জায়দা সিতানি ও সংবিধান

সময়-অসময়
তৈমূর আলম খন্দকার


‘জায়দা সিতানি’ অর্থাৎ জমিদার কর্তৃক প্রজার ওপর জুলুম না করার অঙ্গীকার। জমিদার যখন প্রজার কাছে এই মর্মে অঙ্গীকার করতেন, প্রজার ওপর রাজস্ব বৃদ্ধির ব্যাপারে কোনো অন্যায় বা জুলুম করা হবে না, তখন এ রূপ অঙ্গীকার ‘জায়দা সিতানি’ (JAIDA SITANI) নামে পরিচিত ছিল। (সূত্র : চৌধুরী মূনীরউদ্দিন মাহাফুজ প্রণীত ‘আইনি শব্দমালা’ পৃষ্ঠা-৩০৯)। জমিদারি আমলে জমিদারেরাই ছিল নিজ নিজ এলাকার শাসনকর্তা। মোগল/ব্রিটিশকে পত্তনি/বার্ষিক খাজনা দিয়ে ‘জমিদারি’ স্বীকৃতি এনে প্রজাদের কাছ থেকে সুদে-আসলে খাজনা বা কর আদায় করত।
জমিদারি প্রথা সৃষ্টি সম্পর্কে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান প্রণীত ‘আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ ধারা’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে যত খুশি খাজনা ও কর আদায় করে তার একটি নির্দিষ্ট অংশ ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য এক নতুন জমিদার শ্রেণী সৃষ্টি করা হয়। এই জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য ইংরেজরা বাংলা ও বিহারের নিষ্ঠুরতম দস্যু সরদারদের ‘নাজিম’ নিয়োগ করে। নাজিম নামক এই দস্যুদের অত্যাচার ও লুণ্ঠন সম্পর্কে কোম্পানির দলিলপত্র থেকেও জানা যায়। বাংলা ও বিহারের রাজস্ব কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ১৭৭২ সালের ৩ নভেম্বর ইংল্যান্ডে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব ডাইরেক্টরসকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘নাজিমরা জমিদার ও কৃষকদের কাছ থেকে যত বেশি পারে কর আদায় করে নিচ্ছে। জমিদারেরাও নাজিমদের কাছ থেকে চাষিদের লুণ্ঠন করার অবাধ অধিকার লাভ করেছে। নাজিমরা আবার তাদের সবার (জমিদার ও কৃষকদের) সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার রাজকীয় বিশেষ অধিকারের বলে দেশের ধনসম্পদ লুট করে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছে। ১৭৬৫-৬৬ সালে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর সে বছরই তারা প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ দুই কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সে আদায়ের পরিমাণ আরো কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।
ইংরেজদের রাজস্বনীতি ও ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন ‘এই সকল ব্যবস্থার ফলে চাষিদের পিঠের ওপর বিভিন্ন প্রকারের পরগাছা শোষকদের একটা বিরাট পিরামিড চাপিয়ে বসে। এই পিরামিডের শীর্ষদেশে রহিল ইংরেজ বণিকরাজ, তার নিচে রহিল বিভিন্ন প্রকার উপস্বত্বভোগীর দলসহ জমিদারগোষ্ঠী। এই বিরাট পিরামিডের চাপে বাংলা ও বিহারের অসহায় কৃষক সর্বস্বান্তÍ হয়ে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়াল।’
জমিদারদের চাবুকের কশাঘাতে কৃষক প্রজার পিঠের চামড়া যখন রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন রক্তে রঞ্জিত কৃষক/প্রজার জন্য ছায়া হিসেবে প্রণীত হলো প্রজাস্বত্ব আইন এবং গঠিত হয়েছিল ঋণ শালিসি বোর্ড। জমিদারি প্রথা বিলোপের মাধ্যমে কৃষক প্রজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও অত্যাচার নির্যাতনের হাতবদল হয়েছে মাত্র, কিন্তু সাধারণ মানুষ অত্যাচার-নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভ করেনি। বাঘের মুখ থেকে রক্ষা পেয়ে কুমিরের মুখে পড়েছে। শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পুনরায় ধীরগতিতে আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে ব্রিটিশ পাক-ভারত উপমহাদেশ ছাড়তে বাধ্য হলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট সৃষ্টি হলো স্বাধীন পাকিস্তান ও পরের দিন স্বাধীন হলো ভারত। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান জনগণের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারে পাকিস্তান একটি সংবিধান প্রণয়ন করল। ১৯৫৬ সালের ৯ জানুয়ারি নতুন গণপরিষদ শাসনতন্ত্র রচনার কাজ শুরু করে। ২ মার্চ গভর্নর জেনারেল নতুন শাসনতন্ত্রে স্বাক্ষর করেন এবং ২৩ মার্চ থেকে তা বলবৎ হয়। শাসনতন্ত্রে ‘পূর্ব বাংলা’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়। পশ্চিমাঞ্চলের সব প্রদেশ একীভূত করে এক ইউনিটের ভিত্তিতে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ নাম রাখা হয়। দুই প্রদেশের মধ্যে সংখ্যাসাম্য নীতি প্রবর্তন করা হয়। বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষারূপে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং যুক্তভাবে নির্বাচনপদ্ধতি চালু করা হয়। সে সংবিধানে প্রণেতারা নাগরিকদের সাথে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা রক্ষা করার পরিবর্তে বারবার সে অধিকারকে পদদলিত করেছে শুধু নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার স্বার্থে।
