সলো : অ্যা স্টার ওয়ারস স্টোরি
সলো : অ্যা স্টার ওয়ারস স্টোরি

কে জিতবে স্বর্ণপাম

আলমগীর কবির কান, ফ্রান্স থেকে

কান উৎসবে এখন শেষ বিকেলের আলো। ৮ মে থেকে শুরু হওয়া আসরের পর্দা নামবে শনিবার। এই সময়টায় এসে পালে দ্য ফেস্টিভাল ভবনে আলোচনার কেন্দ্রে একটাই জিজ্ঞাসা কে জিতবে স্বর্ণপাম। বলে রাখা ভালো যে, এবার ফেবারিট নির্মাতারা জায়গা পাননি সাগরপাড়ে। স্বর্ণপামের লড়াইয়ে শামিল হতে তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত পরিচালকদের জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছেন আয়োজকেরা।
বাণিজ্য নয় শিল্পকে প্রাধান্য দিয়েছেন তারা। তাদের মধ্যে আছেন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার কম পরিচিত নির্মাতারাই এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। কান সৈকতে এই হাওয়া বদলের গানকে স্বাগত জানাচ্ছে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।

মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারক প্যানেলে কেট ব্ল্যানচেট, ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট ও লেয়া সেদুর গ্ল্যামার থাকলেও প্রতিভাবান নির্মাতাদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বোদ্ধারা। এবারের আসরে হলিউডের ‘সলো : অ্যা স্টার ওয়ারস স্টোরি’কে নির্বাচনের মধ্যেই কেবল বাণিজ্যের ঘ্রাণ রয়েছে বলে মন্তব্য তাদের। ফলে লালগালিচায় তারকার অভাব থাকায় আলোকচিত্রীদের অলস সময় কেটেছে।
ফ্রেমোর বিরুদ্ধে সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ওল্ড বয়েজ ক্লাব নিয়েই পড়ে আছেন তিনি। তাই প্রতিযোগিতা বিভাগের ছবিগুলোর নাম ঘোষণার পর চমকে গেছেন তারা। জ্যঁ-লুক গদার, স্পাইক লি., আসগর ফারহাদি ও মাত্তিও গারোনের পাশাপাশি স্বর্ণপামের দৌড়ে থাকার স্বাদ পেয়েছেন আনকোড়া নির্মাতারা।

ব্রিটেনের মাইক লেই, ইতালির পাওলো সরেন্তিনো, জাপানের নাওমি কাওয়াসে, কানাডার হাভিয়ের দোলান, ফ্রান্সের জ্যাক অদিয়ার ও অলিভিয়ার অ্যাসাইয়াসের মতো নিজেদের ফেবারিট নির্মাতাদের উপেক্ষা করে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আয়োজকেরা।
সাত দশক পেরিয়ে গেছে কান। তাই আয়োজকেরা মনে করছেন, হাওয়া বদলের এখনই সময়। কারণ যেকোনো ছোট দেশের ছবি কানের প্রতিযোগিতায় জায়গা পেলে তাদের চলচ্চিত্র শিল্প দুই বছর টিকে থাকার রসদ পেয়ে যায়।
হলিউড রিপোর্টারের সমালোচক স্কট রক্সবোরো বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাপী মানসম্পন্ন সিনেমার জন্য কান এক নম্বর চলচ্চিত্র উৎসব। কম বাণিজ্যিক ছবির নির্বাচন দেখে মনে হচ্ছে, আয়োজকেরা শেকড়ে ফিরতে শুরু করেছেন। অজানা কিন্তু দারুণ ছবি সত্যিকার অর্থে শুধু ফরাসি উপকূলে মেলে। এখানে প্রদর্শনীর পর যেকোনো ছবি এক দিন কিংবা এক সপ্তাহে সবার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। আর্টহাউজ সিনেমার সবচেয়ে বড় নাম হলো কান।’
ফরাসি সিনেমা হলগুলোর নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় কানের ৭১তম আসর থেকে সরে গেছে নেটফ্লিক্স। তা ছাড়া এবারই প্রথম হলিউড মোগল হার্ভি ওয়াইনস্টিনের উপস্থিতি নেই ১২ দিনের বার্ষিক উৎসবটিতে।

