১৯ নভেম্বর ২০১৮

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টির ব্যাপারে যা বললো অস্ট্রেলিয়া

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টির ব্যাপারে যা বললো অস্ট্রেলিয়া - সংগৃহীত

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কিছু চীনা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছেন। চীনও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বেশ কিছু মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ পদক্ষেপে বিশ্ববাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

চীন-মার্কিন এই বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের সমালোচনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী স্টিভেন কিয়েবো।

সম্প্রতি সিডনিতে এক সংবাদ সম্মেলনে কিয়েবো জানান, চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন পণ্যের ওপর চীনের শুল্কারোপ বিশ্ব বাণিজ্য বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উভয় দেশের এ পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যযুদ্ধে রুপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে অস্ট্রেলিয়া। এতে সারা বিশ্বেরই বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা অস্ট্রেলিয়ার।

যুক্তরাষ্ট্রের উল্টো পথে অস্ট্রেলিয়া
দৈনিক গার্ডিয়ান

ইসরাইলের তেল আবিব থেকে জেরুসালেমে দূতাবাস সরিয়ে নেবে না অস্ট্রেলিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আমেরিকাকে অনুসরণ করে দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

ইসরাইলের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির কয়েক জন নেতা দূতাবাস জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানোর পর এ খবর প্রকাশিত হলো। 

জুলি বিশপ বলেছেন, জেরুসালেমের বিষয়ে আমাদের অবস্থান চূড়ান্ত এবং এর কোনো পরিবর্তন হবে না। একই সাথে তিনি ফিলিস্তিনিদের সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান।

গত ১৪ মে মার্কিন সরকার সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে তাদের দূতাবাস মুসলিম ভূখণ্ড জেরুসালেমে স্থানান্তর করেছে। সেদিন এর প্রতিবাদে গাজায় যে বিক্ষোভ হয় তাতে ইসরাইলি সেনাদের হামলায় ৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি শাহাদাৎবরণ করেন।

সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের কাছাকাছি স্টার্লিং নৌঘাঁটিকে অস্ট্রেলীয় সরকার উন্নয়নের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ হলে এটা ভারত মহাসাগরে সবচেয়ে বড় নৌঘাঁটিগুলোর একটি হবে। ২৮০ আশি মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারিজ পেইন বলেন, অস্ট্রেলিয়া সরকারের ২০১৬ সালের প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্র অনুযায়ী ভারত মহাসাগর অস্ট্রেলিয়ার জন্য কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এখান দিয়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের কারণে। এটি উন্নয়নের ফলে সামনের দশকগুলোয় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌ-এলাকায় অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত অবস্থান দৃঢ় থাকবে।

অস্ট্রেলীয় সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাদের নৌবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি অস্ট্রেলিয়ার ম্যালকম টার্নবুল সরকারের প্রতিরক্ষা খাতে আগামী এক দশকে প্রায় ১৫৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অংশ। পেইনের কথা থেকে বোঝা যায়, অস্ট্রেলিয়া সরকার এখন এশিয়া-প্যাসিফিকের সঙ্গে ভারত মহাসাগরকেও গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং এই পুরো এলাকায় তার কৌশলগত অবস্থানকে দৃঢ় করার উদ্যোগ নিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনী এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌসদস্যের হিসাবে খুব একটা বড় নয়। রিজার্ভসহ এর সদস্য ২৩ হাজারেরও কম। তবে গত কয়েক বছরে অস্ট্রেলিয়া নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক কাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনী নির্ভরশীল ছিল ১১টা ফ্রিগেটের ওপর। কিন্তু এখন যুক্ত হচ্ছে ৬ বিলিয়ন ডলারে তৈরি ৩টি অত্যাধুনিক ‘হবার্ট-ক্লাস’ এয়ার-ডিফেন্স ডেস্ট্রয়ার, যা স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম জাহাজটি গত সেপ্টেম্বরে কমিশনিং করা হয়েছে। স্পেন থেকে তৈরি করিয়ে আনা হয়েছে ‘ক্যানবেরা-ক্লাস’-এর দুটি বিমানবাহী উভচর অভিযানের যুদ্ধজাহাজ।

২০১৪-১৫ সালে তৈরি সাড়ে ২৭ হাজার টনের এই যুদ্ধজাহাজগুলো পুরো অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক এন্ডেভার-২০১৭’ নামের এক বিরাট সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে এই দুটো জাহাজের একটি এইচএমএএস এডেলেইড, পুরো এশিয়া-প্যাসিফিক ঘুরে আসে, যা চীনের নেতৃত্ব ভালো চোখে দেখেননি। ১৯৮০-এর পর থেকে এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় নৌ-অভিযান। এগুলো ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া সরকার ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির কাছ থেকে ‘বে-ক্লাস’-এর আরও একটি বড় উভচর যুদ্ধজাহাজ কিনে নেয় ২০১১ সালে।

