ইসির সন্তুষ্টির নির্বাচন এবং বিএনপির শিক্ষা

সহজ কথা
আলফাজ আনাম

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। নির্বাচন কমিশনের সচিব জানিয়েছেন, চমৎকার নির্বাচন হয়েছে। সুন্দরভাবে উৎসবের আমেজে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কেমন নির্বাচন চায়, তার একটা মহড়া হয়তো খুলনায় হয়ে গেল। নির্বাচন কমিশন যেহেতু এই নির্বাচনে খুশি, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি আগামী নির্বাচনগুলো খুলনার মতো হলে নির্বাচন কমিশন নিজেদের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করবে। এমন নির্বাচনের পরিকল্পনা হয়তো তারা করছে। ফলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন চমৎকার ও উৎসবমুখর হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেমন হয়েছে, তার কিছু চিত্র গণমাধ্যমে এসেছে। সকাল ১০টার পর নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। আগে থেকে ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা তো ছিলই। ক্ষমতাসীন দলের কৌশলও ছিল চমৎকার। ভোটকেন্দ্রে কোনো হাঙ্গামা-হইচই নেই। অল্পবিস্তর ভোটার আছেন। কোনো কোনো জায়গায় ভোটের লাইনও আছে, কিন্তু ভেতরে শুধু ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর এজেন্ট। ফলে ব্যালট পেপার প্রিজাইডিং অফিসারের কাছ থেকে নিয়ে নির্বিঘেœ সিল মারার কাজ সারা হয়েছে। এরপরও সাংবাদিকরা ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির নানা চিত্র দেখতে পেয়েছেন।
ভোট শুরু হওয়ার ২ ঘণ্টা পর ক্ষমতাসীন দলের ঘোরতর সমর্থক একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলেও দেখানো হয়েছে, কিভাবে ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকে সিল দিয়ে রাখা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের এক সমর্থক দুই বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ভোট দিয়েছেন। নিজেও দিয়েছেন, ছেলেও দিয়েছে। চমৎকার। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার আছে, কিন্তু ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা এসে ব্যালট নিয়ে সিল দিয়ে ব্যালট পেপার শেষ করেছে। ভোটাররা যখন এসে ভোট দিতে চাইছেন, তখন আর তাদেরকে ব্যালট পেপার দেয়া যায়নি। বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ভোটের পর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এই নির্বাচন সর্বকালের ভোটডাকাতির নতুন রূপ, নতুন সংস্করণ। নারী ভোট ডাকাত এখানে নতুন সংযোজন। ১০৫টি কেন্দ্রে ব্যালট ছিনিয়ে ভোট দেয়া হয়েছে, ৪৫টি কেন্দ্রে ভোটারদের আটকে দেয়া হয়েছে। ভোট ডাকাতির অন্যতম দৃষ্টান্ত এটি।’ অপর দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন তথ্য এসেছে, ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬০টি ভোটকেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট ছিল না। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো কেন্দ্রে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। একটি কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৮১৭ জন, সেখানে ভোট পড়েছে ১৮১৬টি।
খুলনার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে পুলিশের উপস্থিতিতে ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মেরেছে। মনে হয়েছে, পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে তারা কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। নির্বাচনের আগে থেকে পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, অথচ রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের অভিযোগ আনার পর ঢাকা থেকে নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তাকে খুলনায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এরপরও নির্বাচনের আগে পুলিশ বিএনপির বহু নেতাকর্মীকে আটক করেছে। এ নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। বাস্তবতা হচ্ছে, নির্বাচনকালীন স্থানীয় প্রশাসনের ওপর হয় নির্বাচন কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না অথবা নির্বাচন কমিশনও ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে চায়নি। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। ক্ষমতাসীন দলের চাওয়া-পাওয়ার দিকে তাদের তাকিয়ে থাকতে হয়। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তি তারা আদৌ পাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আস্থা অর্জনের সুযোগ। যে পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন যেভাবে সন্তোষ প্রকাশ করেছে, তাতে মানুষের মধ্যে হতাশা আরো বেড়েছে। আগামী মাসে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহ আরো কমবে। কারণ, গাজীপুর পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিএনপির পক্ষ থেকে বহু অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানকার শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গাজীপুর পুলিশের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা একজন বহুলালোচিত ব্যক্তি। যিনি সংসদ ভবন এলাকায় বিএনপির এমপিকে পিটিয়েছিলেন। রাজনীতিকদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত। নির্বাচন কমিশন খুলনার মতো গাজীপুরেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্বিঘেœ নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, এমন আস্থা আর মানুষের নেই।
ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রতিপক্ষের এজেন্ট বের করে বিজয়ী হওয়ার যে কৌশল নিয়েছে তা নতুন নয়। এই কৌশলের প্রথম প্রয়োগ হয়েছিল ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে। সে সময় ঢাকা শহরের বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থীদের এজেন্ট পাওয়া যায়নি। এজেন্ট হিসেবে যাদের মনোনীত করা হয়েছিল, আগের রাতে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়িতে গিয়ে খুঁজে এসেছে। এই কৌশল পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও অনুসরণ করা হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও একই পরিস্থিতি ছিল। বিএনপির প্রার্থীরা দুপুরের আগেই টের পেয়েছিলেন সব ভোটকেন্দ্র ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। অনেক ভোটারকে কষ্ট করে আর ভোটকেন্দ্রে যেতে হয়নি। আগেই ভোট দেয়া হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা একসাথে কাজ করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এমন ভোটের পরও নির্বাচন কমিশন অসন্তুষ্ট ছিল না।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি এবং ১৫২ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের পরও তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ মেয়াদ শেষ করে বিদায়ের আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘শপথ নেয়ার পর আমি বলেছিলাম, কাজে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করব। পাঁচ বছরের মেয়াদে আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। তা সফলভাবে অতিক্রম করেছি। শেষে এসে বলতে পারি, আমরা জাতির সামনে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করেছি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার বিষয়টি আইনেই আছে। মাঠ ছেড়ে দিলে তো প্রতিপক্ষ গোল দেবেই। এটা রাজনীতির খেলা। উন্নত বিশ্বে এর চেয়ে অনেক বেশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের রেকর্ড আছে।’ এই হলো কাজী রকিবউদ্দিনের শেষ উপলব্ধি। ভোট ছাড়া নির্বাচন, রাতের আঁধারে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পরও এরশাদকে সংসদ সদস্য ঘোষণার পরও কাজী রকিবউদ্দীনও দাবি করেছিলেন, তিনিও ‘নিরপেক্ষ’। এমন নির্বাচনের আয়োজন করে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও রকিব কমিশনের পথ অনুসরণ করছে।
অনেকে বলে থাকেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করা সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা পূরণের বাইরে নির্বাচন কমিশন চলতে পারে না। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়, যারা দলীয় আনুগত্যের বাইরে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নন। এ ছাড়া বর্তমানে প্রশাসনকে যেভাবে দলীয় বিবেচনায় সাজানো হয়েছে, তাতে নির্বাচন কমিশন চাইলেও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে পারবে না। কারণ, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পুরোপুরি রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে চালিত হচ্ছে। পেশাদারিত্ব কিংবা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের জন্য দরকার হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিএনপি কিংবা বিরোধী দল যদি ক্ষমতাসীনদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে না পারে, তাহলে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।
খুলনার নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে খুলনার নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, সামনে আরো বড় বড় পরাজয় মোকাবেলা করতে হবে বিএনপিকে। খুলনার সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে বিএনপি কী শিক্ষা নেবে, তা বোঝার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা একটি বিষয় মনে হয় বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতাসীন দলের অধীনে আগামী কোনো নির্বাচনে তাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে প্রশাসন কখনো নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে না, বরং পুলিশের সহায়তায় ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল মারা হবে। সরকারি আশ্বাস কিংবা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকার আশ্বাস-সদিচ্ছায় কোনো নির্বাচনে তাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সাম্প্রতিক মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক প্রবাহ থেকে তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। রাজনৈতিক অপবাদ, জেলজুলুমের পরও আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক শক্তির কাছে ক্ষমতাসীনদের পরাজয় হয়েছে। যাকে অপবাদ দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তিনি সসম্মানে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে তিনি তার অধিকার আদায় করে নিয়েছেন। মিথ্যা মামলা হাওয়ায় উড়ে গেছে। ওবায়দুল কাদের ঠিকই বলেছেন, বিএনপি এই নির্বাচন থেকে শেখার আছে। কিভাবে তারা তাদের রাজনৈতিক অধিকার আদায় করবেন, তা শেখার বিষয়। খুলনার নির্বাচন থেকে সে শিক্ষা তারা কতটা নিতে পারবেন, সামনের দিনগুলোতে বোঝা যাবে।
alfazanambd@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.