অস্কারকে মাথায় রেখে হলিউডের বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর অক্টোবরের পর ছবি মুক্তি দিয়ে থাকে। এ কারণে কানে আমেরিকান ছবির সংখ্যা কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এটা মানতে রাজি নন কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো। তার মন্তব্য, ‘শুধু এক আসর দেখে কিছু বিচার করা ঠিক হবে না।’
কানে সাধারণত বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখা যায়। একটু বয়সী আর ঘুরেফিরে একই নির্মাতাকে আমন্ত্রণ জানান আয়োজকেরা। এবারের চিত্র ভিন্ন। পাম দ’রের দৌড়ে প্রাণবন্ত ও টাটকা মুখগুলো আলো ছড়ানোর সুযোগ পেয়েছে এবার।

প্রথম ছবি (ইওমেদিন) বানিয়েই বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মাজনক পুরস্কার স্বর্ণপামের দৌড়ে জায়গা করে নিয়েছেন মিসরের তরুণ আবু বকর শওকি। তার ছবির গল্প মিসরীয় কুষ্ঠরোগী, তার সাগরেদ ও তাদের গাধার পথচলাকে ঘিরে। মিসরজুড়ে ঘুরে ঘুরে পরিবারকে খুঁজে ফেরে তারা। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ায় যে পরিবার দূরে ঠেলে দিয়েছিল তাদের। এতে মুখ্য চরিত্রে যে অভিনয় করেছেন অপেশাদার অভিনেতা। একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তাকে পেয়েছেন আবু বকর।
কানের মূল প্রতিযোগিতায় নারী নির্মাতাদের স্বল্পতা বরাবরই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসে কেবল জেন ক্যাম্পিয়ন ১৯৯৩ সালে ‘দ্য পিয়ানো’ ছবির নারী পরিচালক হিসেবে স্বর্ণ পাম জিতেছেন। তবে তাকে তা ভাগাভাগি করতে হয়েছিল চীনের চেন কাইগারের (ফেয়ারওয়েল মাই কনকিউবাইন) সাথে।

এবারের আসরে মূল প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত ২১টি ছবির মধ্যে মাত্র তিনটির পরিচালক নারী। তবে এ বিভাগে বিচারকদের প্রধান কেট ব্ল্যানচেটের নেতৃত্বে আছেন চার নারী (ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, লেয়া সেদু, আভা দুভারনে ও খাজা নিন)। তাই হিসাব-নিকাশ সেভাবেই করছেন বোদ্ধারা।
তিন নারীর মধ্যে ইতালির অ্যালিস রোরওয়াচারই কেবল এর আগেও কানে প্রতিযোগিতায় ঠাঁই পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালে ‘দ্য ওয়ান্ডার্স’-এর সুবাদে গ্রাঁ প্রিঁ ওঠে তার হাতে। অ্যালিসের নতুন ছবি ‘হ্যাপি অ্যাজ লাজ্জারো’র অভিনেতা (আদ্রিয়ানো তারদিওলো) পুরোপুরি আনকোরা।
নারীদের মধ্যে প্রথমবার কানে পাম দ’রের দৌড়ে আছেন লেবাননের নারী নির্মাতা নাদিন লাবাকি। তার পরিচালিত ‘কেপারনম’ কিংবা এর অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীর কথাও অনেকে জানে না। এর গল্প ১২ বছরের বালক জাইনকে ঘিরে। যতœ নিতে না পারার সামর্থ্য থাকার পরও জন্ম দেয়ায় নিজের মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে বসে সে! কোনো জন্মসনদ নেই তার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভালোবাসার মতো মৌলিক মানবাধিকার ছাড়াই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে সংগ্রামরত সব শিশুর পক্ষে কথা বলেছে ছবিটি। ২০১১ সালে লেবাননে ধর্মীয় উত্তেজনা বিষয়ে নাদানি লাবাকির ছবি ‘হোয়্যার ডু উই গো নাউ?’ আঁ সার্তেন রিগার্দে নির্বাচিত হয়। তার প্রথম ছবি ‘ক্যারামেল’ স্থান পেয়েছিল ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে।