নভেম্বরের ২৪ তারিখে ঘোষণা আসে, অস্ট্রেলিয়া সরকার জার্মানির সহায়তায় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১২টা ৮০ মিটার লম্বা অফশোর পেট্রোল ভেসেল তৈরি করতে যাচ্ছে। বর্তমান ‘আর্মিডেল-ক্লাস’-এর যে জাহাজগুলোর স্থলাভিষিক্ত হবে তার চেয়ে  নতুন জাহজগুলো হবে প্রায় ছয়-গুণ বড় এবং অনেক দূরের সমুদ্রে পাড়ি জমাতে সক্ষম। নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে এই জাহাজগুলোর গুরুত্ব হবে অপরিসীম।

স্পেনের সহায়তায় আরও তৈরি করা হচ্ছে দুটো সাপ্লাই জাহাজ, যা দেশটির যুদ্ধজাহাজগুলোকে আরও দূরের সাগরে অপারেশনে যেতে সহায়তা করবে। ২০২০ সাল থেকে বর্তমান ফ্রিগেটগুলোর স্থলাভিষিক্ত করতে তৈরি করা হবে নয়টি অত্যাধুনিক ফ্রিগেট, যার পরিকল্পনা এখন চলছে। অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর এই ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে  শক্তিশালী অংশটি হলো সাবমেরিন, যার সঙ্গে স্টার্লিং নৌঘাঁটি উন্নয়নের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক।        

অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীতে বর্তমানে রয়েছে ‘কলিন্স-ক্লাস’-এর ৬টা সাবমেরিন। সব সাবমেরিন রয়েছে ভারত মহাসাগরের নৌঘাঁটি স্টার্লিংয়ে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৩-এর মাঝে তৈরি এই সাবমেরিনগুলোর উত্তরসূরি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি করছে ১২টা সাবমেরিন। ফরাসি কোম্পানি ফ্রেঞ্চ নেভাল গ্রুপ তৈরি করছে অত্যাধুনিক এই সাবমেরিনগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী অস্ট্রেলিয়ার স্টার্লিং নৌঘাঁটি তৈরি করে। অত্যন্ত গোপনে তৈরি করা এই ঘাঁটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয় সাবমেরিন অপারেশনের জন্য। এখান থেকে প্রায় শ-খানেক মার্কিন সাবমেরিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশনে অংশ নেয়।

বিশ্বযুদ্ধ শেষের পর স্টার্লিং নৌঘাঁটির গুরুত্ব আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মাঝ দিয়ে যাওয়া পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত নৌপথগুলো স্টার্লিং থেকে অপারেট করা সাবমেরিনের পাল্লার মাঝে পড়বে। পূর্ব এশিয়ার সব জ্বালানিবাহী জাহাজ মালাক্কা প্রণালি এবং অন্যান্য প্রণালি হয়ে ইন্দোনেশিয়ার মাঝ দিয়ে যাতায়াত করে। আর এই জাহাজের যাতায়াতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি সামরিক কার্যকলাপ চলছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অস্ট্রেলিয়া।

গত ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার উত্তরের শহর ডারউইনের কাছাকাছি মার্কিন মেরিন সেনাদের ঘাঁটিতে মার্কিন সর্বোৎকৃষ্ট প্রযুক্তির এফ-২২ স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা শুরু হয়। চীন ও ইন্দোনেশিয়া মার্কিন ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের এহেন সামরিকীকরণে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ২০১১ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়মিতভাবে ১ হাজার ২৫০ জন মার্কিন মেরিন সেনার অপারেশনের ব্যবস্থা করতে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার ‘এবিসি নিউজ’ বলছে, দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনাকে পুঁজি করে মার্কিন সেনাদের এই সংখ্যা আগামী কয়েক বছরে কয়েক গুণ বাড়তে পারে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের অধ্যাপক জন ব্ল্যাক্সল্যান্ড বলেন , অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মার্কিন সেনাদের অবস্থান এই অঞ্চলে মার্কিন কর্মকাণ্ডে অস্ট্রেলিয়াকে জড়িত থাকতে বাধ্য করতে পারে। আর মার্কিনদের ওপর অস্ট্রেলিয়ার সামরিক নির্ভরতা বেড়েই চলেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়া প্রথম এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান পায়। প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার খরচে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৭২টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনছে অস্ট্রেলিয়া।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার সামরিকীকরণ এবং এর সামরিক ঘাঁটিগুলোর উন্নয়নের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সামরিক শক্তিকে পুরোপুরি আটকাতে না পারলেও চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৌশলগত দিক থেকে চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে।


আরো সংবাদ