বাবুবাজার সেতুর ঢাল থেকে কেরানীগঞ্জ সড়কের বেহাল দশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই রাস্তায় যানজটে আটকে থাকছেন যাত্রীরা
বাবুবাজার সেতুর ঢাল থেকে কেরানীগঞ্জ সড়কের বেহাল দশা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই রাস্তায় যানজটে আটকে থাকছেন যাত্রীরা

হাঁটলে পাঁচ মিনিট গাড়িতে দুই ঘণ্টা

কেরানীগঞ্জের রাস্তা
আবু সালেহ আকন ও শামীম হাওলাদার

বাবুবাজার ব্রিজ থেকে কেরানীগঞ্জ র্যাব কার্যালয় পর্যন্ত হেঁটে যেতে সময় লাগে ৫ মিনিট। অথচ কখনো কখনো এই রাস্তাটুকু পার হতে যাত্রীদের বসে থাকতে হয় দুই ঘণ্টার ওপরে। এভাবে চলছে প্রায় ৬ মাস। যাতায়াতের জন্য যারা এই রাস্তাটি নিয়মিত ব্যবহার করেন তারা সব সময় থাকেন আতঙ্কের মধ্যে। কখনো কখনো বড় বড় গর্তে পড়ে বাস প্রায় কাত হয়ে যায়। এসব বাসযাত্রীর চিৎকার শুনতে এখন এলাকার মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।


ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ মোড় থেকে বাবুবাজার ব্রিজের সামনে পর্যন্ত ফোর লেনের রাস্তা সংস্কার চলছে। দীর্ঘদিনের এ সংস্কারে চরম ভোগান্তিতে এলাকাবাসী। তা ছাড়া অবৈধ লেগুনা, সিএনজি ও অটোরিকশার উৎপাত এবং মাওয়াগামী বিভিন্ন পরিবহন চলাচলে যানজটে আরো বেশি নাকাল হাজার হাজার মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, এসব পরিবহন থেকে নিয়মিত চাঁদা নিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা।


সূত্র জানায়, ৬ মাস ধরে কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ মোড় থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত ফোর লেনের কাজ চলছে। এ রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে ভেঙে দেয়া হয়েছে বহু বাড়িঘর ও দোকানপাট। কয়েকটি মার্কেটের সামনের অংশও ভাঙা হয়েছে। পদ্মা সেতুর সাথে এ রাস্তা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তাই জনগণের চলাচলের সুবিধার্থে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ কাজের জন্য দীর্ঘদিন পরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ থাকার পরে মাসখানেক আগে সীমিত আকারে পরিবহন চলাচল শুরু করেছে। তন্মধ্যে এন মল্লিক, শতাব্দী, ডিএম, ইলিশ, মাওয়া, দিশারী, আজমেরী, স্বাধীন এক্সপ্রেস, এভারেস্ট, ডিএনকে ও কার্তিকপুরসহ আরো বেশ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির গাড়ি নিয়মিত চলছে এই রুট দিয়ে। তা ছাড়া অসংখ্য সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে এই রাস্তায়। যোগযোগমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী জিঞ্জিরা থেকে কেরানীগঞ্জের ওপর দিয়ে নবাবগঞ্জ ও দোহার হয়ে এই রাস্তাটি ফোরলেন হবে এবং এটি পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে।


সরেজমিনে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের কদমতলী, ব্রিজের ঢাল, বেগুনবাড়ি, চুনকুটিয়া, সাবান ফ্যাক্টরির মোড় ও কালিগঞ্জ মোড়ে যানজট লেগেই থাকছে। ৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এতে নাকাল হয়ে পড়ছে স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রী ছাড়াও মাওয়া ও ঢাকামুখী হাজার হাজার মানুষ। এমনকি সরকারি দুই হাসপাতাল মিটফোর্ড ও ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগী যানজটে নাকাল হচ্ছেন।