কান সৈকতে দুটি বড় চমকের একটি হলো, প্রতিযোগতিায় ফরাসি নারীনির্মাতা ইভা হুসোর জায়গা পাওয়া। তার ‘গার্লস অব দ্য সান’ ছবিতে দেখানো হয়েছে, আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে কুর্দিস্তানে কয়েকজন নারী মিলে গড়ে তোলে ব্যাটালিয়ন। এতে বাহার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইরানি অভিনেত্রী গোলশিফতাহ ফারাহানি।
তালিকায় ফরাসি আরো তিনটি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিযোগিতা বিভাগে অভিষেক হয়েছে ফ্রান্সের ইয়ান গঞ্জালেজের। তার ‘নাইফ প্লাস হার্ট’ ছবিতে সত্তর দশকের সমকামী পর্ণো ছবির প্রযোজকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফরাসি অভিনেত্রী ভ্যানেসা প্যারাডিস। প্যারিসে তার বৈধ ছবি তৈরির চেষ্টা নস্যাত করে দেয় এক পেশাদার খুনি।
ফ্রান্সের অন্য দুটি ছবি হলো ক্রিস্তফ নুহের ‘সরি অ্যাঞ্জেল’ ও স্টেফানি ব্রিজের ‘অ্যাট ওয়ার’ (ভিনসেন্ত লান্দন)।

এশিয়ার মধ্যে চীনের জিয়া ঝ্যাংকি’র ‘অ্যাশ ইজ পিউরেস্ট হোয়াইট’ এবারের আসরে পাম দ’রের দৌড়ে শক্ত প্রতিযোগী। তার স্ত্রী জাও তাও সেরা অভিনেত্রী পুরস্কারের জন্য ফেভারিট।
তাদের স্বদেশি রাইয়ুসুকি হামাগুচির প্রতিযোগিতা বিভাগে এবারই প্রথম অভিষেক হলো। তার অষ্টম ছবি ‘নেতেমো সেমেতেমো’র গল্প ২১ বছরের তরুনী ইরিকা কারাতাকে ঘিরে। হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া প্রেমিককে খুঁজতে থাকে সে। দুই বছর পুরনো প্রেমিকের মতো দেখতে একজনের সাথে দেখা হয়ে যায় তার। পাঁচ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ব্যাপ্তির ‘হ্যাপি আওয়ার’ ছবির জন্য লোকার্নো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পান তিনি।

কোরি-ইদা হিরোকাজুর ‘শপলিফটারস’। ছবিটির গল্পে দেখা যায়, ওসামু ও তার ছেলে কনকনে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাতে ছোট্ট একটি মেয়েকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দেয়। ওসামুর স্ত্রীও তা মেনে নেন। যদিও সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। একদিন অপ্রত্যাশিত ঘটনা তাদের বন্ধন সুদৃঢ় করে।
দক্ষিণ কোরীয় পরিচালক ও ঔপন্যাসিক লি চ্যাং-ডঙ কানে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জয়ী ‘পয়েট্রি’র আট বছর পর ফরাসি উপকূলে ফিরলেন। এর গল্প হারুকি মুরাকামির ছোটগল্প অবলম্বনে।‘বার্নিং’ নামের নতুন ছবিতে অভিনয় করেছেন কোরিয়ার উঠতি তারকারা। এর গল্প আলাদা মেজাজের দুই পুরুষের সাথে একজন নারীর সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে ঘিরে।

