গুণী বিদ্বজ্জন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

হাসান হাফিজ

নানামাত্রিক তাঁর পরিচয়। গবেষক, শিক্ষক, সম্পাদক, রেডিও-টিভির উপস্থাপক, প্রশাসক, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ প্রগতিশীল আন্দোলনে সামনের সারির নেতা। বচনে, লেখায় নিজের বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর এই মানুষটির নাম মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। গত ৯ মে ২০১৮ তিনি ৯২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। জন্ম ১৯২৭ সালের ১ মে, বগুড়ায়। পড়াশোনা করেছেন কলকাতা, ঢাকা ও লন্ডনে। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিক হিসেবে। ছাত্রাবস্থায়ই ঘটে এই যুক্ততার ঘটনা।
বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা যান ১৯৪৮ সালে। আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেহাদে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন কাজ করেছেন দৈনিক আজাদ ও পাকিস্তান অবজার্ভারে। ১৯৫১ সালে সংবাদ যখন প্রথম বেরোয়, তখন যোগ দেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। ভাষা আন্দোলনের তুঙ্গসময়ে সংবাদের তৎকালীন গণবিরোধী ভূমিকার প্রতিবাদে সংবাদ থেকে পদত্যাগ করেন ’৫২ সালের একুশের পর।
ফজলে লোহানী সম্পাদিত সামাজিক-রাজনৈতিক স্যাটায়ারধর্মী সাড়াজাগানো দুর্দান্ত মাসিকপত্র অগত্যার সাথে জড়িত ছিলেন অঙ্গাঙ্গীভাবে। অগত্যায় স্বনামে-বেনামে প্রচুর লিখেছেন। এ রকম তীক্ষè কাগজ এ দেশে অগত্যাই প্রথম এবং এখনো পর্যন্ত সর্বশেষ। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তাঁর। পাকিস্তানের উন্মেষকাল থেকে ছাত্র আন্দোলনের সাথে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্তি। ১৯৪৯ সালে একটি গণ-আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁকে দিনাজপুর জেলা থেকে বহিষ্কার করে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার।
অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন করাচি, রাজশাহী ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক পদ থেকে অবসর নেন ১৯৯২ সালে। ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের চেয়ারম্যান। ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের বহু দেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে স্বদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। উনিশ শ’ একাত্তরে ব্রিটেনে তিনি পালন করেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ব্রিটিশ জনমত সংগঠনের কাজে তিনি বিভিন্ন পত্রিকা ও সংসদ সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতেন। এ ছাড়া নানাবিধ কর্মকাণ্ডে তিনি মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের মহতী লড়াইয়ে পালন করেছেন জোরালো ভূমিকা। একাত্তরে বিবিসিতে সংবাদ পাঠ করেছেন। মুজিবনগর সরকারের তরফে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবনের অভ্যন্তরে তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা আয়োজন করেন ডাকটিকিট প্রকাশনার উৎসব। উদ্দেশ্য : সবাইকে জানানো যে, আমাদের স্বাধীন বাংলা সরকারেরও রয়েছে নিজস্ব ডাকটিকিট।
মুস্তাফা নূরউল ইসলামের প্রকাশিত গ্রন্থাবলি হচ্ছে : নজরুল ইসলাম, সমকালে নজরুল ইসলাম, সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত, আমাদের মাতৃভাষা চেতনা ও ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশ : বাঙালি আত্মপরিচয়ের সন্ধানে, আবহমান বাংলা, আমাদের বাঙালিত্বের চেতনার উদ্বোধন ও বিকাশ, সময়ের মুখ, তাহাদের কথা, শিখা সমগ্র, নির্বাচিত প্রবন্ধ, নিবেদন ইতি পূর্ব খণ্ড, নিবেদন ইতি উত্তর খণ্ড, হিমালয়ের ভয়ঙ্কর, কাউন্ট অব মন্টেক্রিস্টো, জাপানি ভূত, বেঙ্গলি মুসলিম পাবলিক ওপিনিয়ন (প্রথম গবেষণা গ্রন্থ, লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে কৃত পিএইচডি থিসিস)। ১৯৫০ সালে সম্পাদনা করেন ‘দাঙ্গার পাঁচটি গল্প’। বইটির প্রকাশক ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান।
