২৩ জুলাই ২০১৮

শতবর্ষী কবি আবদুুল ওয়াহিদ

শতবর্ষী কবি আবদুুল ওয়াহিদ - ছবি : সংগ্রহ

সুনামগঞ্জ জেলায় পরিণত হয় ১৯৮৪ সালের পয়লা মার্চ। তখন অনেকে মনে করেছিলেন জেলার ভৌগোলিক সীমায় পরিবর্তন আসতে পারে অথবা ছাতক উপজেলাকে সিলেট জেলার সাথে যুক্ত করা সম্ভব হবে। তখন দৈনিক জালালাবাদী পত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি শুরু হয় পুরোদমে। কলমযুদ্ধ চলতে চলতে সম্পাদক আবদুল ওয়াহিদ খানের হস্তক্ষেপে একসময় স্তব্ধ হয় প্রসঙ্গটি। ১৯৯২ সালের দিকে শোনা গেল ছাতক উপজেলা সিলেট জেলার সাথে যুক্ত হতে পারে। সুনামগঞ্জের জন্য সংবাদটি ছিল পীড়াদায়ক। এমন সংবাদে ব্যস্ত হয়ে উঠেন কবি আবদুুল ওয়াহিদ। সুনামগঞ্জের অখণ্ডতা রক্ষায় যোগাযোগ করেন সর্বমহলে। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রথমে একাই ছিলেন। সুনামগঞ্জ প্রেস ক্লাব এবং সাবেক মন্ত্রী ইকবাল হোসেন চৌধুরী তাকে সমর্থন দেন। ক্রমেই সমর্থন যোগায় জেলা বার, সাপ্তাহিক স্বজন।

পত্রিকাটি জনমত তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়। সুধীমহলের ডাকে জেলার অখণ্ডতা রক্ষার তাগিদে সুনামগঞ্জ শহীদ মিনার চত্বরে সভা হয়। গঠন করা হয় ‘জেলা ভঙ্গ প্রতিরোধ কমিটি’। কমিটির উদ্যোগে ২৭ মে ১৯৯২ সালে জাউয়া বাজারে বিরাট জনসভা হয়। এলাকার প্রবীণ মুরব্বি আলহাজ জুবেদ আলী পীরের সভাপতিত্বে সভায় জেলার অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে হরতাল, অবরোধ ও অনশনের শপথ উচ্চারিত হয়। কবি আবদুুল ওয়াহিদের সুসংগঠিত নেতৃতে সে সভায় বক্তৃতা করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। সুনামগঞ্জ থেকে যোগদান করেন আপ্তাব উদ্দিন, আবদুস সামাদ, জহুর আলী, আলী ইউনুছ প্রমুখ আইনজীবী। আরো উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, আবদুল হাশিম, প্রেস ক্লাব সভাপতি ও সাপ্তাহিক স্বজন সম্পাদক শহীদুজ্জামান চৌধুরী, সাপ্তহিক গ্রামবাংলার কথা’র সম্পাদক গোলাম রব্বানী এবং জেলা ভঙ্গ প্রতিরোধ কমিটির সচিব অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। সাংবাদিক হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী ও আইনুল ইসলাম বাবলু এই ইস্যুতে জনমতের পক্ষে তাদের লেখনীকে সোচ্চার করেন। জনমতের তাগিদে জেলা বার সুনামগঞ্জ জেলার অখণ্ডতা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কবি আবদুল ওয়াহিদকে সাথে নিয়ে সুনামগঞ্জ বারের প্রতিনিধিরা তৎকালীন এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা আবদুস সামাদ আজাদ ও সুনামগঞ্জের বিএনপি নেতা ফজলুল হক আসপিয়াসহ দেখা করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে। তার সামনে তুলে ধরা হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা সুনামগঞ্জ ভাঙ্গার অসারতার কথা।

ওই সময় মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক কবি আবদুল ওয়াহিদকে দেয়া একটি সার্টিফিকেট দেখানো হলে বেগম জিয়া নিবিড়ভাবে দেখেন এবং ঘোষণা দেন, সুনামগঞ্জ জেলার সীমানার পরিবর্তন হবে না। প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বের হলে সুরঞ্জিত সেন বলেন- আগে জানতাম, পুরান চাল ভাত বাড়ে। কিন্তু পুরান কাগজে যে এত কাজ দেয়, তা আজ বোঝা গেল। এভাবে আবদুুল ওয়াহিদের সুনাম, শ্রম ও তৎপরতায় রক্ষা পায় সুনামগঞ্জ জেলার অখণ্ডতা। আবদুুল ওয়াহিদ আজ ইহলোকে নেই। কিন্তু তিনি সুনামগঞ্জবাসীকে ঋণী করে গেছেন।