আরেক লি অর্থাৎ স্পাইক লি মূল প্রতিযোগিতায় ফিরেছেন ২৭ বছর পর। মার্কিন এই পরিচালকের নতুন ছবি ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’-এর গল্প কলোরাডোর একজন কৃষ্ণাঙ্গ গোয়েন্দা পুলিশকে ঘিরে। সত্তর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসী হটাতে শ্বেতাঙ্গদের কু ক্লাক্স ক্ল্যান (কেকেকে) আন্দোলনই এ ছবির বিষয়বস্তু। এর সাথে সম্পৃক্ত শ্বেতাঙ্গ পরাক্রমশালী একটি সংগঠনে অনুপ্রবেশ করে তাদের বেশ কয়েকটি কাজ পণ্ড করে দিতে সক্ষম হন ওই গোয়েন্দা। সত্যিকারের গোয়েন্দা রন স্ট্যালওর্থের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডেনজেল ওয়াশিংটনের ছেলে জন ডেভিড ওয়াশিংটন। ইহুদী আন্ডারকভার পুলিশ অফিসের চরিত্রে দেখা গেছে অ্যাডাম ড্রাইভারকে।

স্বর্ণ পামের দৌড়ে প্রথমবার যুক্ত হতে পারা কাজাখস্তানের সের্গেই দিভোর্তসেভয়ের ‘আইকা’ও আলোচিত হয়েছে। এর গল্প কিরঘিজ অভিবাসীকে ঘিরে। মস্কোর এক হাসপাতালে তিনি মা হন। কিন্তু সন্তান লালন-পালনের সামর্থ্য নেই তার। এক দশক আগে দিভোর্তসেভয়ের ‘তুলপান’ আঁ সার্তেন রিগার্দ পুরস্কার জেতে।
পাম দ’রের লড়াইয়ে এবার আছে সাদাকালো দুটি ছবি। দুটোই দর্শককে ফিরিয়ে নিয়েছে সোভিয়েত শাসনামলে। এর মধ্যে পোলিশ নির্মাতা পাওয়েল পাউলিকোস্কির ‘কোল্ড ওয়ার’-এর গল্প পঞ্চাশের দশকের প্রেক্ষাপটে স্তালিন যুগের পোল্যান্ডে একজোড়া মানব-মানবীর প্রেমকে ঘিরে। ছবিটির মাধ্যমে পোলিশ নির্মাতা পাউলোকস্কির সঙ্গে আবারও কাজ করলেন অভিনেত্রী আগাতা কুলেশা ও ইওয়ানা কুলিগ। পাউলোকস্কির অস্কারজয়ী ছবি ‘ইদা’য় ছিলেন তারা। ইওয়ানাকে এবার দেখা গেছে গায়িকা চরিত্রে।
এবারই প্রথম প্রতিযোগিতায় স্থান পেলেন পাওয়েল পাউলিকোস্কি। তার পরিচালনায় ‘মাই সামার অব লাভ’-এ অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পান ব্রিটিশ তারকা এমিলি ব্লান্ট।

সাদাকালো আরেক ছবির বিষয়বস্তুও সংগীত। রাশিয়ার মস্কোর আন্ডারগ্রাউন্ড রক চর্চা নিয়ে কিরিল সেরেব্রেনিকোভের ছবিটির নাম ‘লেতো’। আশির দশকের প্রেক্ষাপটে ত্রিভুজ প্রেমের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক বাধা পেরিয়ে যেতে সোভিয?েত আন্ডারগ্রাউন্ড রক ঘরানা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আশির দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বামপন্থী দলের রাজনৈতিক আন্দোলন ‘পেরেসত্রয়িকা’র শুরুতে দিনবদলের খোঁজে থাকা একটি প্রজন্মের আশাও উঠে এসেছে এতে।
তবে ফরাসি উপকূলে আসার সুযোগ পাননি কিরিল। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছেন।

