২২ নভেম্বর ২০১৮

৪২ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট-সম্পূরক শুল্কের বোঝা

৪২ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট-সম্পূরক শুল্কের বোঝা - ছবি : সংগৃহীত

আগামী অর্থবছরে ৪২ হাজার কোটি টাকারও বেশি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের অতিরিক্ত বোঝা চাপছে জনগণের ওপর। এই পরিমাণ অর্থ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায়ের পরিকল্পনা করেছে সরকার। আগামী ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের মাধ্যমে আদায়ের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের এ খাতের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৭ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। 

অন্য দিকে সম্পূরক শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও ব্যাপক হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ খাত থেকে আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা হবে ১৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সম্পূরক শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা। ফলে আগামী অর্থবছরে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের টার্গেট করা হয়েছে ৪১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেট ডকুমেন্ট থেকে এ তথ্য জানা গেছে। 
বাজেট ডকুমেন্টে দেখা গেছে, চার অর্থবছরের ব্যবধানে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হয়েছে প্রায় আড়াই গুণ। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট ছিল ৪৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। চার বছরের ব্যবধানে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হয়েছে ৬৫ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। শতকরা হারে এ বৃদ্ধির হার ১৪৪ শতাংশ। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক থেকে রাজস্ব আদায় করা হয়েছে ২১ হাজার ৮০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে ৪৮ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা। চার বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হয়েছে ২৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। শতকরা হারে এ বৃদ্ধি ১২৮ শতাংশ। 

অর্থমন্ত্রী তাদের বাজেট বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক আহরিত রাজস্বের মধ্যে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও সম্পূরক শুল্ক হতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়’। জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার উত্থাপিত ‘অর্থ আইন ২০১৮’-এ ৪৩০টিরও বেশি পণ্য বা পণ্যসামগ্রীর ওপর সম্পূলক শুল্ক আরোপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে কিছু পণ্যের সম্পূরক শুল্ক অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আবার কিছু পণ্যের সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি বা হ্রাস করার কথা বলা হয়েছে। পণ্যের প্রকার ভেদে সর্বনিম্ন ১০ এবং সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক ধার্য রয়েছে। 

বাজেটে ব্যাপক হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব : অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি পণ্যের ওপর বড় মাত্রায় সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- এনার্জি ড্রিংকের ওপর সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যবহৃত সব ধরনের প্রসাধন সামগ্রীর ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন। এখানেই শেষ নয়, পুরুষদের শেভের আগে বা পরে ব্যবহার্য সামগ্রী, শরীরে দুর্গন্ধ এবং ঘাম দূরীকরণে ব্যবহৃত সামগ্রীর ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ, গরিব মানুষের সিগারেট পেপার ও বিড়ি পেপারের ওপর ২০ থেকে ২৫, সিরামিক বাথটাব ও জিকুজি, শাওয়ার, শাওয়ার ট্রের ওপর সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্থ বিল-২০১৯ অনুযায়ী, কফি, গ্রিন টি, গোল মরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, জিরার ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক রয়েছে। পাশাপাশি, পরিশোধিত নারিকেল তেল ওপর ৩০ শতাংশ, তরল গ্লকোজ ২০ শতাংশ, ফিনিসড চকলেট ৪৫ শতাংশ, খুচরা মোড়কে শূন্য থেকে এক বছরের শিশুদের ব্যবহারের জন্য খাদ্য সামগ্রীর ওপর ২০ শতাংশ, অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ২০ শতাংশ, মিষ্টি বিস্কুট ৪৫ শতাংশ, ওফারস ৪৫ শতাংশ, পটোটো চিপস ৪৫ শতাংশ, সস-২০ শতাংশ, কোমল পানীয় ১৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক রয়েছে। 

সর্বত্র ভ্যাটের খড়গ : মধ্যবিত্তের কার না সাধ জাগে নিজের একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হোক। তাদের সারা জীবনের স্বপ্ন থাকে এক ছোট্ট ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার, কিন্তু সেখানেও অতিরিক্ত ভ্যাটের খড়গ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভবন নির্মাণ সংস্থা খাতে ১-১১০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ হারে, ১১০১-১৬০০ বগফুট পর্যন্ত ২.৫ শতাংশ হারে, ১৬০১ বর্গফুট থেকে তদূর্ধ্ব ৪.৫ শতাংশ মূসক আরোপিত আছে। আবাসন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১-১৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে, ১৬০১ বর্গফুট হতে তদূর্ধ্ব পরিমাপের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ৪.৫ শতাংশ হারে মূসক (ভ্যট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। পুরনো ফ্ল্যাট পুনঃরেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ফলে নতুন ফ্ল্যাটের পাশাপাশি পুরনো ফ্ল্যাটের দামও আগামীতে বেড়ে যাবে। 
আসাবাবপত্রের ওপরও বর্ধিত ভ্যাট : বর্ধিত ভ্যাট দিয়ে হয়তো কেউ আগামী বছর একটি ফ্ল্যাট কিনলেন। কিন্তু ফ্ল্যাট সাজানোর জন্য তো আসবাবের প্রয়োজন। সেখানেও অর্থমন্ত্রী বর্ধিত ভ্যাট আরোপ করেছেন। অর্থমন্ত্রী আসবাবপত্র উৎপাদন পর্যায়ে ৬ শতাংশের স্থলে ৭ শতাংশ এবং বিপণন পর্যায়ে ৪ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ মূসক আরোপের করেছেন। ফলে এসব আসবাব সামগ্রীর দাম বেড়ে যাবে। 

বাজেটে পরিবহন ঠিকাদার (পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে), নিলামকৃত পণ্যের ক্রেতা (ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে নিলামসহ), নিজস্ব ব্র্যান্ডসংবলিত তৈরী পোশাক বিপণনের ক্ষেত্রে বর্তমানে আরোপিত ৪ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে বিক্রয়ের জন্য ব্র্যান্ডবিহীন পোশাক পণ্যের বিপণনের ক্ষেত্রেও সমহারে ভ্যাট প্রযোজ্য হবে। ফলে স্থানীয় তৈরী পোশাকের দাম বেড়ে যাবে আগামী অর্থবছরে। 

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপর ৪.৫ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম মূসক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের মূসক ৪ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বর্তমানে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পণ্য বা সেবার পরিসরকে আরো বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ভার্চুয়াল বিজনেস নামে একটি সেবার সংজ্ঞা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইনভিত্তিক যেকোনো পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরকে এ সেবার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হবে। তাই ভার্চুয়াল বিজনেস সেবার ওপর ৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। 

অন্য দিকে, ভোটের দিকে নজর দিয়ে অর্থমন্ত্রী ১০০ টাকা মূল্যমান পর্যন্ত পাউরুটি, হাতে তৈরি বিস্কুট কেকের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করেছেন। এগুলোর ওপর বর্তমানে চার ভাগ হারে ভ্যাট আরোপিত রয়েছে। সাথে ১৫০ টাকা মূল্যমানের চপ্পলের ওপরও ভ্যাট প্রত্যাহের প্রস্তাব করা হয়েছে।

 


আরো সংবাদ