১৯ জুলাই ২০১৮

সামরিক জান্তার হাতে মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির পাঁচ বছর

মোহাম্মদ মুরসি - ছবি : সংগ্রহ

২০১৩ সালের ৩ জুলাই মিসরে সামরিক জান্তার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হন সে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। ক্ষমতা দখল করেন ফিল্ড মার্শাল আবদ আল-ফাত্তাহ আল-সিসি। সিসি ভয়াবহ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে দেশ শাসন আজো অব্যাহত রেখেছেন। দেশটির পুলিশবাহিনী রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের থামিয়ে দিতে একের পর এক যথেচ্ছ গ্রেফতার, নির্যাতন ও গুম করার কাজে লিপ্ত রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, মিসরে মানবাধিকার সঙ্কট অবাধে অব্যাহত আছে। কর্তৃপক্ষ নানা ধরনের নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধকর্মসহ শত শত লোককে গুম করেছে। বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বিচারবহির্ভূতভাবে। যারা এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যার সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করা যাবে না। সুশীলসমাজের ওপরও সিসি সরকার বেশ ক্ষুব্ধ। এনজিও কর্মকর্তাদের যখন তখন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হচ্ছে। তাদের বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। সমালোচক, প্রতিবাদকারী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদেরকে সরকার প্ররোচিত অবৈধ বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরো বলছে, ব্যাপক হারে অবৈধভাবে বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে সামরিক ও বেসামরিক আদালতে। এভাবে কয়েক ডজন লোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। সেখানে নারীরাও অব্যাহতভাবে যৌন হয়রানির শিকারে পরিণত হচ্ছে। নারীরা আইনবহির্ভূতভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ ধর্মীয়ভাবে মানহানির অভিযোগ তুলছে।

এমন যখন অবস্থা, তখন মোহাম্মদ মুরসি ২০১৩ সালে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার কারাবাসের পাঁচ বছর অতিক্রম করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে ছয়টি মামলার : গণহারে কারাগার থেকে পালানো, খুন, কাতারের হয়ে গোয়েন্দাবৃত্তি করা, ফিলিস্তিনের হামাস গোষ্ঠী ও লেবাননের হিজবুল্লার সাথে গুপ্তচরবৃত্তি, বিচার বিভাগের অবমাননা এবং সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে।
‘সালাম অর্গানাইজেশন ফর প্রটেকশন অব হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান আলা আবদুল মুনসিফ বলেছেন, ‘মুরসির বিরুদ্ধে যেসব রায় ঘোষণা করা হচ্ছে, এগুলো রাজনীতি-তাড়িত। সরকার তাকে শেষ করে দিতে চায়।’

২০১৬ সালে একটি মিসরীয় আদালত মুরসিকে তিন বছরের জন্য সন্ত্রাসীদের সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। একই বছরে মিসরীয় সর্বোচ্চ আপিল আদালত ‘কোর্ট অব ক্যাসেন্ট’ মুরসির বিরুদ্ধে নি¤œ আদালতের দেয়া ২০ বছরের একটি সাজা বহাল রাখে। এই সাজা দেয়া হয় ২০১২ সালে প্রেসিডেন্টের ইত্তেহাদিয়া প্যালেসের সামনে তার সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংঘর্ষকে সমর্থন দেয়ার কারণ দেখিয়ে। মুরসিসহ অপর চারজন ব্রাদারহুড নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ২০১১ সালে স্বৈরাচারী হোসনি মোবারকের সরকারের বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের সময় গণহারে কারাগার থেকে পালানোর অপরাধে। তা সত্ত্বেও ২০১৬ সালে কোর্ট অব ক্যাসেশন রায় পাল্টে পুনঃবিচারের আদেশ দেয়। মুরসির ওপর আরেকটি আঘাত আসে যখন তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় কাতারের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার অভিযোগে। এ ছাড়া তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় আদালত অবমাননার অভিযোগে। গণহারে জেল থেকে পালানো ও হামাসের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগে আরো দু’টি মামলায় বিচারাধীন রয়েছেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট।

কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক সাঈদ সাদেককে উদ্ধৃত করে আনাদলু এজেন্সি বলেছে- তিনি বলেছেন মুরসির বিচারের কারণ ‘রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা’। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যারা তাকে কক্ষমতাচ্যুত করল, তারা কী করে তাকে মুক্ত রাখতে পারে?’ অধ্যাপক সাঈদ সাদেক মনে করেন, নিকট ভবিষ্যতে মিসরের সামরিক সরকার ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার কোনো সম্ভাবনা নেই।

মিসরীয় ক্যাঙারু কোর্টের রায়ে শত শত সরকারবিরোধী লোক ফাঁসির রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন। আর হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘমেয়াদে নানা সাজা ভোগ করছেন। ২০১৮ সালের ১০ মার্চ মিসরের একটি ক্যাঙারু কোর্ট ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং আরো পাঁচজনকে দেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এরা একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গঠন করছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তাবাহিনী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা করা। মিসরের সামরিক সরকার ২০১৩ সালের জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে সরকারবিরোধীদের ওপর নানা ধরনের অভিযান চালিয়ে আসছে। ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ফিল্ড মার্শাল উপাধি ধারণ করেন। অথচ মুরসিই ছিলেন মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট।

