অফিসিয়াল সিলেকশনে নেই বাংলাদেশ

আলমগীর কবির কান, ফ্রান্স থেকে

দেখতে দেখতে কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নামার সময় হলো। মোট ১৬০টি দেশ থেকে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা এখানে এসে হাজির হয়েছেন। সদ্য চলচ্চিত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া সৌদি আরব থেকে শুরু করে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাওয়া ফিলিস্তিনিও রয়েছে এই কাতারে। কিন্তু অফিসিয়াল সিলিকশনে নেই কেবল বাংলাদেশ।
ভূমধ্যসাগর ঘেঁষে ও ভিলেজ ইন্টারন্যাশনালের দিকে গেলে কত না দেশ দেখা যায়। তখন প্রশ্ন জাগে কেন নেই বাংলাদেশের পতাকা? বেশ কিছু দেশের ছবি আছে উৎসবের বিভিন্ন বিভাগে। কিন্তু অফিসিয়াল সিলেকশনে নেই বাংলাদেশ।
প্যাভিলিয়ন ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান কান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দো ফেস্টিভাল ভবনের নিচতলায় স্টলে স্টলে পসরা সাজিয়ে বসেছে। এখানে অবশ্য কিছুটা অতৃপ্তি ঘুচেছে এবার।
কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে ‘পোড়ামন-টু’ নিয়ে এসেছেন জাজ মাল্টিমিডিয়ার স্বত্বাধিকারী আবদুল আজিজ। তিনি একটি স্টলের কিছু অংশ বরাদ্দ নিয়ে নিজের প্রযোজিত ছবিগুলোর পোস্টার দেখিয়েছেন। সেখানে বসেই গত ১২ মে কানের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় ছবিটির টিজার উন্মুক্ত হয়। এরপর রাত ৮টায় পালে দো ফেস্টিভাল ভবনের পালে-এফ থিয়েটারে এর প্রদর্শনী হয়।
কান সৈকতে বেশ কিছু ব্যবসাসফল ছবির প্রযোজক আবদুল আজিজ আগামীবার একাই একটি বুথ নেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। নিজের কান অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের ছবি যদি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে না পারি তাহলে টিকে থাকা কঠিন হবে। কারণ আমাদের নির্মাণ ব্যয় বেড়ে গেছে। ভারতের মতো আমাদেরও বহির্বিশ্বের বাজারটা ধরতে হবে। সেই বাজার ধরতে ফিল্ম প্রফেশনালদের নাগাল পাওয়ার জায়গা হলো কান। এখানে সবাই আসে। যেমন চীন, ব্রাজিল, ইরান, কোরিয়ার কয়েকজনের সাথে আমার কথা হলো। বাংলাদেশে সিনেমা হয় শুনলে তারা অবাক হয়! বাংলাদেশকে তারা গার্মেন্ট ও ক্রিকেটের দেশ ভাবে! কিন্তু আমাদের দেশেও যে ভালো মানের সিনেমা হয় তা জানান দিতে হবে। বিদেশের মার্কেটের ক্ষেত্রে শুধু সিনেমা হল নয়, টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করতে হবে। এসব লক্ষ্যে আগামী বছর আরো বড় আকারে কানে থাকতে চাই। একটা বুথ নিয়ে আমার ৪৫টি ছবি ডিসপ্লে করার ইচ্ছে আছে।’ মার্শে দ্যু ফিল্মের একটি স্টলে জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত কয়েকটি ছবির পোস্টারপালে দো ফেস্টিভাল ভবনের নিচ তলাতেই শর্টফিল্ম কর্নারে সোমবার (১৪ মে) থেকে শুরু হয়েছে ছবি দেখা। উৎসবের এ বিভাগে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের চারটি স্বল্প দৈর্ঘ্যরে ছবি। এ তালিকায় আছে জসিম আহমেদের ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল’, মনজুরুল আলমের ‘মেঘে ঢাকা- লাইফ উইদাউট সান’, ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর ‘রোয়াই’ ও নোমান রবিনের ‘অ্যা কোয়ার্টার মাইল কান্ট্রি’। এ দিন মনজুরুল আলম ছাড়া বাকি তিনজনকেই চোখে পড়ল ভালোভাবে। নির্মাতা জসিম আহমেদ জানালেন, ‘ডেব্রিস অব ডিজায়ার’ নামে একটি ছবির জন্য বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার