২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জরায়ুর মুখের ক্যান্সার : কী করবেন

জরায়ুর মুখের ক্যান্সার : কী করবেন - ছবি : সংগৃহীত

সীমুর বয়স সাতচল্লিশ। মাসিক বন্ধ হয়েছে গত দু’বছর হলো। কিন্তু হঠাৎ করে আবার মাসিকের মত রক্ত যাওয়া শুরু হয়েছে মাস তিনেক হল। মাসে মাসে সাদা কিছু চাল ধোয়া পানির মতো স্রাব যায়। দুর্গন্ধও আছে। তলপেটে চাপ চাপ ব্যাথা। একটু হাটাহাটি কিংবা ভারী কাজ করলেই রক্ত বেশি যায়। সীমু প্রথমে ভেবেছিল মাসিক মনে হয় আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু এ বয়সে নতুন করে আবার মাসিক কেনো। কোমরে পিঠে ব্যাথা তো আছেই। ইদানীং প্রস্রাব করতে গেলে জ্বালাপোড়া করে। প্রস্রাব মনে হয় অনেক জমা আছে। কিন্তু প্রস্রাব করতে গেলে সামান্য পরিমাণে হয়। তখন তলপেটে ব্যাথাও হয়। মাঝে মনে হয় তলপেটে ব্যাথা শক্ত হয়ে আসছে। এর সাথে এখন মাসে মাসেই গরম হয়। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। খাবার রুচি কমে গেছে।

সীমু গত পনের দিন আগে যখন দেখতে পেলো প্রস্রাবের সাথে রক্ত ঝরছে তখন কি আর বসে থাকা যায়? গাইনি ডাক্তারের কাছে গেলেন। সব শুনে ডাক্তার একটি যন্ত্র দিয়ে মাসিকের রাস্তা দেখতে চেষ্টা করলেন। যন্ত্রটা মাসিকের মুখের ভেতর রাখার সাথে সাথেই এতোটা তাজা রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল যে ডাক্তার ভালোভাবে দেখার এবং আর ভেতর যাওয়ার চেষ্টা করেননি। ক্লিনিকে নিয়ে জরায়ুর মুখে বায়োপসি পরীক্ষা করলেন। বললেন, রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সঠিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ডাক্তারের চোখে মুখের ভাজ এবং কিছুটা পরিবর্তনে সীমুর মনে হলো খারাপ রিপোর্ট আসবে না। ডাক্তার তলপেটের আলট্রাসনোগ্রাফিও করালেন। রক্তের কয়েকটি পরীক্ষা করালেন। জিজ্ঞেস করলেন বিয়ে হয়েছে কত বছর। সীমু উত্তর দিলো সাতাশ বছর। কজন ছেলেমেয়ে আছে, কটি বেবি ভ্রুণে নষ্ট হয়েছে। কতদিন যাবৎ এইভাবে রক্ত যাচ্ছে এসব অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন। সীমুর স্বামীর আরেকটি বিয়ে ছিল। সে স্ত্রী জরায়ুর মুখের ক্যান্সরে মারা গেছে গত দশ বছর আগে। সীমুর স্বামীর কী চাকরি করে ডাক্তার তাও জিজ্ঞেস করলেন।

স্বামীর যদি অধিক যৌন পার্টনার থাকে কিংবা মেয়েদেরও যদি একের অধিক যৌন সঙ্গী থাকে তাহলেও জরায়ুর মুখের ক্যান্সার হতে পারে। এখন বলা হয় হিউম্যান প্যাজিলেশ ভাইরাস (ঐচঠ) নামক একটি ভাইরাস এই ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। এই ভাইরাসটি জরায়ুর মুখে ক্ষত সৃষ্টি করে এবং সেটি ধীরে ধীরে কাজ করে রূপান্তরিত হয়। এজন্য বলা হয় যদি জরায়ুর মুখ নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয় তবে জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। উন্নত দেশগুলোতে ‘প্যাপস’ টেস্ট নামক তিনটি পরীক্ষা জরায়ুর মুখের লালা নিয়ে করা হয়। নিয়মিতভাবে আমাদের দেশেও এই পরীক্ষাটি হয়। যাদের বয়স ত্রিশের ওপর বিয়ের বয়স দশ-পনের বছর হয়েছে তারা এই পরীক্ষাটি করতে পারেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার আছে কিনা কিংবা ক্যান্সার হবার পূর্ব লক্ষণ আছে কিনা সেটা ধরা পড়ে। ডাক্তার সীমুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এই ‘প্যাপস’ টেস্ট কখনো করেছিল কিনা। এটা যাদের কোনো উপসর্গ নেই তারাও করাবেন। কারণ অনেক সময় এই জরায়ুর মুখের ব্যবহারের সৃষ্ট লক্ষণ থাকে কিন্তু কোনো প্রকার উপসর্গ, ব্যাথা কিংবা রক্তক্ষরণ কিছুই দেখা যায় না। যেমন সীমুর মাসিক বন্ধ হবার পর কোনোরকম কোনো সমস্যা ছিল না।