কিরিলের মতো কান সৈকতে আসতে পারেননি ইরানের জাফর পানাহি। তার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ ২০ বছর ও আজীবন বিদেশে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে ইরান সরকার। তবে পানাহির ‘থ্রি ফেসেস’ মন জয় করেছে বোদ্ধাদের। এর গল্প আর্মেনিয়ান সীমান্তে উত্তর-পশ্চিম ইরানে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বয়সী তিন অভিনেত্রীকে ঘিরে। তাদের একজন অভিনয় ছাড়তে বাধ্য হয়। অন্যজন হালের বিখ্যাত তারকা। আর বাকি মেয়েটি ড্রামা স্কুলে ভর্তি হতে মুখিয়ে থাকে। কিন্তু পরিবারের গোঁড়ামির কারণে পারছে না। তাই এক অভিনেত্রীর শরণাপন্ন হয় সে। এবারই প্রথম কানের মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিলেন জাফর পানাহি। ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’-এর সুবাদে কানে প্রথম ইরানি হিসেবে পুরস্কার (ক্যামের দ’র) পাওয়া নির্মাতা তিনিই।
জাফর পানাহির স্বদেশি আসগর ফারহাদির প্রথম স্প্যানিশ ছবি ‘এভরিবডি নৌজ’-এর মাধ্যমে পর্দা ওঠে এবারের কান উৎসবের। এতে অভিনয় করেছেন রূপালি পর্দার তারকা দম্পতি হাভিয়ার বারদেম ও পেনেলোপি ক্রুজ। একটি মেয়ে নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারটি সাজানো হয়েছে।

রহস্যজনকভাবে আরেকটি মেয়ে নিখোঁজকে ঘিরে সাজানো আমেরিকার ডেভিড রবার্ট মিচেল পরিচালিত ‘আন্ডার দ্য সিলভার লেক’ চমকে দিতে পারে। এতে অভিনয় করেছেন স্পাইডার-ম্যান তারকা অ্যান্ড্রু গারফিল্ড।
আগেও স্বর্ণ পামের লড়াইয়ে ছিলেন এমন নির্মাতাদের মধ্যে জ্য-লুক গদার (দ্য ইমেজ বুক), দুইবারের গ্রাঁ প্রিঁ জয়ী মাত্তিও গারোন (ডগম্যান) উল্লেখযোগ্য। গদারের ‘গুডবাই টু ল্যাঙ্গুয়েজ’ জুরি প্রাইজ জিতেছিল। আর তুরস্কের নুরি ২০১৪ সালে ‘উইন্টার সিøপ’-এর সুবাদে ঘরে নিয়েছেন স্বর্ণ পাম। তার নতুন ছবির ব্যাপ্তি তিন ঘণ্টারও বেশি। এর গল্পে একজন নারী লেখককে ঘিরে। গ্রামে ফিরে আসার পর তিনি জানতে পারেন ঋণের বোঝার চাপে পড়েছেন বাবা। তাই নিজের প্রথম বই প্রকাশের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন লেখক।

এর আগে বৃহস্পতিবার কান উৎসবের ৭১তম আসরে শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগ সিনেফঁদাসিউতে সেরা হলো ইউনিভারসিদাদ দে চিলির দিয়েগো সেসপেদেস পরিচালিত ‘দ্য সামার অব দ্য ইলেকট্রিক লায়ন’। ফলে তার প্রথম ছবি আগামীতে কান উৎসবে স্থান করে নেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। একইসাথে পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন ১৫ হাজার ইউরো।
কানের স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৪টায় (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টা) সিনেফঁদাসিউ বিভাগের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয় পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের সাল বুনুয়েল থিয়েটারে। এ সময় মঞ্চে ছিলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও সিনেফঁদাসিউ বিভাগের বিচারকদের সভাপতি ফরাসি নির্মাতা বার্ট্রান্ড বোনেলো।