১৯৮২ সালে সাপ্তাহিক সিলেট সমাচারের সম্পাদক আবদুুল ওয়াহিদ খানের অফিসে আমার সাথে পরিচয় হয় কবি আবদুল ওয়াহিদের সাথে। সম্পাদক ওয়াহিদ ভাই প্রায় একই নামের এই কবিকে সম্বোধন করতেন ‘নানা’। তার কাছ থেকেই জানলাম, কবি আবদুুল ওয়াহিদ তাৎক্ষণিকভাবে ছন্দোবদ্ধ কবিতা রচনায় পারদর্শী। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা- সুনামগঞ্জ’ হইতে তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি রয়েছে। তিনি হয়ে গেলেন আমারও নানা। বিভিন্ন মহলে তিনি ছিলেন সার্বজনীন নানা। বয়সের বিস্তর ফারাক সত্ত্বে¡ও কবি আবদুল ওয়াহিদের সাথে তিন যুগ আগে যে সখ্য গড়ে উঠেছিল, মৃত্যুরপূর্ব পর্যন্ত তা ছিল অব্যাহত।
অকুতোভয় সমাজসেবী, লড়াকু সংস্কারক, সিলেটের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংবাদপত্র অঙ্গনের প্রিয় ‘নানা’ প্রায় শতবর্ষ বয়সে গত ২৬ রমজান ১২ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৯৪ বছর। তবে তিনি নিজেই বলতেন, এই কার্ড তৈরি করার সময় তার বয়স ছয়-সাত বছর কমিয়ে দেয়া হয়। কারণ তার শারীরিক গঠন ও গড়ন এবং সুস্থতা দেখে কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করেনি, তিনি এত বেশি বয়সী। তিনি ছিলেন সুঠামদেহী ও দীর্ঘাকৃতির। তার পায়ের মাপের জুতা বাজারে পাওয়া যেত না, তৈরি করে নিতে হতো। হাজার লোকের ভিড়ে সহজেই চিহ্নিত করা যেত সর্বোচ্চ মানুষটিকে।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের সাংবাদিক মহল, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, রাজনৈতিক অঙ্গন, মুসলিম সাহিত্য সংসদসহ দুই সুধীমহলে তার ছিল অবাধ বিচরণ। সৃজনশীল মনন ও সামাজিক উন্নয়ন ছিল তার ব্রত। নিজ গ্রামে পাঠাগার স্থাপন করে পাল্টে দিয়েছেন গ্রামের পরিচয়। জন্মস্থান জাউয়া ‘সাহিত্যিক পাড়া’ হিসেবে পরিচয়লাভ করে সরকারি স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সাবেক সচিব ও বৃহত্তর সিলেটের জাঁদরেল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ তাকে কাছের মানুষ করে নিয়েছিলেন। তার তিরোধানের পর তার সন্তানদের কাছেও কবি ওয়াহিদ সম্মানিত ছিলেন। ফলে ঢাকা গেলে তাকে তাদের কাছেই থাকতে হতো। কবি আসাদ চৌধুরী, বেলাল মোহাম্মদ, জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, কবি দিলওয়ার প্রমুখ ছিলেন তার আপনজন।

স্বজন ও পরিচিতজনের দুঃখ কষ্টের দিনে ‘নানা’ পাশে দাঁড়াতেন একান্ত সঙ্গী হয়ে। সাপ্তাহিক সিলেট সমাচারে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ নিয়ে ১৯৮১ সালে তুমুল আন্দোলন হয় সিলেট শহরে। তখন পুলিশের গুলিতে মিছিলের লোক মারা যায়। সম্পাদক আবদুল ওয়াহিদ খানের নিরাপত্তা হলো বিঘিœত। তখন তার পাশে দাঁড়ান বিশালদেহী ও বিশাল হৃদয়ের কবি আবদুল ওয়াহিদ। সার্বক্ষণিকভাবে ওয়াহিদ খানকে সাহচর্য দিয়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন করানোর পরই তার দায়িত্ব শেষ করেন। এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
কবি স্বপ্ন ছিল- দক্ষিণ ছাতক নিয়ে ‘জাউয়া বাজার উপজেলা’ গঠন। এ জন্য একসময় রাষ্ট্রপতি এরশাদের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন। তবে ওই সরকারের আয়ু ফুরিয়ে গেলে তা আর সম্ভব হয়নি।
কৈতক হাসপাতাল নির্মাণ ও জাউয়া বাজার পুলিশকেন্দ্র স্থাপনে কবি আবদুল ওয়াহিদের অবদান স্মরণীয়। তার অবদানের সুবাদে সুনামগঞ্জের প্রথম জেলা পরিষদের সদস্য মনোনীত করা হয় তাকে।

আমার ছোট ছেলে আশফাকুজ্জামান চৌধুরী ও মেয়ে সাবিহা চৌধুরীর জন্মলগ্নে তিনি উপস্থিত ছিলেন সিলেটের একটি ক্লিনিকে। ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ২০০৮ সালে সুনামগঞ্জ থেকে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করে। এতে তাকে নিয়ে ‘একজন অশীতিপর পল্লীকবি ও আমাদের ঋণ’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছে। আমার পরিবারের সদস্যদের সাফল্যে তিনি আপন নানার মতোই উল্লসিত হতেন। সে ছেলে আইন বিষয়ে পিএইচডি করতে দিল্লির সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ পেয়েছে- এ খবর কবি পেয়েছেন চিরতরে অজ্ঞান হওয়ার দুই দিন আগে। তিনি ছিলেন স্বল্পাহারী, হাসিপ্রিয় নীরোগ লোক। সদভ্যাসই তাকে শতায়ু দিয়েছে। গত ১০ জুন হঠাৎ তার ডায়রিয়া দেখা দেয়। পরদিন তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলে তার প্রিয় পাঠাগার থেকে ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও জ্ঞান আর ফেরেনি। ১২ জুন চিরতরে পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