২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ব্যাংক পরিচালকেরা চাপে

ব্যাংক পরিচালকেরা চাপে - সংগৃহীত

শুধু নানা ধরনের সুবিধা নিয়েই যাবেন, দেশ ও জনগণের জন্য কিছুই করবেন না তা হয় না। এ কারণেই সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে এবার ব্যাংক পরিচালকদের যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা হয়েছে। নয়-ছয় করে কোনোভাবেই তারা যাতে পার না পান সে জন্য নানা দিক থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে। এবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকগুলোকে করপোরেট করে যে ছাড় দেয়া হয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কম সুদে ঋণ না দিলে সেই সুবিধা তারা পাবে না। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও কয়েক সপ্তাহ ধরে ঋণের সুদহার কমাতে ব্যাংকগুলোকে পরোক্ষভাবে চাপ দেয়া হচ্ছে। এ কারণেই ব্যাংক পরিচালকেরা অনেকটা বাধ্য হয়ে গত ২০ জুন ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে অর্থাৎ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। আর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা কামনা করেছেন। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবিরের সাথে সাক্ষাৎ করে এ সহযোগিতা চেয়েছেন বেসরকারি খাতের ব্যাংক পরিচালকেরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের বেসরকারি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোতে এখন টাকার সঙ্কট চলছে। বিশেষ করে ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির পর সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছে। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের মোট তহবিলের ৭০ ভাগ বেসরকারি ব্যাংকে রাখত। ফারমার্স ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা দিতে না পারায় এখন ওই প্রতিষ্ঠান ৫০ শতাংশ তহবিল বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাকি ২০ ভাগ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ব্যাংকটি। ব্যাংকের তহবিল সঙ্কটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে ওই প্রতিষ্ঠানকে ১০০ টাকায় সাড়ে ১০ টাকা মুনাফা দেয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি ওই প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই তার ব্যাংকে আমানত রাখেনি। যে আমানত রেখেছিল তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো ব্যাংকের তহবিল সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তারা সাড়ে ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নিচ্ছে। এ অবস্থায় ৯ শতাংশ সুদে কিভাবে ঋণ বিতরণ করা হবে তা তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। অথচ বিভিন্নভাবে তারা এখন চাপের মুখে আছে। এ বিষয়টি নিয়ে তারা গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে বৈঠক করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সাথে বৈঠক করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ২০ জুন তারা ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, গত তিন মাস ধরে ব্যাংক পরিচালকেরা অর্থমন্ত্রীর সহযোগিতায় নানা ধরনের সুবিধা নিচ্ছেন। যেমন-ব্যাংকে একই পরিবারের চারজন পরিচালক রাখা, আমানতকারীদের স্বার্থে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো, আপৎকালীন সঙ্কট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্প সময়ে ধার নেয়ার জন্য রেপোর সুদহার কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা ইত্যাদি। এর বিপরীতে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আগে আলোচনা না করে একের পর এক এসব সুবিধা নেয়ায় নানাভাবে সমালোচিত হন ব্যাংক পরিচালকেরা। 

সর্বশেষ গত ১৪ এপ্রিল বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সাথে এক বৈঠকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনতে তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনছেন না তারা। উল্টো ক্ষেত্রবিশেষ ঋণের সুদহার দেড় থেকে দুই শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর পর থেকেই সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পরোক্ষ চাপ দেয়ার পাশাপাশি গত ১৯ জুন একযোগে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। পরের দিন ২০ জুন সকালে সরকারি ছয়টি ব্যাংকের সাথে অর্থমন্ত্রী বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। এর পরপরই বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকেরা বৈঠক করে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু কোন ঋণের ক্ষেত্রে এ হার কার্যকর করা হবে তা নির্দিষ্ট করে বলেননি তারা।

এ দিকে গতকাল এনবিআরের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন, ঋণের সুদহার না কমালে করপোরেট কর কমানোর সুবিধা দেয়া হবে না ব্যাংকগুলোকে। গতকাল বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) এক সংবাদ সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসে এ কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলো লাকি যে তাদের করহার কমানো হয়েছে। তবে লেন্ডিং রেট ঠিক না রাখলে ব্যাংকগুলো এ বেনিফিট পাবে না।’

প্রসঙ্গত, অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যমান ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করেছেন। আর অনিবন্ধিত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যমান ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন।
এর আগে ঋণের সুদহার কমাতে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সুদহার সংক্রান্ত চারটি নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কোনো গ্রাহকের ঋণের সুদ বাড়াতে হলে কমপক্ষে তিন মাস আগে গ্রাহককে অবহিত করতে হবে। আবার বলা হয়েছে, ঋণ আমানতের সুদ হারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। আবার বলা হয়েছে, ঋণ আমানতের সুদহারের হিসাবায়নের ক্ষেত্রে এসএমই ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবার বলা হয়েছে, যে খাতে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সুদহার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও সুদহার বাড়ানোর সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকেরা শুধু বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেবেন, আর সরকার, জনগণ ও দেশের স্বার্থে কোনো কিছু করবেন না তা হয় না। এতদিন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বলা হতো। এখন চতুর্মুখী চাপে পড়েছেন তারা। কোনো উপায় নেই টালবাহানা করার। তবে তারা গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছিলেন ঘোষিত সুদহার বাস্তবায়নের সহযোগিতা নিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) নেতাদের সাথে বসবেন। ঘোষিত সুদহার কার্যকর করার তাদের উপায়ন বলে দেয়া হবে। তবে এ জন্য কোনো সার্কুলার জারি করা হবে না। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এমডিদের সাথে বৈঠক করা হবে।


আরো সংবাদ