চীনের প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা, চিন্তিত ও  ঈর্ষাকাতর যুক্তরাষ্ট্র!
চীনের প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা, চিন্তিত ও ঈর্ষাকাতর যুক্তরাষ্ট্র!

চীনের প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা, চিন্তিত ও ঈর্ষাকাতর যুক্তরাষ্ট্র!

আলজাজিরা

চীনের প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা দেখে বেশ ঈর্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন রফতানির ক্ষেত্রে কর বাড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে একে অপরকে একের পর এক হুমকি দিয়ে আসছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা থেকে চুরি করা প্রযুক্তি দিয়ে চীন নিজেদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি চালিয়ে যাচ্ছে।

আদ্রিয়ান ব্রাউন জানান, চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি নেতিবাচকভাবেই দেখছেন। তারা এটাকে ভয়ও পাচ্ছেন।

 

ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে চীনের অভাবনীয় অগ্রগতি : উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

গত শতকের একটি বড় অংশজুড়ে আকাশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের চ্যালেঞ্জ করার মতো ছিল না অন্য কোনো শক্তি। কিন্তু সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনের অভাবিত উন্নতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সে আধিপত্য খর্ব হয়েছে অনেকখানি। চীনের মহাকাশ ও সামরিক শিল্পে দ্রুত উন্নতি, বিশেষ করে আকাশ থেকে আকাশে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে উন্নতির বিষয়টি পাশ্চাত্যের পাশাপাশি পুরো বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসার গতি পাল্টে দিয়েছে। অন্য দিকে রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদে তার বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

চীনের ১৩ লাখ কোটি ডলারের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কৌশলগত চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর ২০১৭ সালে চীনের সামরিক ব্যয় বেড়েছে পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ। অথচ একই সময় রাশিয়ার সামরিক ব্যয় কমেছিল ২০ শতাংশ।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) জানায়, গত বছর চীন এ খাতে খরচ করেছে ২২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, রাশিয়া খরচ করেছে ৬ হাজার ৬৩০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য খরচের দিক দিয়ে এখনো অনেক এগিয়ে আছে। গত বছর তারা এ খাতে ৬১ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। এ খরচের পেছনে যে হেতুটি কাজ করছে, তা হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো পুরো বিশ্বে ছড়ি ঘোরাতে চায়, কিন্তু চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং চান রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি। সেই সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে চান দক্ষিণ চীন সাগর এবং তার আশপাশের এলাকাগুলো।

মস্কোর ন্যাশনাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটির হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের সামরিক যানবাহন বিশেষজ্ঞ ভাসিলি কাসিন বলেন, রাশিয়া ও চীন অনেক দিন ধরেই এ ব্যাপারে এগিয়ে যেতে চাচ্ছিল। তাদের এ চাওয়াটা সহজ হয়ে যায়, ১৯৯০ সালে যখন মার্কিন বিমানবাহিনী বিপক্ষকে ধ্বংস করে দেয়। তিনি আরো বলেন, উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যখন ইরাকি সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয় তখন চীনের জন্য প্রথম সুযোগটা আসে। আর রাশিয়ার জন্য এ সুযোগ আসে ১৯৯৯-এ, যখন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী সার্বিয়াকে কসোভো থেকে তাদের সৈন্য ও ট্যাংক সরিয়ে নিতে বলে।

সামরিক ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয় আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে। মাত্র ১৫ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ১৫০ কোটি ডলারের জঙ্গিবিমান ধ্বংস করা যায় এ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে। খরচ সাশ্রয়ী এ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়।

গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনী ৫০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র সরবরাহের আদেশ লাভ করে, যে তালিকায় ১০০ মাইল দূরত্বের বিমানে হামলার উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে চীনের পিএল-৫ নামের যে ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে তা আরো বেশি দূরত্বে হামলা করতে সক্ষম। এতে যে ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যান সিস্টেম রয়েছে তাতে যেকোনো যুদ্ধবিমানের পক্ষে একে এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হবে। রাশিয়া এখনো এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পিএল-৫ ছাড়াও পিএল-১০, পিএল-২০ নামের যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তৈরি করছে চীন, তা অন্যদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী মাইকেল গ্রিফিন সম্প্রতি এক ভাষণে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ২৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি কিছু সময় এ ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা আমাদের তহবিল ধারাবাহিক রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। ফলে আজ আমরা কোথায়, যেখানে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমরা সবার চেয়ে অনেক অনেক ওপরে ছিলাম?

এ সময় তিনি চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ইত্যাদি ক্ষেত্রে নাটকীয় উন্নতি এবং নিজেদের পিছিয়ে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ বছর ২৪টি দেশ রাশিয়া থেকে এসইউ-৩৫এস জঙ্গিবিমান কিনবে। অন্য দিকে চীন তাদের দেশে নিজেদের তৈরি জঙ্গিবিমান মোতায়েন করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনো যে বিষয়টি সান্ত্বনার, তা হলো, চীনের যুদ্ধবিমানগুলোর প্রযুক্তি তুলনামূলক দুর্বল এবং এ ক্ষেত্রে দেশটি রাশিয়ার প্রতি নির্ভরশীল। তাদের পাইলটরাও এখনো তেমন দক্ষ হয়ে ওঠেনি। অবশ্য চীন তাদের এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা ঢেকে ফেলছে অন্য দিক দিয়ে। চীনের নতুন এয়ারক্রাফট, যাতে যুক্ত হয়েছে সর্বশেষ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম ও রাশিয়া এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম। ফলে একে বলা হচ্ছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এয়ারক্রাফট। এর ফলে চীনের আয়ত্তে থাকা এলাকাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, বরং ভারতের জন্যও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কারণ ভারতের চোখের সামনে রাশিয়া চীনকে অস্ত্র সরবরাহ করছে, চীন করছে পাকিস্তানকে। এর ফলে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো অনেক বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে ভরে যাচ্ছে, যা ভারতের জন্য মোটেও স্বস্তির বিষয় নয়।

আরেকটি বিষয়েও ভারত দুশ্চিন্তায় ভুগছে। কারণ অনেক আগে থেকেই ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল রাশিয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনও ব্যাপকহারে রাশিয়া থেকে অস্ত্র কিনছে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহকারী একই দেশ হওয়ায় ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

সূত্র : ব্লুমবার্গ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.