১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সৌদি আরবে সংস্কার কর্মসূচি

সৌদি আরবে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছেন বিন সালমান - ছবি : এএফপি

ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে সৌদি আরবে সংস্কারকাজ শুরু করেন। সৌদিরা অনেক আগে থেকেই বুঝতে পারছিলেন, জ্বালানি তেল একসময় শেষ হয়ে যাবে। তখনকার সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন না হতে এখন থেকেই প্রস্তুত না হলে চরম অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ৭০ বছর আগে সৌদি আরব সমৃদ্ধ ছিল না। বিদেশী হাজীরা হজের সময় মক্কা-মদিনায় তাদের রিয়াল ছুড়ে মারতেন। আজ সেই সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের অনেক গরিব দেশে রিয়াল বিলিয়ে দিচ্ছে। যা হোক, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নতুন আয়ের উৎস খুঁজে বের করার জন্য বর্তমান প্রশাসন হন্যে হয়ে বিভিন্ন বিষয় চিন্তা করছে। এতে মূল নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান।

ক্রাউন প্রিন্স অর্থনৈতিক বিষয় ছাড়াও অনেক সামাজিক সংস্কারে হাত দিয়েছেন। যেমন- মহিলাদের আরো ‘স্বাধীনতা’ এবং এর আওতায় গাড়ি চালানো, ব্যাংকে চাকরি, স্টেডিয়ামে খেলা ও হলে সিনেমা দেখা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজের সুযোগ করে দেয়া প্রভৃতি, যুবকদের চাকরির ব্যবস্থা ও নতুন ব্যবসায় উদ্বুদ্ধকরণ; এসব কাজ করায় অনেকেই তাকে একজন সংস্কারক মনে করছেন। যুবসমাজ সৌদি আরবের ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠী। এর অর্ধেকের কিছু কম হলো নারী। যুবরা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক জীবনযাপনে উৎসাহী। প্রিন্স মোহাম্মদ এদের টার্গেট করে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এগিয়ে নিচ্ছেন। দুই বছরের কর্মকাণ্ডে তিনি তার বাবা, বাদশাহ সালমানকেও ছাড়িয়ে গেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো বলেই দিয়েছেন, ‘সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ বাদশাহ’।

কিন্তু এমবিএসের সব কাজ প্রশংসিত হয়েছে এমন নয়। বিশেষ করে ২৪ অক্টোবর ২০১৭ সালে ধর্মীয় বিষয়ে তিনি ‘মডারেট বা উদারপন্থী ইসলামের’ কথা বলেছেন। তার ভাষায়, ইসলাম চরমপন্থাকে অনুমোদন দেয় না। সমালোচকেরা বলছেন, ইসলাম প্রকৃতপক্ষে যা আসলে তাই। মডারেট ইসলাম বা মধ্যপন্থার ইসলাম বলে আলাদা কিছু নেই। কুরআন, হাদিস, শরিয়াহ আইন, আলেমদের ইজমা ও কিয়াস- এসব নিয়ে যে ইসলাম, তাই আমাদের মানতে হবে। এখানে সংস্কারের কিছু নেই। বিশেষ করে ‘মডারেট ইসলাম’ আমেরিকার থিংক ট্যাংকদের সৃষ্টি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানও বলেছেন, ‘মডারেট ইসলাম বলে কিছু নেই’। কারণ, মূল ইসলামকে পাশ্চাত্য ভয় পায়। তাই মূল ইসলামের বিরোধিতা এবং ইসলামের বিরুদ্ধবাদীদের সহায়তার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমাজগতের কর্মকাণ্ড চলছে শত শত বছর ধরে।

মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবকে ‘মৌলবাদী’ আদর্শ থেকে সরে এসে উদারপন্থী ও উন্মুক্ত হয়ে উঠার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ দেশে উদারপন্থী ইসলাম বিরাজমান থাকবে এবং এটা সব ধর্মের মানুষজন ও বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।’ তিনি জঙ্গিবাদ ‘মুছে ফেলা’র কথাও বলেছেন। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন, ইরানের বিপ্লব এ অঞ্চলে ধর্মীয় শাসনের সূচনা করেছে এবং সৌদি আরবের এখন তা থেকে মুক্ত হওয়ার সময় এসেছে। বিবিসির সংবাদে প্রকাশ, প্রিন্স মোহাম্মদ ইসলামকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করতে চান না। সবাই জানেন, মার্কিন-ইঙ্গ-ইহুদি বলয় এটাই চায়।

