ছোটদের কবি নজরুল

আবু আফজাল মোহা: সালেহ

‘ভো র হল দোর খোল/খুকুমণি ওঠরে/ঐ ডাকে যুঁই শাঁখে/ফুলখুকী ছোটরে’-এ ছড়াটি কে শোনেনি! এ রকম আরো অনেক ছড়া শিশুদের জন্য লিখেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটদের জন্য বেশ কিছু ছড়া ও কিশোর-কবিতা, গান লিখেছেন। গ্রামের সাধারণ দৃশ্য ও শিশুদের পছন্দমতো বিষয় বেছে নিয়ে দারুণ ও সাবলীল ছড়া ও কবিতা লিখেছেন।
কবি ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ সালের ২৫ মে) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জায়েদা খাতুন। কবি গ্রামের মক্তব থেকে প্রাইমারি পাস করেন। যেটা এখব কবিতীর্থ চুরুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ। নজরুলের চুরুলিয়াকে ভারতে সরকারিভাবেই ‘কবিতীর্থ’ বলা হয়। জানা দরকার ‘কবিতীর্থ’ আর রবিঠাকুরের ‘শান্তিনিকেতন’ একই জেলায়Ñ বর্ধমানে।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাই স্কুলে কিছু দিন লেখাপড়া করেন। এরপর কাউকে না জানিয়ে চুরুলিয়াতে পালিয়ে যান। এরপর ভর্তি হন বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জ হাই স্কুলে। এখানে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় প্রথম মহাযুদ্ধে যোগদান করেন। কবি আর বেশি দূর পড়া এগোতে পারেননি! দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন বলে সবাই দুখু মিয়া বলে ডাকত তাকে। নজরুল তার সিদ্ধহস্তে অসংখ্য ছড়া লিখেছেন। নজরুলের শিশুতোষ ছড়ার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যÑ পিলেপটকা, খাঁদু দাদু, লিচু চোর, মটকু মাইতি, খুকি ও কাঠবিড়ালী প্রভৃতি। তার ‘ঝিঙেফুল’ কাব্যে ১৩টি ছড়াই মজার।
নজরুলের সাথে আলী আকবর নামের এক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়েছিল। এ ভদ্রলোক শিশুদের পাঠ্যবই লিখতেন। একদিন শিশুদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির জন্য আলী আকবর সাহেব কবিতা লিখে নজরুলকে দেখিয়েছিলেন। নজরুলের কাছে লেখাটা যথাযথ মানের মনে হয়নি বলে নজরুল ভদ্রলোককে বলেছিলেন। তখন আকবর আলী সাহেব নজরুলকে লিখতে বলেছিলেন একটি কবিতা। তখন নজরুল লিখলেন :
‘বাবুদের তাল পুকুরে/হাবুদের ডাল কুকুরে/সেকি ব্যাস করলো তাড়া/বলি থাম একটু দাঁড়া’।
কলকাতার স্কুলে যাওয়া দু’শিশু রোজ পাঠশালাতে যেত। একজন ছিল দারুণ বেঁটে আর মোটা অন্যজন টিনটিনে শুকনো আর ছিপছিপে লম্বা। অনেকটা তালপাতার সেপাইয়ের মতো। এ দু’জনকে দেখে নজরুল এতটাই মজা পেয়েছিলেন যে, একদিন হঠাৎই তিনি লিখেছিলেনÑ
‘মটকু মাইতি বাঁটকুল রায়/ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে যায়/বেঁটে খাটো নিটপিটে পায়/
ছের চলে কের চায়/মটকু মাইতি বাঁটকুল রায়’
কবি কাঠবিড়ালীকে নিয়ে লিখে ফেললেন চমৎকার একটি ছড়া। ছড়াটি হলোÑ ‘কাঠ বিড়ালি কাঠ বিড়ালি/পেয়ারা তুমি খাও/গুড় মুড়ি খাও/বাতাবি নেবু লাউ’।
শুধু শিশুদের চঞ্চল মন মাতিয়ে রাখার পদ্যই লিখেননি নজরুল, শিশু-কিশোরদের মনে তাদের মতো করেই গভীর ভাব জাগিয়ে তোলারও চেষ্টা করেছেন এমন মহান কারিগর। নজরুল লিখলেন:
‘নতুন দিনের মানুষ তোরা/আয় শিশুরা আয়!/নতুন চোখে নতুন লোকের/নতুন ভরসায়।/নতুন তাঁরায় বেভুল পথিক/আসলি ধরাতে/ধরার পার আনন্দ-লোক/দেখাস ইশারায়।/খেলার সুখে মাখলি তোরা/মাটির করুণা,/এই মাটিতে স্বর্গ রচিস,/তোদের মহিমায়’।
তোমাদের জন্য অনেক মজার ছড়া লিখেছেন নজরুল। তার লেখা পিলে পটকা, খাঁদু-দাদু, মাইতি, লিচুচোর আর খুকি ও কাঠবিড়ালীর মতো শিশুতোষ মজার ছড়া অন্য কোনো কবি আজো লিখেতে পারেননি।
বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামি সঙ্গীত তথা গজল। ১৩৪৪ সালে মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন স¤পাদিত ‘শিশু সওগাতের’ প্রথম সংখ্যায় ‘শিশু সওগাত’ নামের কবিতায় : ‘ওরে শিশু, ঘরে তোর এল সওগাত/আলো পানে তুলে ধর ননী-মাখা হাত।/নিয়ে আয় কচি মুখে আধো আধো বোল,/তুলতুলে গালে ভরা টুলটুলে টোল।/চকচকে চোখে আন আলো ঝিকমিক’
শেষ অংশÑ‘ডালে ডালে ঘুম-জাগা পাখীরা নীরব,/তোর গান শুনে তবে ওরা গাবে সব’।
আমাদের ‘রণসঙ্গীত’ চল চল চলÑ তার লেখা। সঙ্কল্প কবিতা কে না জানে! শিশুমনের ইচ্ছে-আকাক্সক্ষা তুলে ধরে বিশ্বজয়ের কথা বলেছেন এ কবিতায়। নজরুলের শিশুসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অনন্য স¤পদ। তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে প্রথাগত প্রবণতা থেকে মুক্তি দিয়ে বাস্তবমুখী চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। নজরুলের এ অবদান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যময়। ছড়া শুধু শিশুভোলানোর জন্য নয় তা নজরুল লিখে বুঝালেন। ছড়ার উপাদনে যোগ করলেন নতুন উপাদান। কল্পনা, রূপকথা ইত্যাদি বাদ দিয়েও ছড়া হতে পারে, তা তিনি দেখালেন। প্রজাপতি, কাঠবিড়ালী, ঝিঙেফুল বা সামনে থাকা ভিন্নরূপের শিশু এবং জিনিস নিয়ে চমৎকার ও মজার ছড়া-কবিতা লিখলেন। শিশুতোষ ছড়া-সাহিত্য সংখ্যায় কম হলেও মানে কালজয়ী মর্যাদা পেয়েছে তার প্রায় সব ছড়া-কবিতা। এখনো শিশুরা আবৃত্তি করতে বেছে নেয় ‘খুকি ও কাঠবিড়ালী’, লিচুচোর, প্রভাতি ইত্যাদি ছড়া-কবিতা।
নজরুল ছোটদের অনেক ভালোবাসতেন। আদর করতেন। ১৯৭২ সালে কবির জন্মদিনে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ সালে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেন এবং এ কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। এই মহান কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে কবর দেয়া হয়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.