২০১৩ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক ও সদস্য শত শত লোককে এই সামরিক সরকার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। নিরাপত্তা ও ডানপন্থী সূত্র মতে, এদের মধ্যে কয়েক ডজন লোকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
‘কর্নেল সেন্টার অন দ্য ডেথ পেনাল্টি ওয়ার্ল্ডওয়াইড’-এর দেয়া তথ্য মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসরীয় আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে ১০৯ জনকে যেখানে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, সেখানে এখন এই সংখ্যা ৫০৯-এ উন্নীত হয়েছে। ২০১৫ সালের শুরু থেকে কমপক্ষে ৩৫৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। কর্নেল সেন্টারের বিশ্বাস- কমপক্ষে ১৭০০ লোক মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বনের কারণে এ সম্পর্কিত কোনো সরকারি তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে- মানবাধিকার কর্মীদের কাজের ওপর বাধা সৃষ্টি করার কাজটিও অভাবনীয় উপায়ে চালিয়ে যাচ্ছে এ সরকার। বিরোধী বাদ-প্রতিবাদ থামিয়ে দেয়ার অংশ হিসেবে সরকার এসব কাজ অব্যাহত রেখেছে। ২০১৭ সালের মে মাসে যুক্তাষ্ট্রের ক্লায়েন্ট-প্রেসিডেন্ট সিসি একটি নতুন ড্রাকোনিয়ান আইনে স্বাক্ষর করেন। এই আইনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয় এনজিও রেজিস্ট্রেশন প্রত্যাখ্যান করা, এনজিও বাতিল করা ও প্রশাসন বোর্ডকে বাতিল করে দেয়ার। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে আদালত কমপক্ষে ১৫ জন সাংবাদিককে তাদের লেখালেখির কারণে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এর মধ্যে মানহানি ও প্রকাশনার অপরাধও রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের প্রকাশিত তথ্যগুলো সত্য নয়। নিরাপত্তা বাহিনী ২০১৭ সালে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে গ্রেফতার করেছে কমপক্ষে ২৪০ জন রাজনৈতিক সক্রিয় কর্মী ও বিক্ষোভকারীকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অনলাইনে দেয়া তাদের পোস্টে প্রেসিডেন্টের জন্য অপমানজনক মন্তব্য রয়েছে কিংবা এরা অনুমোদিত প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। তা ছাড়া, নিরাপত্তা বাহিনী সেসব লোককে গ্রেফতার করছে, যারা মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন কিংবা সরকার মনে করছে এরা হতে পারে এই দলের সদস্য বা সমর্থক ছিলেন। তাদের বাড়িঘর কিংবা কর্মস্থলে হামলা চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাদের একজনকে গ্রেফতার কার হয়েছে একটি হলিডে রিসোর্ট থেকে। তাদের অনেককে বিচার না করে দীর্ঘ দিন আটকে রাখা হয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের এভাবে শাস্তি দেয়ার উপায় অবলম্বন করছে সামরিক সরকার। ইন্টেরিয়ার মিনিষ্ট্রির বাহিনী সন্দেহভাজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অব্যাহত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। মিসরীয় কমিশন ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমের দেয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে কমপক্ষে ১৬৫ জনকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, হাজার হাজার বেসামরিক লোকের বিচার করা হয়েছে সামরিক আদালতে। এইচআরডব্লিউ আরো জানিয়েছেÑ নয়া বিধনিষেধমূলক এনজিও আইন করে আটক করা হচ্ছে সাংবাদিক, সাজা দেয়া হচ্ছে মানবাধিকার কর্মীদের। তাদের বিদেশ ভ্রমণে বাধা দেয়া হচ্ছে। সরকার স্বাধীন সমাজ দেশ থেকে উচ্ছেদ করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে- মিসরীয় পুলিশ ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্সেস প্রেসিডেন্ট আবদ আল ফাত্তাহ আল-সিসির সমালোচকদের ওপর ২০১৮ সালের মে মাস থেকে ভোরে হামলা চালু করে। এদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, এরা সামাজিক গণমাধ্যমে সরকারবিরোধী মতামত প্রকাশ করেন। যাদের নিরাপত্তা বাহিনী আটক করে তাদের অনেকের সাথে আত্মীয়স্বজনের যোগাযোগ পর্যন্ত করতে দেয়া হয় না। যাদের রাজনৈতিক কারণে আটক করা হয়, তাদের মধ্যে রয়েছেন গত ২৭ মে গ্রেফতার হওয়া সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হাজেম আবদ আল-আজিম এবং ২৩ মে আটক করা হয় সুখ্যাত সাংবাদিক ওয়ায়েল আব্বাসকে। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের চোখ বেঁধে নিয়ে যায় এবং তাদের আদালতে সোপর্দ করার আগে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখে ৩৬ ঘণ্টার মতো। আটক অন্যদের মাঝে রয়েছেন সার্জন সাদি আল-গাজালি হার্ব, আইনবিদ হাইশাম মোহামেদান, সক্রিয়বাদী আমল ফাতি ও সেতারবাদক সাদী আবু জায়িদ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা-বিষয়ক পরিচালক সারাহ লিয়াহ হোয়াইটসন বলেছেন- মিসরে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন এতটাই নিচে নমিয়ে আনা হয়েছে যে, সিসির বাহিনী শুধু কথা বলার কারণে ঘুমের মধ্যেও গ্রেফতার করছে সুপরিচিত সক্রিয়বাদীদের। এর সুস্পষ্ট বার্তা হচ্ছে- নিছক সমালোচনা ও ব্যঙ্গ-কৌতুক করার কারণেও অনেককে কারাগারে যেতে হচ্ছে। সেখানকার প্রসিকিউটররা আন্তর্জাতিক আইনকানুন লঙ্ঘন করে ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। সেখানকার প্রসিকিউটররা কাউকে বিচারকের কাছে সোপর্দ না করে বিনা বিচারে পাঁচ মাস পর্যন্ত আটক রাখতে পারেন। বিচারকেরা এই মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারেন। এর ফলে হাজার হাজার মিসরীয়রা বিনা বিচারে কারাগারে আটক রয়েছেন।


আরো সংবাদ