২১ নভেম্বর ২০১৮

গ্রামে টাকার প্রবাহ কমে গেছে

টাকা - সংগৃহীত

কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ঋণের মাধ্যমে গ্রামে টাকার প্রবাহ বাড়ে, চাঙ্গা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থান। কিন্তু এ গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এখাতে (নন-ফার্ম রুরাল ক্রেডিট) বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩০ শতাংশ। শুধু ক্ষুদ্র শিল্প ঋণেই কমেনি, কমেছে কৃষি ঋণও। আলোচ্য সময়ে কৃষি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র এক দশমিক ৭২ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব ও সামগ্রিক অবস্থার প্র্রভাব পল্লী এলাকায় পড়েছে। বিনিয়োগ কমায় সঙ্কোচিত হয়ে আসছে কর্মস্থান।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, শহরের চেয়ে গ্রামে অবকাঠামোর সুবিধা কম। শহরের যে হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়, গ্রামে ওই হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয় না। এমনও এলাকা আছে যেসব এলাকায় দিনে রাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় না। এর সাথে গ্রামের বড় একটি অংশ নানা কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছেন না। সব মিলেই বিনিয়োগের স্থবিরতা পল্লী এলাকার ক্ষুদ্র শিল্পে পড়েছে।
বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে তৈরি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের মধ্যে প্রায় প্রতি মাসেই গ্রামীণ এলাকার ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ কমেছে। যেমন জুলাইতে এ শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছিল সাড়ে ৮৪ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম মাসেই এ খাতে বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। তেমনিভাবে আগস্ট মাসে প্রায় ১০ শতাংশ, সেপ্টেম্বর মাসে ৩৯ শতাংশ এবং অক্টোবর মাসে ৪৯ শতাংশ বিনিয়োগ কমেছে গ্রামীণ শিল্পে। কিন্তু বিপরীতে বেসরকারি খাতে গত নভেম্বরে বিনিয়োগ বেড়ে হয়েছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

পল্লী এলাকার ঋণ বিতরণ ও আদায়ে ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, পল্লী এলাকায় ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার অন্যতম কারণ হলো অবকাঠামো সুবিধা ও উদ্যোক্তার অভাব। অনেকেই নানা পরিস্থিতির কারণে এলাকা ছাড়া হয়ে পড়েছেন। অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এসব কারণে অনেকেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি, কেউ বা ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন। 

অন্য এক ব্যাংকার জানিয়েছেন, ব্যাংক ঋণের বড় একটি অংশই বড় বড় গ্রুপ নিয়ে যাচ্ছেন। আবার তাদের বেশির ভাগই ঋণ পরিশোধ করছে না। এর ফলে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল কমে গেছে। বিশেষ করে গত জুলাই-সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকগুলোর টাকার সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করছে। এর পাশাপাশি পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের এমনিতেই একটা অনীহা থাকে, এর ওপর খেলাপি ঋণের কারণে কোনো কোনো ব্যাংকের পুরোপুরিই ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখে। ফলে যে হারে বিনিয়োগ হচ্ছিল, মাঝ খানে তার ভাটা পড়ে। আবার পল্লী এলাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ভালো উদ্যোক্তার অভাব। যাকে ঋণ দেয়া হবে, তার কাছ থেকে ঋণ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে পুরো ঋণই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। এসব বিবেচনায় পল্লী এলাকায় ঋণ বিতরণে ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। 

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্রামীণ শিল্পে ঋণ প্রবাহের ভাটা পড়লেও প্রায় প্রতি মাসেই আদায় বেড়েছে। যেমন, ৯ মাসে এ শিল্পে আদায় হয়েছে এক হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল এক হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। আদায়ের হার ২১ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ১ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামে একদিকে যেমন ঋণ বিতরণ কম করা হচ্ছে অন্য দিকে যারা ঋণ নিয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে বেশি হারে আদায় করা হচ্ছে। 

গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পের পাশাপাশি কৃষিখাতেও ঋণ বিতরণ অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে কৃষিখাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। 

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে টাকার প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে ঋণ বিতরণ বাড়লেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কমে যাওয়ায় সঙ্কোচিত হয়ে পড়ছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান। তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো পণ্য আমদানির জন্য যে পরিমাণ ঋণপত্র স্থাপন (এলসি খুলছে) করছে তা কতটুকু দেশে আসছে এবং বেশি মূল্য দেখিয়ে কম মূল্যের পণ্য আসছে কি না সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় বর্ধিত বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতি সুফল আসবে না বলে ওই সূত্র মনে করে।


আরো সংবাদ