সৌদি রাজপরিবার কি সম্পূর্ণভাবে ইসলামি আইন-বিধি অনুসরণ করে? এ নিয়ে হয়তো অনেক বিতর্ক হবে। আল সৌদ পরিবার সবসময়ই ইসলামের সেবক হিসেবে নিজেদের দাবি করে আসছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী তাদের কর্মকাণ্ড ও নীতির প্রতিফলনে অধুনা তা তেমন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আজ ২০১৮ সালে সৌদি আরব ইসরাইলের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। সৌদি রাষ্ট্র গঠনের সময় বাদশাহ আবদুল আজিজ ‘ওয়াহাবি’ হিসেবে কথিত মুফতি ও আলেমদের ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৩২ সালে সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম ব্রাদারহুড ইবনে সৌদের বিরোধিতায় নামে। ১৯৭৯ সালের নভেম্বর, জুহাইমান আল ওতাইবি নামের চরমপন্থী ৩০০ সহযোগী যোদ্ধা নিয়ে মক্কা আক্রমণ করেন। তখন পবিত্র কাবা ঘর ২২ দিন অবরুদ্ধ ছিল। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ ফ্রান্স স্পেশাল ফোর্সের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের পরাজিত করে পবিত্র কাবাকে অবমুক্ত করে। চরমপন্থীদের বিদ্রোহের একটি কারণ ছিল পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও তার প্রসার।

প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানও পৃথকভাবে আলেমদের সাথে বৈঠক করেছেন এবং সংস্কার নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তাদের করণীয় কী তা দেখিয়ে দিয়েছেন। তবে সংস্কার পদক্ষেপ বিনা বাধায় পার হতে পারবে বলে মনে হয় না।
যেভাবেই বিষয়টি দেখা হোক না কেন, সৌদি সরকারের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ধারাতে প্রিন্স পরিবর্তন এনেছেন। দেশের বৈদেশিক নীতি রাতারাতি বদলে গেছে। সৌদি রাষ্ট্র গঠনের পর প্রথম যুদ্ধ এবং ইয়েমেন যুদ্ধ তিনি শুরু করেছেন। এই যুদ্ধে প্রতিদিন সৌদি আরবের ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। এ জন্য কোষাগারে অর্থের মজুদ দরকার। তিনি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে নামার পর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিয়ে এক একজন ছাড়া পাচ্ছেন। এমন ধনী নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন অন্তত ২৫০ জন।

সৌদি রাজতন্ত্রের পতন ঘটাতে চায় আইএস এবং আলকায়েদা। এ দু’টি সংগঠন বহু সৌদি নাগরিককে দলে ভিড়িয়েছে। এরা বড় জনগোষ্ঠীর ভেতর লুকিয়ে আছে। বেশির ভাগ সময় সামনাসামনি আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে চায় না। আমেরিকাসহ পশ্চিমারাও সৌদি রাজনৈতিক অঙ্গনকে সংস্কার করতে বলেছে। শূরা কাউন্সিলে নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠানোর আওয়াজ উঠেছিল। এসব কিছু হাউজ অব সৌদ চায় না, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বও। সরাসরি গণতন্ত্র বা কোনো পশ্চিমা মডেল এখনো সৌদি রাষ্ট্রে পরীক্ষার সময় হয়নি। বিন সালমান চান, বেকার জনগোষ্ঠীকে তাড়াতাড়ি চাকরি ও ব্যবসার সুযোগ দেয়া এবং প্রিন্স ও প্রিন্সেসদের সহনীয় ও গ্রহণীয় একটি ফর্মে নিয়ে আসা, যা খুবই কঠিন। যেমন- সৌদি সরকার প্রিন্সদের বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করত। বাদশা সালমান সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিল পরিশোধ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হলে অনেক প্রিন্স তার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রাসাদে মিছিল করেন এবং বিদ্রোহের চেষ্টা করেন। ফলে ১২ জন প্রিন্সকে গ্রেফতার করা হয়।