সাথে ইউরোপিয়ান কো-প্রোডাকশন খুঁজতেই এবার মার্শে দ্যু ফিল্মে তার আসা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’ ও ‘সুবালা’র ছায়া অবলম্বনে এটি পরিচালনা করবেন ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী। একইভাবে নিজের আগামী ছবিতে অর্থায়নে উদ্বুদ্ধ করতে কয়েকজন প্রযোজকের সাথে আলোচনা এগিয়ে নিতে কানে হাজির হয়েছেন ‘লালটিপ’ ও ‘পরবাসিনী’ খ্যাত স্বপন আহমেদ। তিনি কানে নিয়মিতই পা রাখেন। কানে বাংলাদেশের দুই তরুণ নির্মাতা সুমন দেলোয়ার ও সুমিতকে নিয়ে এসেছেন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশের (আইএফআইবি) সভাপতি সামিয়া জামান। বাংলাদেশের উদীয়মান চলচ্চিত্রকারদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে তার সংগঠনটি ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জিং ফিল্ম ট্যালেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইইএফটিএ) মিলে চালাচ্ছে ‘ঢাকা টু কান’ প্রকল্প। তিন দিনের এ কার্যক্রমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্বাহী ও চলচ্চিত্র শিল্পের প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিদের সাথে বৈঠকের সুযোগ পেয়েছেন সুমন ও সুমিত। সাগরপাড়ে আইইএফটিএ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কথা বললেন সামিয়া জামান। তার ভাষ্য, ‘কয়েক বছর আগেও কানের মতো প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের কাউকে পাইনি। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে অংশগ্রহণ বাড়ছে। অনেকে বলতে পারেন, আরেকটু সময় নিয়ে আসা দরকার। কিন্তু আমি বলব, এখানে এলেই সময়টা হয়ে যাবে। নতুনদের জন্য কান উৎসব শিক্ষণীয় একটি মঞ্চ।’ লাল-সবুজ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে কানে আরো এসেছেন চলচ্চিত্র সংগঠক আহমেদ মুজতবা জামাল। তিনি বললেন, ‘কানে এসে বুঝতে পারছি, বাংলাদেশের সিনেমা বা ফিল্ম ফেস্টিভাল নিয়ে মানুষের কৌতূহল আছে। আমাদের ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আসতে ইতোমধ্যে অনেকে কথা দিয়েছেন। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন ইতিবাচক একটা ফল আসবে।’
পালে দো ফেস্টিভাল ভবনের সামনে স্বপন আহমেদ ঢাকা থেকে এসেছেন সাংবাদিকেরাও। রোজ উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে প্রেস রুম অথবা তেরেস দো জার্নালিস্টসে তাদের সাথে দেখা হচ্ছে। আড্ডাও জমছে কাজের ফাঁকে। সব মিলিয়ে ফরাসি উপকূলে বাংলাদেশের একটা সুবাস মিলছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশের একাধিক ছবি অংশ নিয়েছে মার্শে দ্যু ফিল্মে। তৌকীর আহমেদের ‘অজ্ঞাতনামা’ ও অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’র কথা মনে পড়ছে। কিন্তু কানে প্রতিযোগিতার সুযোগ না পাওয়ার অতৃপ্তি থেকেই যায়।
অফিসিয়াল সিলেকশনের ইতিহাস এখনো গড়া হয়নি বাংলাদেশের। কেবল ২০০২ সালে তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে স্থান পেয়েছিল। এর সুবাদে কানে ফিপরেস্কি পুরস্কারও জেতে ছবিটি। এ ছাড়া গতবারের আসরে সিনেফঁদাসিউ বিভাগে নির্বাচিত হয় কামার আহমাদ সাইমনের ‘দ্য ডে আফটার টুমরো’র চিত্রনাট্য। এর সুবাদে তিনি আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। এই ছবি হয়তো কানে অফিসিয়াল সিলেকশন হবে। এ তালিকা আরো দীর্ঘ হবে, সেই আশায় আমরা দিন গুনি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.