প্রাপ্ত স্বীকৃতি, সম্মাননার মধ্যে রয়েছেÑ স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পদক, বেগম জেবুন্নেসা, কাজী মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক ইত্যাদি।
তাঁর প্রিয় লেখকের তালিকায় রয়েছেনÑ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ও হেনরি, রোমা রোঁল্যা, আলবেয়ার ক্যামু, বের্টল্ট ব্রেখ্ট্, লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, বরিস পাস্তারনাক, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, নাজিম হিকমত, বেঞ্জামিন মলয়েঁস, পাবলো নেরুদা, শিবরাম চক্রবর্তী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, মুনীর চৌধুরী, কাজী আবদুল ওদুদ এবং মোতাহের হোসেন চৌধুরী।
১৯৯১ সালে আমার সুযোগ হয়েছিল অধ্যাপক ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলামের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের। দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় ওই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালের ১ মার্চ। সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ এখানেÑ
লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আপনার কী অভিমত?
নীরব কবি এবং বিচ্ছিন্ন ভুবনের শিল্পী বলে কিছু থাকতে পারেÑ আমি বিশ্বাস করি না। যিনি লেখেন, একই সাথে অবশ্যই তিনি সামাজিক মানুষ। নিজের সত্তার সত্যকে এবং চার দিককার আপনজনকে তিনি অস্বীকার করবেন কী করে? যিনি বলেন তিনি বিবরবাসী প্রাণিবিশেষ, কিংবা গুহাবাসী কৌপীনধারী আত্মনির্বাসিত কেউ একজন।
অতএব সামাজিক বলেই, আমার দায়বদ্ধতা এবং লেখক বলে সেই দায়বদ্ধতা সমধিক। যার আপসহীন ‘কমিটমেন্ট’ নেই, তিনি প্রকৃতার্থে লেখক পদবাচ্য নন বলে বিবেচনা করি।
দেশে বর্তমানে রুচিশীল সাহিত্যপত্রিকার বড় অভাব। সাহিত্যচর্চা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দৈনিক সংবাদপত্রের সাময়িকীর ওপর। এ দুরবস্থার অবসান কিভাবে হতে পারে?
কথাটা যথার্থ। মনে করি যে, দৈনিক পত্রিকাগুলোর বেশ কয়েকটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে।
দেশে বর্তমানে রুচিশীল সাহিত্য পত্রিকার বড় অভাবÑ কেন? প্রশ্নটা নিয়ে ভাববার রয়েছে। এ ব্যাপারটা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সর্বত্রই কি এখন রুচির দুর্ভিক্ষ, হীন অবস্থা বিরাজমান নয়? এক কথায় জবাব দিতে চাই, এই অভাবের মূলে ক্রিয়াশীল চরম অর্থসঙ্কট, সামাজিক, রাজনৈতিক অঙ্গনে মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয় এবং সব মিলিয়ে সার্বিক অসহ অস্থিরতা।
এ দুরবস্থার অবসান কিভাবে, নিশ্চিত তেমন কিছু আমার জানা নেই। ইতোমধ্যে চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে, সমষ্টিগত উদ্যোগে রুচিশীল সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশনার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এবং আরো নানাবিধ কারণে শেষ পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগেও কাজ হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয়, সেসব কাজ রুটিন অনুসরণেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। আশঙ্কা হয়, আমাদের সততার, আন্তরিকতার অভাব রয়েছে এবং আমরা একটা ব্রত নিয়ে লেগে থাকতে রাজি নই। এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু করা গেলে অন্তত খানিকটা সাফল্য আসতে পারে।
আপনি একসময় ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকা সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে প্রবন্ধপত্র ‘সুন্দরম’ সম্পাদনা করছেন। পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে প্রধানত কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন?
