নবজাতক কোলে নাজিম উদ্দিন : সংগৃহীত
নবজাতক কোলে নাজিম উদ্দিন : সংগৃহীত

এবার দুই বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ গেল ঢাকা ট্রিবিউন কর্মকর্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক

তিন দিন আগে সন্তানের বাবা হয়েছেন নাজিম উদ্দিন। ঘরের নতুন অতিথিকে আদর করে কর্মস্থল ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন অফিসের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। কিন্তু সন্তানকে এই আদর যে তার শেষবারের মতো, কখনো অনুধাবন করতে পারেননি নাজিম উদ্দিন।
প্রতিদিনের মতো গতকালও রাজধানীর শ্যামপুরের বাসা থেকে মোটরসাইকেলে যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফাইওভার পাড় হচ্ছিলেন তিনি। পেছনে দু’টি বাস বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলছিল। কে কার আগে যাবে, দুই বাসের চালক এই নেশায় উন্মুখ হয়ে আছে। নাজিম উদ্দিন সাবধানেই ছুটে চলছিলেন। কিন্তু বেপরোয়া বাসের কাছে হার মানতে হলো তাকে! হঠাৎ পেছন থেকে তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয় একটি বাস। নাজিম উদ্দিন ছিটকে ফাইওভারের রাস্তায় পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে বেপরোয়া বাসটি তার বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন নাজিম। পাষণ্ড চালক বাসটি চালিয়ে চলে গেলেও বিবেকের তাড়নায় দাঁড়িয়ে গেলেন অপর দুই মোটরসাইকেল আরোহী। নাজিমকে বাঁচানোর চেষ্টায় তাকে নিয়ে ছুটে গেলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে সবই শেষ। হাসপাতালে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন নাজিম উদ্দিনকে (৩৭)।
গতকাল সকাল ৯টায় মেয়র হানিফ ফাইওভারে এভাবেই জীবনের ইতি ঘটে নাজিম উদ্দিনের। রাজধানীতে বাসচালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতার বলি হলেন নাজিম উদ্দিন। এই ঘটনায় পুলিশ শ্রাবণ পরিবহন ও মঞ্জিল পরিবহনের বাস ও চালককে আটক করেছে।
ঘটনার প্রত্যদর্শী রাসেল মাহমুদ ও নাইম ইসলাম হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানান, তারাও মোটরসাইকেলে গুলিস্তানে আসছিলেন। তাদের মোটরসাইকেলটি প্রতিযোগী বাস দু’টির পেছনে ছিল। আর নাজিমের মোটরসাইকেলটি ছিল বাস দু’টির সামনে। দু’টি বাসই বেপরোয়াভাবে চলছিল। এর মধ্যে শ্রাবণ সুপার পরিবহনের বাসটি নাজিমের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দেয়। নাজিম ছিটকে পড়লে তার বুকের ওপর দিয়েই বাসটি চলে যায়। ঘটনার পর রাসেল মোটরসাইকেল থেকে নেমে সিএনজি অটোরিকশায় করে নাজিমকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পথে তার প্রাণ ছিল। কিন্তু হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাইম বলেন, শ্রাবণ সুপার পরিবহনের বাসটি চাপা দেয়ার পর তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে গুলিস্তানের সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সে যান। সেখানে দায়িত্বে থাকা এসআই সোলায়মানকে ঘটনা জানান। এরপরই শ্রাবণ সুপার পরিবহনের চালক ওহিদুলকে আটক করেন এসআই সোলায়মান। পরে অপর বাস মঞ্জিল পরিবহনের চালকের সহকারী কামালকে আটক করা হয়।
ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিক রাব্বী রহমান জানান, নাজিম ঢাকা ট্রিবিউনের বিজ্ঞাপন বিভাগে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ছিলেন। যাত্রাবাড়ীর শ্যামপুর এলাকায় নাজিমের বাসা। তিনি তিন দিন আগেই সন্তানের বাবা হয়েছেন। তার স্ত্রী এখনো অসুস্থ। এমন পরিস্থিতিতে তারা নাজিম উদ্দিনের মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারেন। পরে তাদের অফিসের লোকজন হাসপাতালে ছুটে যান।
নাজিম উদ্দিনের কয়েকজন বন্ধু জানান, ঢাকা ট্রিবিউনে চাকরির পাশাপাশি নাজিম উদ্দিন লালমোহন ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার কালমা ইউনিয়নের বালুরচর গ্রামে। নাজিম উদ্দিনের বাবার নাম আলহাজ আনিচুল হক। পাঁচ বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে নাজিম উদ্দিন বড় ছিলেন।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আজিজুর রহমান বলেন, বাসের চাপায় বিজ্ঞাপন কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় শ্রাবণ বাসের চালক ওহিদুল ও মঞ্জিল বাসের হেলপার কামালকে থানায় রাখা হয়েছে। বাস দু’টিও জব্দ করা হয়েছে। নাজিম উদ্দিনের ভায়রা এ ঘটনায় বাদি হয়ে মামলা করেছেন।
এ দিকে গতকাল দুপুরে নাজিম উদ্দিনের লাশ দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান ভোলা তিন আসনের আওয়ামী লীগে সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মিজানুর রহমানসহ আত্মীয়স্বজনেরা হাসপাতালে যান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে নাজিমের লাশ কর্মস্থল ঢাকা ট্রিবিউন কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাজধানীর শ্যামপুরে শ্বশুরবাড়িতে নাজিমের লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেলে স্বজনেরা নাজিমের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহনের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে নাজিম উদ্দিনকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.