২১ নভেম্বর ২০১৮

ঋণের সুদহার কমাতে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঋণের সুদহার কমাতে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক - ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংকঋণের সুদহার কমাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সুদহার সংক্রান্ত চারটি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আলোকে প্রায় দুই ডজন ব্যাংককে নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ইচ্ছেমাফিক সুদ চার্জ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরই ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রতিনিয়তই ব্যাংকগুলোর সার্বিক অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুদহার কমাতে ব্যাংকগুলোর ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ কারণে বিকল্প পদ্ধতিতে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বলা হচ্ছে, ইচ্ছেমাফিক সুদ আদায় করা যাবে না। কোনো গ্রাহকের ঋণের সুদ বাড়াতে হলে কমপক্ষে তিন মাস আগে গ্রাহককে অবহিত করতে হবে। আবার বলা হয়েছে, ঋণ আমানতের সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। আবার বলা হয়েছে, ঋণ আমানতের সুদহারের হিসাবায়নের ক্ষেত্রে এসএমই ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবার বলা হয়েছে, যে খাতে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সুদহার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও সুদহার বাড়ানোর সব পথ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাজারে কাগজে কলমে নগদ টাকার সঙ্কট নেই। কিছু কিছু ব্যাংকের আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে তাদের নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এটাকে পুঁজি করে ব্যাংকগুলো বিকল্প পদ্ধতিতে ন্যক্কারজনকভাবে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার এক শতাংশ কমিয়ে নিয়েছে। এতে বাজারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। একই সাথে সরকারি তহবিলেরও ৫০ শতাংশ বাগিয়ে নিয়েছে অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে। এর পাশাপাশি রেপোর হার কমানো হয়েছে। ঋণ আমানতের হার কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকরের সময়সীমা এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এত সব ছাড় দেয়ার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে অর্থাৎ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ঋণের সুদহার কমানো তো দূরের কথা অনেকটা ফ্রি স্টাইলে সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে কোনো কোনো ব্যাংক। গ্রাহককে না জানিয়ে কয়েকটি ব্যাংক দুই মাসে তিন দফা ঋণের সুদহার দেড় থেকে তিন শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ঋণের সুদহার শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্নভাবে ব্যাংকগুলোর ওপর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আরোপ করা হচ্ছে।

প্রথমে গত ৩০ মে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়। বলা হয়, ব্যাংকগুলো বিভিন্ন প্রকার ঋণের সুদহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি করছে। ঋণের সুদহার যেভাবে অযৌক্তিক মাত্রায় বৃদ্ধি করা হচ্ছে তা উদ্বেগজনক। এ প্রেক্ষিতে উৎপাদনশীল খাতসহ বিভিন্ন খাতে ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের লক্ষ্যে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ ছাড়া অন্যান্য খাতে ঋণ ও আমানতের গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়।
একই দিনে এ সংক্রান্ত আরো একটি সার্কুলার জারি করা হয়। ব্যাংকগুলোর সুদহারের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত সার্কুলারে বলা হয়েছে, ‘ফ্রি স্টাইলে ঋণের সুদহার আর বাড়ানো যাবে না। কমপক্ষে তিন মাস আগে গ্রাহককে ঋণের সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে অবহিত করতে হবে। বছরে এক বারের বেশি ঋণের সুদহার বাড়ানো যাবে না। তাও আবার মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে বছরে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং অন্য ঋণের ক্ষেত্রে ১ শতাংশের বেশি সুদহার বাড়ানো যাবে না।’ 

গত ৫ জুন এ সংক্রান্ত আরো একটি সার্কুলার জারি করা হয়, এতে বলা হয়, বিতরণকৃত ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যে উদ্দেশ্যে ঋণ প্রদান করা হবে সে উদ্দেশ্যেই ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত তদারকি করতে ব্যাংকগুলোকে ফের নির্দেশ দেয়া হয়।

সর্বশেষ গত ১২ জুন এ সংক্রান্ত আরো একটি সার্কুলার জারি করা হয়। আগে এসএমই ঋণকে স্প্রেড হিসেবের ক্ষেত্রে গণ্য করা হতো না। এতে অনেকেই এসএমই ঋণের নামে অন্য ঋণেও সুদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসএমই ঋণে ইচ্ছেমাফিক ঋণ আদায় বন্ধে এখন স্প্রেড হিসাবায়নের ক্ষেত্রে এসএমই ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ১২ জুন জারিকৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ভোক্তা ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ঋণ ছাড়া অন্যান্য ঋণের সাথে এসএমই খাতের ঋণের সুদহারও হিসাবায়ন করে ঋণ ও আমানতের গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। এভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার বাড়ানোর ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য সব দরজাই বন্ধ করে দিচ্ছে। একই সাথে প্রায় ডজন দুই ব্যাংককে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


আরো সংবাদ