সবচেয়ে বেশি যানজট বাবুবাজার ব্রিজের ঢালে। গুলিস্তান ও নয়াবাজার থেকে আসা লেগুনাগুলো ব্রিজের ঢাল থেকে ঘুরাচ্ছে ড্রাইভাররা। এ কারণে সকাল বিকেল ও রাতে যানজট লেগেই থাকছে। এ ছাড়া সিএনজি ও ভ্যানগাড়ি স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে দুই পারে। এসব লেগুনার মধ্যে যৌথ পরিবহন, মহানগর, এমপিসহ প্রায় ৭-৮ নামধারী কোম্পানির লেগুনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আব্দুল্লাহপুর পরিবহন নিয়ন্ত্রণে সায়েম, যৌথ পরিবহন নিয়ন্ত্রণে হাজী আসকর আলী, গ্রিন ঢাকার সদর আলী ও সালাউদ্দিনরা এসব ছোট যান নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব লেগুনার কোনো রুট পারমিট নেই। তা ছাড়া বেশির ভাগ ফিটনেসবিহীন। যেকোনো পুলিশ সদস্য বাধা দিলে তাকে বদলির হুমকি ছাড়াও নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। আবার পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য নিয়মিত চাঁদা নিচ্ছে মালিক-চালকদের কাছ থেকে। বিভিন্ন লেগুনা কোম্পানির একাধিক ড্রাইভার নাম প্রকাশ করার না করার শর্তে জানান, তারা গরিব মানুষ। শিখছে ড্রাইভিং। তারা যাবেন কোথায়। গাড়ির ফিটনেস বা রুট পারমিট আছে কি না তা দেখলে পেট চলবে না তাদের।


ব্রিজের ঢালে লেগুনা সিএনজি ঘুরানোর বিষয়ে তারা বলেন, তাদেরকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে বলেইতো তারা সুযোগ নিচ্ছে। অসংখ্য লেগুনা-অটোরিকশা থাকার পরেও এখানে গাড়ির সঙ্কট রয়েছে। বিশেষ করে সকালে ওপার থেকে আসতে এবং বিকেলে বাবু বাজারের দিক থেকে যেতে যাত্রীদের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটছে। গত শুক্রবার আশিক নামে এক যাত্রীকে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে অপর এক যাত্রী। এ দিকে, কেরানীগঞ্জের রাস্তায় এভাবে যানজট সৃষ্টি হওয়ায় এবং রাস্তার দুরবস্থার কারণে এই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যও চরম সঙ্কটে পড়েছে।


কদমতলী মোড়টি চৌরাস্তা হিসেবে পরিচিত। ডান দিকে রুহিতপুর, উপজেলা পরিষদ ও বান্দুরা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা। ঠিক সোজা মাওয়া রোড। বামে ও আশপাশে ছোট ছোট আরো রোড রয়েছে। এ মোড়ের দু’পাশে যানজট লেগেই থাকে। তা ছাড়া সার্বিক, চন্দ্রা, এভারেস্ট ও দিশারী পরিবহন স্ট্যান্ড করা হয়েছে। দু’পাশে এ পরিবহনগুলোর গাড়ি থামিয়ে রাখছে। আর তাদের সময় মতো ছাড়ছে।


বাগানবাড়ি এলাকায় এক পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে, অন্য পাশে রাস্তা সংস্কারের কাজ চলছে। তা ছাড়া ছোট একটা ব্রিজ করছে কর্তৃপক্ষ। এখানে দিনভর যানজট লেগে থাকছে।


চুনকুটিয়া চৌরাস্তায় পূর্ব পাশে বড় দু’টি বাজার। একটি কাঁচা তরকারি ও মুদিদোকান এবং অন্যটি মাছ বাজার। সকালে ও বিকেলে এ বাজার বসে। তাই যানজট আরো বেশি লেগে থাকে। তা ছাড়া রাস্তার মাঝখানে খানাখন্দ তো রয়েছেই।
সাবান ফ্যাক্টরি মোড়টিও একটি চৌরাস্তা। এখানেও দিনভর যানজট লেগে থাকছে। কালিগঞ্জ মোড় বিশ্বরোডের একটি অংশে গড়ে উঠেছে বাস, ট্রাক, লেগুনা, সিএনজি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড। এখান থেকে কেরানীগঞ্জ, মাওয়া, আব্দুল্লাহপুর, যাত্রাবাড়ী কদমতলী ও গুলিস্তান ছাড়াও বিভিন্ন রোডে এসব পরিবহন চলছে। আর স্ট্যান্ড থেকে বের হতে সময় লাগছে অনেক। বেশির ভাগ অবৈধ সিএনজি ও অটো চলাচল করছে এই স্ট্যান্ড দিয়ে।


একটু রোদ হলেই এই এলাকায় বাতাসে ধুলো উড়তে থাকে। আর বৃষ্টি হলেই রাস্তায় জমে যায় কাদা। কেরানীগঞ্জ উপজেলার টিআই সুবীর নয়া দিগন্তকে বলেন, কয়েক মাস ধরে অতিরিক্ত ধুলায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে ট্রাফিক পুলিশ। তা ছাড়া রাস্তা কাটা ও খানাখন্দের কারণে যানজট লেগেই থাকছে। নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.