বিশ্ব রাজনীতিতে অ্যান্টার্কটিকা

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল

উনিশ শতকের গোড়াতে অ্যান্টার্কটিকা নামের শীতলতম মহাদেশটিতে মানুষের প্রথম পদচারণা শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের অভিযানকারী দল পাড়ি জমাতে থাকে এর বিশাল বরফপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে। প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ এমনকি নিছক প্রমোদ ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীর জনগণ আকৃষ্ট হয়ে ওঠে এই মহাদেশের প্রতি। ১৯২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার একদল অভিযানকারী সেখানে গবেষণামূলক অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু খনিজপদার্থের সন্ধান পায়। এর কিছু দিন পর একদল মার্কিন অভিযাত্রী প্রায় ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করে এই হিমশীতল মহাদেশে এবং হিমবাহের তলদেশে প্রচুর খনিজ তেল ও কয়লার সন্ধান পেলো। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই মহাদেশের এক বিশাল অংশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে। পরে ভারত, ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ বেশ কিছু দেশ নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য এগিয়ে আসে।
১৯৩০ সালের দিকে এই মহাদেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন মহড়া। অস্ট্রেলিয়া এই মহাদেশটির দুই-তৃতীয়াংশ দাবি করে বসে এবং ১৯৩৬ সালে তার নিজ এলাকায় প্রশাসন জারি করে। এ দিকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন তার দাবি অব্যাহত রাখে। ফ্রান্স দাবি করে বসে এক লাখ ৬৬ হাজার বর্গমাইল এলাকার ওপর। পরে আর্জেন্টিনা, চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরো বেশ কিছু দেশ অ্যান্টার্কটিকায় তাদের অভিযান চালাতে শুরু করে।
এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান দশকে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বৃহৎ শক্তিবর্গের জোর রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি পরীক্ষাস্থলে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ গোলার্ধের ৬০ লাখ বর্গমাইলের বিস্তৃত এই এলাকা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিবর্গ তাদের সামরিক ও পারমাণবিক গবেষণার লক্ষ্যে নতুন অভিযান শিবির গড়ে তুলেছে। বৃহৎ শক্তিবর্গের এসব তৎপরতা বিশ্বজুড়ে বিশাল অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নতুন ‘শক্তি মেরুর’ জন্ম দিচ্ছে। তেমনি পারমাণবিক বিকিরণ ও বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ ও বিশাল ধূম্ররাশি এর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে।
১৯৫০ সালের দিকে মহাদেশটির কিছু রহস্য উন্মোচিত হয় যা দুনিয়ার শক্তিশালী জাতিগুলোকে এই মহাদেশটির প্রতি আরো আকৃষ্ট করে। বিজ্ঞানীরা এই মহাদেশে খনিজ তেলসহ সোনা, রুপা, তামা ও আরো অনেক মূল্যবান খনিজপদার্থের সন্ধান পান। ফলে আবারো বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর মাঝে নতুন করে বিতর্ক ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। এমনকি তাদের বিবাদ ও ঝগড়া পরে যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখার প্রতিশ্রুতিসহ অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ব্যাপারে আপসে পৌঁছতে ১৯৫৯ সালে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো মিলিত হয় এক সম্মেলনে। ব্রিটেন, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ১২টি দেশ অংশ নেয় এই সম্মেলনে। তারা সবাই নিজ নিজ অধিকার বহাল রাখার জন্য সম্পন্ন করে ‘অ্যান্টার্কটিকা চুক্তি’। এই চুক্তির শর্ত অনুসারে দেশগুলো বছরের যেকোনো সময় এই এলাকাতে তাদের গবেষণামূলক যেকোনো অভিযান চালাতে পারবে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ ও রাসায়নিক গবেষণামূলক সব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। এই চুক্তির বলে ১৯৭০-এর দশক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দুই পরাশক্তি তাদের সামরিক মহড়া পুরোদমে চালিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণ করেছে এখানে একটা প্রশস্ত বিমান অবতরণ ক্ষেত্র এবং কিছু আশ্রয়শিবির যেখানে অনায়াসে ১০০ বিজ্ঞানী অবস্থান করে সারা বছর তাদের গবেষণার কাজ নির্বিঘেœ চালাতে পারবেন। তবে এ বিশাল বরফাবৃত মহাদেশের বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তন ঘটাতে পারেÑ এমন সব কাজ ও গবেষণা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে বলে সম্মেলনে জোর দিয়ে বলা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, সমগ্র বিশ্বের মোট জলরাশির ৭০ শতাংশ অ্যান্টার্কটিকায় বরফ হয়ে জমে আছে। সুতরাং এখানে আবহাওয়ার কোনোরূপ পরিবর্তন ঘটালে বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধি পাবে এবং বরফ গলতে শুরু করবে। ফলে এখানে সমুদ্রের বিপুল জলরাশির উচ্চতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার কয়েক হাজার ফুট পুরু বরফের স্তরের মাত্র ১০ ফুট গলে গেলে সব সমুদ্রের বিপুল জলরাশি প্রায় ৪-৫ ফুট বৃদ্ধি পাবে। আর সমুদ্রের পানির এই বৃদ্ধির সাথে সাথে মিসর ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো পানির নিচে সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে যাবে।
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বর্তমান দশকে মহাদেশটিতে আন্তর্জাতিক বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদচারণা নতুন করে মোড় নিচ্ছে। চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি এখানে নতুন করে নৌঘাঁটিও গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়া তার নিজস্ব প্রভাব বলয়ের কাছাকাছি বিশাল একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের চেষ্টা করছে। অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যেই অ্যান্টার্কটিকাতে তার সামরিক গবেষণার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ইসরাইলসহ পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ যাদের ‘পরমাণু অস্ত্র জোট’ বলা হয়, তারা আগামী দশকে অ্যান্টার্কটিকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে মারাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করবে, যা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

 

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.