‘দ্য সামার অব দ্য ইলেকট্রিক লায়ন’এছাড়াও ছিলেন সিনেফঁদাসিউ বিভাগের অন্য চার বিচারক ফরাসি অভিনেত্রী আরিয়ান লাবেদ, লেবানিজ নারী নির্মাতা খলিল জোরেইজ, জার্মান নারী নির্মাতা ভ্যালেসকা গ্রিজবাখ ও লিথুনিয়ান নারী নির্মাতা আলান্তে কাভায?েত। পুরস্কার প্রদান শেষে দেখানো হয় বিজয়ী ছবিগুলো।
‘দ্য সামার অব দ্য ইলেকট্রিক লায়ন’ ছবির ব্যাপ্তি ২২ মিনিট। এর গল্পে দেখা যায়, চিলির শহর থেকে অনেক দূরে এক বাড়িতে লুকিয়ে আছে ১৭ বছর বয়সী ড্যানিয়েলা। চিলির ভাববাদী লায়নের সপ্তম স্ত্রী হতে যাচ্ছে সে। অনুসারীরা মনে করে, আলতো ছোঁয়া দিয়েই বিদ্যুৎ চমকাতে পারে লায়ন। তার সঙ্গে দেখা করার সময় ঘনিয়ে আসে। মেয়েটিকে এই যাত্রায় সঙ্গ দেয় তার ভাই ১১ বছরের বালক আলোনসো।

ইগোর পপলোইনচেন ডাইসিনেফঁদাসিউর এবারের আয়োজনে যৌথভাবে দ্বিতীয় হয়েছে রাশিয়ার মস্কো স্কুল অব নিউ সিনেমার শিক্ষার্থী ইগোর পপলোইনের ‘ক্যালেন্ডার’ ও চীনের সাংহাই থিয়েটার কোম্পানির ছাত্রী চেন ডাই পরিচালিত ‘দ্য স্টর্মস ইন আওয়ার ব্লাড’। পুরস্কার হিসেবে তারা ভাগাভাগি করেছেন ১১ হাজার ২৫০ ইউরো।
‘ক্যালেন্ডার’ ছবির ব্যাপ্তি ২৮ মিনিট। এর গল্প একজন নারীকে ঘিরে। শুরুতে তাকে মনে হবে সাধারণ। কিন্তু দুই মাস পরপর তার জীবনের সময়সূচি বদলে যায়। প্রেমিকের কাছ থেকে লুকিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হন তিনি। কী আছে তার মনে? তার এই পথচলার উদ্দেশ্য নিয়েই ছবিটি।
দ্বিতীয় পুরস্কারজয়ী আরেক ছবি ‘দ্য স্টর্মস ইন আওয়ার ব্লাড’-এর ব্যাপ্তি ৩১ মিনিট। এতে দেখা যায়, নিজের সন্তানের বাবাকে খুঁজতে ঘানার ২২ বছরের তরুণী ঊমা চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হাজারও মাইল পাড়ি দিতে থাকে।

লুসিয়া বুলগেরোনিতৃতীয় হয়েছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন স্কুলের ছাত্রী লুসিয়া বুলগেরোনির অ্যানিমেটেড ছবি ‘ইনঅ্যানিমেট’। তিনি পেয়েছেন সাড়ে সাত হাজার ইউরো। তার ছবির ব্যাপ্তি ৮ মিনিট। এর গল্প ক্যাটরিনকে ঘিরে। তার জীবনযাপন, অ্যাপার্টমেন্ট, চাকরি, প্রেমিক; সবই সাধারণ। তার ভাবনা অনুযায়ী একদিন সবকিছু বদলে যেতে থাকে।
কান উৎসবের অন্যতম পরিচালক জিলস ইয়াকব ১৯৯৮ সালে চালু করেন সিনেফঁদাসিউ বিভাগ। এবার ছিল এর ২১তম আসর। এতে জমা পড়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৫১২টি ফিল্ম স্কুলের ২ হাজার ৪২৬টি ছবি। এর মধ্যে নির্বাচিত হয় ১৪টি দেশের ১৭টি চলচ্চিত্র। সেগুলোর মধ্যে পুরস্কার পেলো চারটি ছবি।

‘ইনঅ্যানিমেট’আয়োজকরা জানান, আগামী ২২ মে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় প্যারিসের সিনেমা দ্যু পানতিওনে আবারও দেখানো হবে সিনেফঁদাসিউতে পুরস্কৃত চারটি ছবি। এছাড়া প্যারিসের সিনেমাতেক ফ্রঁসেজে সিনেফন্ডেশন বিভাগে এবার নির্বাচিত সব ছবির প্রদর্শনী হবে ১১ জুন স্থানীয় সময় রাত ৯টায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.