত্র শ্রেণীর প্রমিত ভাষা গড়ে উঠলেও ঢাকায় তা হয়নি; এমনকি ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পরও নয়। বাংলাভাষার পুনর্জাগরণ স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং নি¤œমানের মিশ্রভাষার ‘পুঁথিসাহিত্য’ ও ‘কবিয়াল গানে’র আবির্ভাব ঘটে। এ সময় ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজিকে করা হয় রাজভাষা। উল্লেখ্য, মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষায় আরবি, ফার্সি, উর্দু, পর্তুগিজ, হিন্দিসহ অনেক বিদেশী শব্দের সমাবেশ ঘটে। আর ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষায় যোগ হয় ইংরেজি, সংস্কৃত, ফরাসি, স্পেনিশসহ বিভিন্ন ভাষার অনেক শব্দ। এতে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য বেড়ে যায়। ইংরেজ শাসনামলের প্রথম দিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাঘাত ঘটলেও পরে উন্নতি সাধিত হয়।
ইংরেজ শাসনামলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শুধু কাব্যসাহিত্য পাওয়া যায়, এ সময় বাংলা ভাষায় কোনো গদ্যসাহিত্য রচিত হয়নি।
অন্য দিকে ইংরেজ শাসনামলে বাংলা ভাষায় গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি গদ্যসাহিত্যের সূচনা হয়। যদিও এ সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়, জীবনান্দ দাশ, মীর মশাররফ হোসেন, জসীম উদ্দীন প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর কাব্যচর্চার প্রারম্ভ কালপর্বে ইংরেজি ভাষায় ‘ক্যাপটিভ লেডি’ লিখে সাফল্য লাভ করতে না পেরে একসময় বুঝতে পারেন, সমৃদ্ধশালী বাংলা ভাষাকে অবহেলা করে তিনি অনুতপ্ত, তাই তিনি লেখনÑ হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;/তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি,/... স্বপনে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে,Ñ ‘ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,/ ... বৈচিত্র্যময়, সৌন্দর্যে ঋদ্ধ বাংলা ভাষায় কাব্যচর্চা করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত একসময় তাঁর মাস্টার পিস ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যে নিজের আসন পাকাপোক্ত করলেন। পঞ্চকবির অন্যতম কবি অতুলপ্রসাদ বাংলা ভাষার গুণকীর্তন করলেন একসময় এ ভাবেÑ ‘আ মরি বাংলা ভাষা/মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা। মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা/আ মরি বাংলা ভাষা!/কি যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড়িমাঝি টানে। গেয়ে গান নাচে বাউল/গান গেয়ে ধান কাটে চাষা/আ মরি বাংলা ভাষা!.... অতুলপ্রসাদের এই গানের মধ্যে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা নিহিত আছে এ কথা নির্দ্ধিধার বলা যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বিশ্বজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর গীতাঞ্জলি ও গীতবিতানের কবিতা ও গান বাংলার ভাষার অমূল্য সম্পদ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা ও গানে বাংলা ভাষাকে ঋদ্ধ করেছেন, যা আমাদের বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা প্রতীক হিসেবে চিরন্তন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে বলা শুরু করলে নজরুলের গানকে সম্মানিত করতে হয় দুর্দান্ত শক্তির এক মাধ্যম হিসেবে। নজরুলের লেখা গান আর কবিতা ‘চল চল চল’ কিংবা ‘দুর্গমগীরি কান্তার মরু’, ‘কারার ওই লৌহকপাটের মতো জাগানিয়া সব গান। চারণ কবি মুকুন্দ দাস তাঁর গানে বাংলা ভাষাকে ঋদ্ধ করেছেন। তাঁর গান ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে’ মতো গানগুলো আজও বাংলা ভাষার অপূর্ব সম্পদ। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীতনা সংগ্রামের প্রথম পর্বের শহীদ ক্ষুদিরামের আত্মবলিদানকে স্মরণ করে বাঁকুড়ার লোক কবি পিতাম্বর দাসের ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।’ ‘একবার বিদায় দে মা/ হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী’। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তার ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানটি বাংলা ভাষার দেশাত্মবোধক গান বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের উদ্দীপনার উৎস।
বাংলা ভাষায় ক্রমবিকাশের ধারা বিশ্লেষণ করলে এমন কথা বলা যায়, বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে প্রাচীনকাল থেকেই সীমিত পরিসরে ঘটে গিয়েছে তার বিশ্বায়ন। বর্তমানেও তার বিকাশ ও বিশ্বায়ন দুটোই ঘটে চলেছে দ্রুতগতিতে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, একটি পরিপূর্ণ বিকশিত সমৃদ্ধিশালী ভাষার েেত্র বিকাশ ও বিশ্বায়নের সুযোগ থাকে কি না? এর উত্তর : সভ্যতার ক্রমবিকাশ যেমন একটি চলমান প্রক্রিয়া, তেমনি সভ্যতা সংস্কৃতির ধারক হিসেবে ভাষার ক্রমবিকাশেরও থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এখানে বিশ্বায়ন মানে বাঙালির নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার চর্চা। অন্য ভাষাভাষীর ওপর তার প্রভাব বিস্তার ও একই সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দপুঞ্জকেও ধীরে ধীরে নিজের মৌখিক কিংবা লিখিত মাতৃভাষায় আত্মস্থ করে নেয়া।
প্রাচীনকাল থেকে ভাষা বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া চলেছে এক দেশের অন্য দেশকে বিজিত করার মাধ্যমে। ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে কিংবা ধর্ম প্রচারের প্রসারতায়। মধ্য যুগের শেষ পাদে, আধুনিক যুগের আরম্ভে সেটা হয়েছিল কলোনাইজেশনের ভেতর দিয়ে। বর্তমানে আরো অনেক ভাষার মতো বাংলা ভাষার সৃজন-প্রক্রিয়াও প্রবহমান রয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের লাখ লাখ বাঙালি জনতা ইন্টারনেটে এখন প্রতিদিন পাঠ করছেন বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র। টেলিভিশন চ্যানেলে দেখছেন মাতৃভাষায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। দেশের বাইরে নিজেরা বাংলা ভাষার চর্চা করছেন প্রতিনিয়ত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংযুক্ত করছেন তাদের শিকড়ে সংস্কৃতির সঙ্গে। প্রবাস জীবনের নানা উৎসব অনুষ্ঠানে বাঙালির ঐতিহ্য, বাঙালির কৃষ্টি যেমন চর্চিত হচ্ছে, তেমনি তার প্রভাব সীমিত আকারে হলেও প্রতিফলিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশের জনগণের জীবন-মননেও।
বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধশালী বাংলা ভাষা আজ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বাংলা ভাষার আরো আরো সমৃদ্ধির সম্ভাবনা আজ স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.