রাজপথ নয় যেন স্বপ্নের মৃত্যুফাঁদ

প্রতিদিন গড়ে প্রাণ হারাচ্ছে ১৬ জন
আবু সালেহ আকন

মাত্র তিন দিন আগে কন্যাসন্তানের জনক হয়েছেন নাজিম উদ্দিন। স্ত্রী এখনো হাসপাতালে। ১৪ বছরের সংসারজীবনে এটিই তার প্রথম সন্তান। কত স্বপ্ন ছিল এই সন্তানকে ঘিরে। কিন্তু সব কিছু মিশে গেল রাস্তায়। এভাবে কত যে স্বপ্ন রাস্তায় মিশে যায়, তার খবর রাখে ক’জন? নাজিম উদ্দিন গত বৃহস্পতিবার ঘাতক বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন। এভাবে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ রাস্তায় পিষ্ট হচ্ছেন। কেউ হাত হারাচ্ছেন, কেউ পা, কেউ আজীবন পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে থাকছেন। এর সবই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গড়ে প্রতিদিন ১৬ জনের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। আর আহত হচ্ছেন ৩৫ জনের ওপরে। যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে থাকছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, রাজপথ যেন এখন মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
নাজিম উদ্দিনের মৃত্যু নিয়ে হাসান জাভেদ তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘ঘাতক খান সেনারা এবার কেড়ে নিয়েছে ঢাকার লালমোহন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ নাজিম উদ্দিন ভাইয়ের প্রাণ। সকালে মেয়র হানিফ ফাইওভারে শ্রাবণ পরিবহনের দু’টি বাসের পাল্টাপাল্টিতে মোটর সাইকেলচাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান।’
১৪ বছরের সংসারজীবনে গত তিন দিন আগে তাদের ঘরে একটি কন্যাসন্তান এসেছে। এ সময়ে চলে গেলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল ভাইটি। ভাবী হাসপাতালে। জানি, টাকার-মতার কাছে খান সেনাদের বিচার হবে না। আল্লাহ তুমিই পারো...।’
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, সড়ক পরিবহন সেক্টর বেপরোয়া হয়ে গেছে। এর কারণগুলো হচ্ছেÑ প্রথমত, এই সেক্টরটি ক্ষমতাসীনেরা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে শ্রমিকেরা বেপরোয়া। পুলিশ এবং বিআরটিএ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চালকদের মধ্যে লাখের ওপরে রয়েছে যাদের কোনো লাইসেন্স নেই। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না। তারা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। তৃতীয়ত, কোনো চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তাকে শাস্তি দিতে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হতে হয়। যথাযথ শাস্তি দেয়া যায় না। আর শাস্তি না হওয়ায় বারবার একই ঘটনা ঘটছে। চতুর্থত, চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ শেষেই কোনো চালককে লাইসেন্স দেয়া উচিত। এরপর রয়েছে চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজির ক্ষতি পোষাতে অতিরিক্ত ট্রিপ মারতে হয় চালকদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি আলোচিত রাজিব হত্যা, রোজিনা হত্যাসহ প্রতিটি ঘটনায় গ্রেফতারকৃত গাড়িচালক জামিনে মুক্ত হয়ে গেছে। এসব নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করলেও তাদের কিছুই করার নেই। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, তারা কোনো বিচারই পাচ্ছেন না। চালকেরা পথচারীদের পিষে মারছে; কিন্তু কোনো বিচার হচ্ছে না।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বলেন, চালকদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। ওরা তো অশিক্ষিত। দোষ মালিক আর সরকারের। তিনি বলেন, মালিকেরা চুক্তিতে গাড়ি দেয়। নির্দিষ্ট করে দেয় চালকেরা কত টাকা দেবে। ওই টাকা তুলে নিজেদের জন্য রোজগার করতে গিয়েই চালকেরা বেপরোয়া হয়ে পড়ে। আর তখনই দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, অনেক রাস্তা চলাচলের উপযোগী নেই। সরকার সে দিকে নজর দেয় না। ফুটপাথে সরকারের লোকজন হকার বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে। আর পথচারীরা রাস্তা দিয়ে হাঁটেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৮৪১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৪৭৭ জন। এর মধ্যে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন ২৮৮ জন।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, দুর্ঘটনার সব উপাদানই রাস্তায় আছে। দুর্ঘটনা তো ঘটবেই। তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খল এবং উচ্ছৃঙ্খলতা দু’টোই রয়েছে। রাস্তায় আইন-কানুনের কোনো বালাই নেই। ট্রাফিক পুলিশ ইচ্ছেমতো সিগন্যাল দিচ্ছে, ইচ্ছেমতো গাড়ি ছাড়ছে। লালবাতি জ্বলছে কিন্তু গাড়ি চলছে, আবার সবুজ বাতিতে গাড়ি থামিয়ে রাখা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। আবার ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে। এভাবে যদি কেউ বলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব তা অনেকটা হাস্যকর।
পরিবহন শ্রমিক নেতা আলী রেজা নয়া দিগন্তকে বলেন, শ্রমিকদের গালাগাল করে কোনো লাভ নেই। মালিকেরা চুক্তিতে শ্রমিকদের কাছে গাড়ি দেয়। চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে পরদিন আর গাড়ি দেয় না। চুক্তির টাকা পরিশোধ করে পেটের জন্য রোজগার করতে হয়। যে কারণে শ্রমিকদের রাস্তায় পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.