মেয়াদ উত্তীর্ণ কোমল পানীয় থেকে সাবধান
মেয়াদ উত্তীর্ণ কোমল পানীয় থেকে সাবধান

মেয়াদ উত্তীর্ণ কোমল পানীয় থেকে সাবধান

সক্রিয় অসাধু চক্র
শহিদুল ইসলাম রাজী

কোমল পানীয়ের বোতলের গায়ে লেখা মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বছর খানেক আগে। কিন্তু নতুন করে লাগানো তারিখ অনুযায়ী সেই কোমল পানীয়ের মেয়াদ শেষ হতে এখনো দুই বছর বাকি। কিন্তু ক্রেতারা কেনার সময় কোমল পানীয়র এসব বোতল বা ক্যানের গায়ে কী লেখা আছে তা কখনোই খেয়াল করেন না। মেয়াদ আছে কি নেই অতকিছু খেয়াল করার সময় কোথায় তাদের? অনেকেই বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামান না। কেনার পর তা দ্রুত পান করে বোতল বা ক্যান ছুড়ে ফেলে দেন তারা। আর এ সুযোগই নিচ্ছে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। এ চক্রেরই দুইজনকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে র্যাব।


দেশী-বিদেশী কিছু ব্র্যান্ডের কোমল পানীয়ের উৎপাদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ঘসামাজা করে উৎপাদনের এবং মেয়াদোত্তীর্ণের নতুন তারিখ বসিয়ে দেদার বিক্রি করছে ওই অসাধু ব্যবসায়ী চক্রটি। পুরান ঢাকার এ অসাধু চক্রের মাধ্যমেই স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব পানীয় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা নগরীতে প্রতিদিন শতাধিক ফেরিওয়ালা বিভিন্ন নামীদামি ব্র্যান্ডের কোমল পানীয় বিক্রি করছেন। এসব কোমল পানির বোতল থেকে কৌশলে মেয়াদ লেখা জায়গাটি ঘষামাজা করে অস্পষ্ট করে দেয়া হয়। আবার কখনো মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখটি পুরোপুরি মুছে দেয়া হয়। ক্লান্ত পথিকরাও তৃষ্ণার্ত থাকায় মেয়াদ ও মান যাচাই না করেই এসব পানীয় পান করছেন। আর এ সুযোগে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় হকারদের দিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ এসব কোমল পানীয় বিক্রি করাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।


এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোমলপানীয় মানব দেহের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। কারণ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এ ধরনের তরল খাদ্যের কোনো প্রয়োজন নেই। আবার মেয়াদোত্তীর্ণ কোমল পানীয় মানবদেহের জন্য আরো বেশি ক্ষতিকর। এ ধরনের পানীয় সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কৃত্রিম স্বাদ ও রঙযুক্ত বিভিন্ন উপাদান মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বিপরীতমুখী কাজ করে থাকে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।


তবে মেয়াদোত্তীর্ণ সোডা পান স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা। মেয়াদোত্তীর্ণ কোকাকোলা নিয়ে প্রকাশিত এক নিবন্ধে পত্রিকাটি বলেছে, খাবার সোডা খুব বেশি পুরনো হলেও তা খুব অল্পই স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করে। বেশির ভাগ সোডা কোম্পানিই সোডার প্যাকেটের গায়ে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ উল্লেখ করে না; বরং তারা সোডার বাক্স বা কৌটার গায়ে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে ব্যবহার করা উত্তম বলে উল্লেখ করে।


গত বুধবার রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের বেগমবাজারে অভিযান চালিয়ে আমদানি করা পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ সিল পরিবর্তন করে মেয়াদ বাড়িয়ে প্রতারণার অভিযোগে দুই ব্যবসায়ীকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তারা হলেনÑ বেগম বাজারের দিদার অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক খালেদ মাহমুদ ও আবু সাঈদ রাজ।


র্যাব জানায়, গত বুধবার রাত ১০টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত এ অভিযান চালানো হয়। এ সময় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৪ হাজার কোমল পানীয়ের ক্যান জব্দ করা হয়। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, মালিকেরা মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার লোভে আমদানি পণ্যের মেয়াদ বাড়িয়ে দুই বছর ১০ মাসের সিল লাগিয়ে সেগুলো বাজারজাত করছিলেন। অভিযানে গিয়ে আমরা দেখেছি, মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা কোমল পানীয় রেডবুল, মিরিন্ডা ও এটলাস মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানে এসব পণ্যের তারিখ পরিবর্তন করে উৎপাদনের তারিখ করা হয়েছে ২০১৭ সালের জুলাই মাস এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ করেছে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত।


বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সহকারী পরিচালক রেজাউল হক বলেন, আমাদের আইনে ভেজাল বলতে কিছু নেই। আমরা শুধু পণ্যের গুণগত মানটা পর্যবেক্ষণ করে থাকি। এ ক্ষেত্রে আমরা খেয়াল করি পণ্যটি মানসম্পন্ন নাকি মানহীন। যখনই কোনো পণ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায় তখন সেটি মানহীন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে বিএসটিআইর ১৯৮৫-এর ২৪ ধারা মোতাবেক অভিযুক্তকে এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা সর্বোচ্চ চার বছরের কারাদণ্ড দেয়ার বিধান আছে। এ ছাড়া উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করারও বিধান আছে।


পথচারী ও যাত্রীদের অভিযোগ, এসব কোমল পানীয়ের বোতল বা ক্যানে মেয়াদের তারিখ এত ছোট করে লেখা থাকে যে তা যে কোনো বয়সী মানুষের পক্ষে খালি চোখে দেখা খুবই কষ্টকর। পানীয়গুলো মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও চকচকে মোড়ক আর ঠাণ্ডা মুখরোচক হওয়ায় কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়াই পান করছেন তারা।


দীর্ঘ দিন ধরে রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, বায়তুল মোকাররম, মতিঝিল, প্রেস ক্লাব, শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, মগবাজার, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, এয়ারপোর্ট ও মিরপুর হকার বা ফেরিওয়ালাদের কাছে থাকা পানি-জুসসহ কিছু কিছু পণ্যের দু-এক মাস মেয়াদ থাকতে দেখা যায়। আবার অনেকগুলোতে মেয়াদের তারিখই থাকে না। এগুলোর ভেতরে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য লুকিয়ে রেখে বিক্রি করছে তারা।


গুলিস্তানে আব্দুর রহিম নামে এক পথচারী বলেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে এক হকারের কাছ থেকে একটি ম্যাংগো জুস কিনে অর্ধেক খাওয়ার পরেই হঠাৎ মনে পড়ল মেয়াদ আছে কি না। কিন্তু বোতলের গায়ে কোথাও মেয়াদ না পেয়ে এ ব্যাপারে হকারকে জিজ্ঞাসা করেছি মেয়াদ নেই কেন? উত্তরে সে বলে, বেশি কথা না বলে টাকা দেন চলে যাই। এ পথচারী ঢাকা নগরীর হকারদের ভেজালবিরোধী অভিযানের আওতায় আনার দাবি জানান।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.