১৯ নভেম্বর ২০১৮

মারগালার স্নিগ্ধতার আবেশে

মারগালার স্নিগ্ধতার আবেশে - ছবি : সংগৃহীত

আগের রাতে মারগালা পাহাড়ের উপর মোনালে ডিনার করার সময় সামা টিভির ব্যুরো চিফ খালিদ আজিম চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ফয়সাল মসজিদটি কোথায়। ইচ্ছে করেই কোণার দিকে বসেছিলাম। নিচে রাতের আলোয় ঝলমলে ইসলামাবাদ নগরী। ওই দিন বিকেলেই ফয়সাল মসজিদে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করাচি থেকে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে নেমে দেখা গেল, আমাদের দলের এক সদস্যের লাগেজ পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজাখুঁজিতে বেশ সময় চলে গেলো। তারপর যারা আমাদের স্বাগত জানাতে এসেছিলেন, তাদের চিনতেও একটু সমস্যা হচ্ছিল। ফলে বেশ দেরি হয়ে যায়। সেদিন আর যাওয়া হয়নি। রাতেই ছিল মোনালে ডিনার। চোখ ধাঁধানো পরিবেশে। পাহাড়ে চড়ার সময়ই ইসলামাবাদের ঝিলমিলি চমকে দিচ্ছিল। পুরো রাজধানীই ঝকমক করছে।
খালিদ আজিম চৌধুরীও খানিক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কয়েক হাজার ফুট উঁচু নিচু সবকিছুই একই সমতলের মনে হচ্ছিল। ফলে চেনা একটু কঠিনই।

পাকিস্তানের রাজধানী নগরী নির্মাণ করা হয়েছে মারগালা পাহাড়ের কোলে। রাজধানী হওয়ার আগে সেখানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গ্রাম ছিল। পুরনো কোনো শহর থাকলে হয়তো এভাবে নগরীটি গড়া সম্ভব হতো না।

পর দিন বিকেলে ফয়সাল মসজিদে যাওয়ার সুযোগ হলো। মনোরম মারগালা পাহাড়রাজির ঢালে আরব বেদুইনদের তাঁবুর আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য মসজিদের মতো গম্বুজশোভিত নয় এটি। সেই ১৯৬৬ সালে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার পর কাজ শেষ হয় ১৯৮৬ সালে। মসজিদের মূল কক্ষ ও বারান্দায় প্রায় এক লাখ লোক নামাজ পড়তে পারেন, খোলা চত্বরে আরো দুই লাখ লোকের নামাজ আদায়ের সুযোগ রয়েছে। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ। নামাজি ধারণ ক্ষমতার দিকে থেকে বর্তমানে এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মসজিদ।

মসজিদটি ভিন্ন আদলে গড়া হয়েছে। এটি অন্যান্য মসজিদের ছকে আবদ্ধ নয়। ইসলামাবাদের অন্যতম পর্যটন স্পটও এই মসজিদ। আসর নামাজের পর পূর্ব দিকের চত্বরে ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষের বিশাল মিলন মেলা দেখতে পেলাম। নারীদের শালীন পোশাক পরার নির্দেশনা রয়েছে। তারা তা মেনেই ঘোরাফেরা করছে, সাবলীলভাবে। শিশুরা বিশাল খোলা জায়গায় ছোটাছুটি করছে। সবার সহজ উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত একটি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।

ইসলামাবাদ, করাচি বা লাহোরে- পাকিস্তানের যে তিনটি নগরীতে বাংলাদেশ সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের হয়ে গেছি, শপিং মল বা রাস্তায় পর্দা বা হিজাবের কড়াকড়ি কোথাও চোখে পড়েনি। হেডস্কার্ফ বা বোরকা পরা নারীর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়েও কম মনে হয়েছে। মার্কেটগুলোতে টপ, টু পিসই বেশি দেখা যায়, থ্রি পিস অনেক কম।

মজার ব্যাপার হলো, তিনটি নগরীতেই আমাদের সাথে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা তিন প্রধান কর্মকর্তাই ছিলেন নারী। তাদের সহকারীরা ছিলেন পুরুষ। বেশ দক্ষতার সাথেই তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে লাহোরে ইশরাত জাহান জানালেন, পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিসে মেয়েরা তথ্য মন্ত্রণালয়কেই অগ্রাধিকার দেয় বেশি। ফলে এখানে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে তিনি জানালেন, তার ইচ্ছা ছিল পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়ার।

ইসলামাবাদকে গড়া হয়েছে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে। ফলে আম-জনতার উপস্থিতি বেশ কম। রিকশা তো নেই, অটো-রিকশাও সেখানে নিষিদ্ধ। বাসও খুব বেশি চোখে পড়েনি। নওয়াজ শরিফের আমলে মেট্রো সার্ভিস চালু করা হয়েছে। খুব সহজেই ও কম খরচে রাওয়ালপিন্ডি থেকে আসা-যাওয়া করা যায়। প্রচুর খোলা জায়গা, রাস্তাও অনেক। ফলে যানজটের বালাই নেই। সড়কদ্বীপগুলো মনোরমভাবে সাজানো। ¯স্নিগ্ধতার আবেশ রয়েছে সবখানেই।

সাংবাদিক তাহির জাফরি জানালেন, মূল পরিকল্পনায় ইসলাবাদকে বৃক্ষশোভিত করার কথা ছিল। ওই পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়া হয়নি। তবে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অনেক বৃক্ষই কেটে ফেলা হয়েছে। যেখানেই কিছু আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, সেখানেই গাছ সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে সৌন্দর্য্যের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

ইসলামাবাদে আরেকটি বিষয় প্রকটভাবে চোখে পড়ল। ব্যানার, পোস্টার, দেয়াল লিখনের অনুপস্থিতি। জাতীয় নির্বাচনের আবহের মধ্যেই আমরা পাকিস্তান সফর করেছি। কিন্তু ইসলামাবাদে টিভি না খুললে কিংবা কারো সাথে কথা না বললে বোঝার উপায়ই ছিল না নির্বাচন বলে কিছু আছে। টিভি খুললেই অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরকে তীব্র সমালোচনা দেখা যাচ্ছিল। বিশ্লেষকেরা নানাভাবে প্রতিটি ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু রাজপথে ‘রাজনীতি’ নেই। লাহোরে অবশ্য ইমরান খানের পিটিআইয়ের কিছু পতাকা দেখা গেছে। তবে সেগুলো লাইটপোস্টের শীর্ষে সুন্দরভাবে লাগানো।

পাঞ্জাব হলো নওয়াজ শরিফদের দুর্গ। ইসলামাবাদ কিংবা লাহোরের রাজপথে তাদের সেই উপস্থিতি চোখে দেখা যায়নি। সিন্ধুতে ভুট্টোদের দাপট থাকলেও করাচিতে ব্যানার, পোস্টার দিয়ে তারা তাদের অবস্থান জানাতে চাইছিল না।

 

 


আরো সংবাদ