অভিযোগ কারো কারো, সৌদি বাদশাহরা দেশে-বিদেশে প্রভাব খাটানোর জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেন। কাতার অবরোধের সময়ও সৌদি আরব ধর্মকে টেনে আনে। অভিযোগ আছে, কিছু আফ্রিকান দেশকে সাফ বলে দেয়া হয়েছে, কাতারের সাথে সম্পর্কের ইতি না টানলে হজ কোটা সঙ্কুচিত এবং সহায়তা বন্ধ করা হবে। গ্র্যান্ড মুফতিকে বলা হলো কাতার অবরোধের বিষয়ে বিশেষ দোয়া করার জন্য। তিনি তা করেছেন। কাতার অবরোধ এখনো চলছে। তবে প্রিন্স মোহাম্মদ বলেছেন, ‘আমাদের জন্য কাতার খুব ছোট বিষয়’।
সমালোচকেরা বলছেন, হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ভাবধারাকে রয়েল ডিক্রি দিয়ে পরিবর্তন করা এত সোজা নয়। বিন সালমানের বিরোধীরা অনেকে মনে করেন, নতুন ধারা চলতে থাকলে হয়তো একসময় সেকুলারিজম মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এখন ইসরাইল ও পশ্চিমারা এই চারাগাছেই পানি ঢালছে নিজস্ব স্বার্থে।

কিছু দিন আগে সৌদি আরবের পশ্চিম দিকে সরকার ‘রেড সি প্রজেক্ট’ ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ জিজানে ২৮৬টি দ্বীপ রয়েছে। মিলিত নাম ফারাসান দ্বীপপুঞ্জ। এতে পর্যটন উপযোগী করার জন্য ৮০০ মিলিয়ন ডলার প্রাথমিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটা হবে আন্তর্জাতিক মানের অবকাশ ও বিনোদনকেন্দ্র। এখানে কোনো সৌদি বা শরিয়া আইন চলবে না। এতে নাকি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় থাকবে, এজন্য থাকবে না কোনো ইসলামি ড্রেস কোড। পবিত্র মক্কা নগরী থেকে কয়েক শ’ কিলোমিটার দূরে এমন বিতর্কিত সংস্কৃতির জন্ম দেয়া কি ইসলামি মূল্যবোধের অবক্ষয় আনবে না? কুরআনে বলা হয়েছে- ‘মাটি তার উদরস্থ সম্পদ উদগীরণ করে দেবে’। সৌদি আরবের তেলসম্পদ কি এর উদাহরণ নয়? এ দেশে শত শত মাইলব্যাপী কালো ও লাল রঙের পাথর ও বালু রয়েছে। এসবে কী আছে তা সৌদি আরব বের করতে পারেনি। কিন্তু আমেরিকানরা তার কদর জানে, তাই আমেরিকা একসময় শুধু মাটি ও পাথর আমদানি করত। বাদশাহ ফয়সল এটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তেল ফুরিয়ে গেলে তার বিকল্প বের করতে হবে। মক্কাকে অর্থাৎ সৌদি আরবকে আল্লাহ পাক নিরাপদ শহর ঘোষণা করেছেন এবং ‘জীবিকার’ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা আছে। এই নিরাপত্তা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে, এমনই মনে করেন আলেমরা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটনের ইসলামি কোড মেনে খাতটি সমৃদ্ধ করা যায় কিনা তা বের করা উচিত। পশ্চিমা বিনোদন কোড সৌদি আরবের মতো দেশে মানায় না। রক্ষণশীল সমাজকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে অপমান করা হয়েছে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সৌদি প্রিন্স সবসময় নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। এ জন্য গড়ে তুলেছেন ‘আল সাইফ আল-আজরাব’ সোর্ড ব্রিগেড নামে পাঁচ হাজার সদস্যের এলিট বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্ল্যাকওয়াটার’ বাহিনীর সহায়তায় এই বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে দুর্ধর্ষ হিসেবে। ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে এবং রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে তাদের যেন ব্যবহার করা না হয়।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