হ্যাঁ, নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রায় এক দশক ধরে ‘পূর্বমেঘ’ বের করেছি। গত পাঁচ বছর দিন-তারিখ নির্ধারিত রেখে নিয়মিত ‘সুন্দরম’ বের করছি।
সমস্যার কথা বলছেন? প্রধান সমস্যা লেখার। আমাদের লেখকের সংখ্যা দুঃখজনকভাবে এত কম। ফলে, যাঁরা রয়েছেন তাঁদের ওপর চাপ পড়ে বড্ড বেশি। তাঁদের পক্ষে একটি ভালো লেখা তৈরি করার জন্য যথা প্রয়োজন সময়ের সঙ্কট বড় হয়ে দেখা দেয়। দ্বিতীয় সমস্যাÑ পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রটি ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এ ধরনের পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশনা বাস্তবে বহুলাংশে পৃষ্ঠপোষকতার ওপরই নির্ভরশীল।
আপনার সাম্প্রতিক সমাজভাবনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
বলতে খারাপ লাগছেÑ এটি নষ্ট সমাজ এবং আমরাই, আমাদের যারা সমাজপ্রধান ষোলো আনা অপরাধী তারা। আমি বহু জায়গায় ঘুরে বেড়াই, নানা স্তরের নানা বয়সের মানুষের সাথে মিশি। এবারে বলতে ভালো লাগছেÑ আমাদের মানুষেরা আসলেই ভালো। তারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন। অনেক সঙ্কটে, দুর্যোগে আমাদের মানুষদের দেখেছি এবং চিনেছি। যা ভাবছিÑ কাঠামোটাকে ভেঙে ফেলা দরকার। মানুষগুলোকে যদি খাঁচা থেকে মুক্তি দেয়া যেত। পচন ধরেছে মাথায়। সেটার অস্ত্রোপচার ব্যতীত বিকল্প নেই। মানুষকে মানুষের সমাজকে তো বাঁচাতে হবে।
বলা হয়, দেশে বর্তমানে সাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে মেধাবী ও পরিশ্রমী তরুণের সংখ্যা কম, এটা কেন?
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমার অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা ৩৭ বছরের। তুলনায় দেখেছি, সাম্প্রতিককালে মেধাবী, পরিশ্রমী তরুণ গবেষণায় আগ্রহী এমন সংখ্যা যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ছবিটা অন্য রকম। কেন এমন ঘটছেÑ সে দায়িত্ব তো তাদের নয়। প্রশ্ন নিজেদের করিÑ কেন তাদের আকৃষ্ট করতে পারছি না? এই প্রশ্নে আমাদের আত্মসমালোচনার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এরা গবেষণা করলেন। জ্ঞানের ভুবনে নতুন অধ্যায়ের সংযোজন করলেন। তারপর? এদের ভবিষ্যৎ?
সাম্প্রতিক তরুণেরা গদ্যচর্চার চেয়ে কবিতায় বেশি আগ্রহী। এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর দিক আপনি কিভাবে দেখছেন?
তরুণেরা তো চিরকালই কবিতায় বেশি আগ্রহীÑ গদ্যচর্চা অপেক্ষা। তাতে ক্ষতি হবে কেন? সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর দিকই বা থাকবে কেন? বরং কবিতাই মানুষকে তরুণ রাখে, তারুণ্যকে ধরে রাখে।
অপর পক্ষে, গদ্যচর্চা নিশ্চয়ই উত্তম। দেখা গেছে, গদ্যচর্চা তখনই বৃদ্ধি পায়, শেকড় প্রোথিত হয়, যখন সমাজ একটা বাঁক নেয়। সেটা কালান্তরের লগ্ন। তখন জিজ্ঞাসা বাড়ে, কৌতূহল অনুসন্ধিৎসা বাড়ে। গদ্যচর্চা সেই প্রয়োজন মেটায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যেমনটি হয়েছিল। আমাদের এই সমাজের জন্যও তার অন্যথা হওয়ার নয়। আমরা অপেক্ষায় রয়েছি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.