‘পাকিস্তানের সংবিধান’ জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার ক্ষোভ থেকে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন, যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর; পাকহানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের কার্যক্রম। গণমানুষ অধিকারবঞ্চিত হয়েই ৭১ বছরের ব্যবধানে স্বাধীনতা লাভে দুইবার সফল হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে অর্থাৎ শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে গণমানুষ কি নিজ অধিকার রক্ষা করতে পেরেছে?
বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী গণমানুষের অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে একটি সংবিধান প্রণয়ন করে যা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে কার্যকর হয়।
সরকার কর্তৃক সর্বশেষ মুদ্রিত (১৮ এপ্রিল ২০১৬) সংবিধানের উপক্রমনিকার প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘‘বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছায় তাহাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত জনগণের অধিকারের দলিল ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’। দেশের জনগণ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, এই সংবিধান তারই অভিব্যক্তি, তাই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। এই সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, জনগণের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা ও বিচার বিভাগের কার্যপরিধিসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ামক দলিল। সংবিধান যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আইন, সেহেতু সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন বৈধ নয় এবং এমন কোনো আইন বা এর অংশবিশেষ যদি সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহা হইলে সেই আইন বা আইনের অংশবিশেষ বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে।” এই সংবিধান যা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ নামে পরিচিত. সে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে অনুচ্ছেদ-২৬ থেকে ৪৪ পর্যন্ত জনগণের মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি বা জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারনামা প্রদান করেছে, তার বাস্তবায়ন গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার কি করছে? নাকি নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য ভিন্ন আইন প্রণয়ন ও আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেছে?
সংবিধান বলতে কী বুঝায়? এক দিকে বলা হচ্ছেÑ ইহা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, অন্য দিকে এ আইনের স্বীকৃত গণমানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দেয়া ‘সাংবিধানিক অধিকার’ রাষ্ট্র দ্বারাই খর্ব করা হচ্ছে ‘মৌলিক অধিকার’কে পদদলিত করে। সংবিধান কি এ সম্পর্কে মাহমুদুল ইসলাম প্রণীত Constitutional law of Bangladesh এ বলা হয়েছে, ÒA constitution adopted through democratic process is expected to reflect the consensus of the people about their political organization and the democratic values they cherish. Whatever may be written in a constitution, the success of democracy and realization of the democratic values depends on a proper environment created by the actors in the political scene who must have faith and conviction in the utility and effectiveness of the rule of law and constitutionalism and must work relentlessly to establish it. In the absence of such conviction and commitment, the constitutional law may turn into what Wade and Bradley called “a transparent cover for a power-struggle that is not conducted in accordance with anything deserving the name of law”. ি. মাহমুদুল ইসলাম তার প্রণীত বই-এ সংবিধানকে একটি Commitment. অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন যা রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণ বা নাগরিকদের প্রতি একটি প্রতিশ্রুতি।
‘জায়দা সিতানি’ জমিদার কর্তৃক নাগরিকদের প্রতি প্রদত্ত একটি প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার, যা ক্ষেত্রমতে জমিদারেরা রক্ষা করেনি। ফলে জনগণ জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটিয়ে তাদের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। রক্তের অক্ষরে প্রণীত ‘সংবিধান’ যেখানে তার দেয়া সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না, সেখানে জনগণ এর প্রতিকার বা প্রতিশোধ নেবে কোনো পদ্ধতিতে? অধিকারবঞ্চিত জনগণ তার শেষ আশ্রয় কোথায় খুজে নেবে? জনগণকে এর সমাধান করতেই হবে, নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রয়ে যাবে মৌলিক অধিকারবঞ্চিত একটি বাংলাদেশ, যা কারো কাম্য হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশকে সিকিম, ভুটান হতে দেয়া যাবে না, এটাই হোক জনগণের সাথে জনগণের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার।হ
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী
taimuralamkhandaker@gmail.com

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.