হঠাৎ করেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। প্রস্রাবের থলির সমস্যাও দেখা দিয়েছে। তারপর বায়োপসির রিপোর্ট এসেছে ইনভ্যাসিভ ক্যান্সার। অর্থাৎ ক্যান্সারের অবস্থা জরায়ুর মুখ থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ডাক্তার সীমুকে সরাসরি এত বড় ভয়াবহ ক্যান্সারের খবরটি না দিয়ে স্বামীর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করলেন এবং নির্দিষ্ট জায়গা মতো পুরোপুরি চিকিৎসা হয় সে জন্য ক্যান্সার বিভাগে পাঠিয়ে দিলেন। সীমুর এই অবস্থায় আপারেশন চলবে না। রেডিও থেরাপি দিতে হবে। এবং অন্যান্য কিছু ওষুধ পত্র দিতে হবে বলে জানালেন। তবে সঠিকভাবে চিকিৎসা নিলে এবং ফলোআপে থাকলে দীর্ঘদিন যাবৎ সুস্থ থাকা সম্ভব। এখন এই ধরনের চিকিৎসা আমাদের দেশেই সুন্দরভাবে করা হয়। বিদেশ যাবার প্রয়োজন পড়ে না। সীমুকে বলা হলো কিছু সমস্যা ধরা পড়েছে ঠিকমত চিকিৎসা নিতে হবে। কিন্তু ক্যান্সার বিভাগের ঠিকানা দেখে সীমুর বুঝতে বাকি রইল না যে তার আসল সমস্যাটা কী।

এ জন্য বলছি বয়স ত্রিশ পার হলেই জরায়ুর মুখের পরীক্ষা করাতে ভুলবেন না যেন। মাসিকের পরীক্ষা করাতে ভুলবেন না যেন। মাসিকের যে কোনো ধরনের সমস্যায় ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন। সীমুর যদি রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যেতো তাহলে ক্যান্সারটি এতদূর ছড়িয়ে পড়তো না। এক্ষেত্রে দেরি করা মানেই নিজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনা। সীমুর মতন অনেক রোগীই আছেন যারা প্রাথমিক অবস্থায় ডাক্তারের কাছে যান না। কিংবা ভাবেন রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে হোক নিজে নিজেই বন্দ হয়ে যাবে।

আসমার বয়স ৫৩। এভাবে যখন মাসিক বন্ধ হবার পর হঠাৎ একদিন রক্ত যেতে দেখলেন নিজে নিজেই জন্মনিয়ন্ত্রনের পিল খাওয়া শুরু করলেন। এভাবেই গিলেছেন তিন চার মাস। যার ফলে যখন ডাক্তারের কাছে গিয়ে বললেন এ কেমন রক্ত যাওয়া পিল খেলেও বন্দ হয় না। ডাক্তার মাসিকের পরীক্ষা করতে গিয়ে বড় তিনটি চাকা দেখতে পেলেন। প্রচণ্ড রকম রক্তক্ষরণ দুর্গন্ধ এবং ছিড়ে ছিড়ে আসছিল পরীক্ষা করার সময়। এখনো আমাদের আশেপাশে এরকম কেউ কেউ আছেন নিজেরাই নিজের চিকিৎসা শুরু করেন রক্ত গেলে কিন্তু প্রথমেই রক্ত যাওয়ার কারণটা নির্ণয় করতে হবে। তার পরে না হয় চিকিৎসা। জরায়ুর মুখের ক্যান্সারে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে অনেক রোগী মারা যায়। নতুনভাবে প্রতি বছরই অনেক জরায়ুর মুখের ক্যান্সার ধরা পড়ে। কিন্তু আসল কথা হল একটু সচেতন হলে এবং অল্প পরিশ্রমে নিয়মিত জরায়ুর মুখ পরীক্ষা করালে কিন্তু এই মরণ ব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা সম্ভব। কাজেই আসুন। আর অবহেলা নয়। আমরা তখন অন্য মা বোনদের এ তথ্যটাই জানাই যে আমরা বয়স ত্রিশের বেশি। ত্রিশের বেশি হলে জরায়ুর মুখ পরীক্ষা করাবো। ক্যান্সার না থাকুক ক্যান্সারের পূর্ব লক্ষণ আছে কি না সেটা ধরা পড়লেও চিকিৎসা নিতে হবে। তাহলে ক্যান্সার নামক মরণ ব্যাধি থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারবো। একথা সত্যি যে সচেতনতার বিকল্প সুস্থ থাকার জন্য আর কিছুই হতে পারে না। ধন্যবাদ।

এম. বি. বি. এস (ডি. এম. সি)
এফসিপিএস, এম. এস (গাইনি)
গাইনোকোলজিস্ট
চেম্বার: পপুলার শান্তিনগর শাখা


আরো সংবাদ