২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অ্যাপেনডিক্স, কাদম্বিনী এবং রাজনীতি

অ্যাপেনডিক্স, কাদম্বিনী এবং রাজনীতি - ছবি : নয়া দিগন্ত

মানবশরীরে অ্যাপেনডিক্সের ব্যথা
গত সপ্তাহের তথা বুধবার ৪ জুলাইয়ের কলামের একদম শেষ বাক্যটি ছিল, আগামী সপ্তাহের বুধবারের কলামে, মানুষের শরীরের একটি ক্ষুদ্র অঙ্গ যার নাম ‘অ্যাপেনডিক্স’, সেই অ্যাপেনডিক্স নিয়ে অ্যাপেনডিক্সের সৃষ্ট ব্যথা নিয়ে লিখব। এখন সে বিষয় নিয়ে কথা বলব। মানবদেহের ভেতরে অবস্থিত অ্যাপেনডিক্সকে রূপক অর্থে আমরা ব্যথা সৃষ্টিকারী বলতে পারি। রাজনীতিতেও ওইরূপ (রূপক অর্থেই) এপেনডিক্স থাকে।

অ্যাপেনডিক্স এবং অ্যাপেনডিসাইটিসের বর্ণনা
সাদামাটা ভাষায় আমরা যেটাকে পেট বলি, সেটার ভেতরটা কী রকম তা খুব কম লোকই জানে, যদি না ছবিতে দেখতে পারে বা দেখে থাকেন। বিশেষত কোরবানির ঈদের সময় সুযোগ আছে, গরুর বা ছাগলের পেটের আকৃতি এবং ভেতরে কী আছে বা না আছে, সেই সম্বন্ধে জানার। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে, ইন্টেস্টাইন; যাকে বাংলায় বলা হয় ‘অন্ত্র’। পেটের ভেতরে দু’টি অন্ত্র আছে। একটি অনেক দীর্ঘ এবং একটি ছোট। গ্রামের বাংলায় এই অন্ত্র বা ইন্টেস্টাইনকে বলা হয় আঁতুড়ি। প্রথমটি তথা বৃহদন্ত্র (ইংরেজিতে লার্জ ইন্টেস্টাইন) নলের মতো ফাঁপা। বৃহদন্ত্রের তিনটি অংশের মধ্যে প্রথম অংশের নাম হচ্ছে সিকাম। এই সিকাম এবং ক্ষুদ্রান্ত্র (ইংরেজি পরিভাষায় স্মল ইন্টেস্টাইন) যেখানে মিলিত আছে, সেখানে সিকামের সাথে ছোট্ট একটি আঙুলের মতো বা আঙুলের আকৃতির থলি আছে। এই থলিকে বলা হয় অ্যাপেনডিক্স। ছোট্ট একটি মুখ আছে। ওই মুখ দিয়ে কোনো সময় যদি কোনো খাদ্যদ্রব্য বা মল বা কৃমি ঢুকে যায়, তাহলে ওই থলির বা অ্যাপেনডিক্সের ভেতরে রক্ত ও পুষ্টির অভাব দেখা দেয়। ওই সময় অ্যাপেনডিক্সের ভেতর নানারকম জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া জন্মগ্রহণ করে ও বংশ বৃদ্ধি পায়। এসব জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে অ্যাপেনডিক্সের মধ্যে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়; প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হয়। এই অসুস্থতার নাম অ্যাপেনডিসাইটিস। অ্যাপেনডিসাইটিসের প্রথম লক্ষণ হলো পেটে একটানা ব্যথা, যেটা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ব্যথাটা সাধারণত নাভির চার দিক থেকে শুরু হয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যথাটা নাভির নিচে ও শরীরের ডান দিকে সরে যায়। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তীব্রতা বেড়ে যায়।

এরূপ ব্যথা হলে, অতি দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। প্রদাহের কারণে কখনো কখনো অ্যাপেনডিক্স নামক অঙ্গটি যদি ফেটে যায়, তাহলে একটি নতুন রোগ সৃষ্টি হয়, যার নাম পেরিটোনাইটিস। তলপেটে ডান দিকে ব্যথা যখন তীব্র হয়, তখন ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার অ্যাপেনডিক্স কেটে ফেলে দেয়ার পরামর্শ দেন। অ্যাপেনডিক্স নামক অঙ্গটিকে কেটে ফেলে দিলে শরীরের তথা জীবনযাপনের কোনো অসুবিধা হয় না; সে জন্যই এটাকে কেটে ফেলা হয়। কেটে ফেলার পর আর কোনো দিন অ্যাপেনডিসাইটিস হবে না। আমাদের পেটের ভেতর অবস্থিত অ্যাপেনডিক্স নামক অঙ্গটি, শরীরে বড় কোনো উপকার করে না, অঙ্গটি আমাদের প্রত্যেকের শরীরের অভ্যন্তরে, নাভি থেকে ডান দিকে নিচে, পেটের ভেতর লুকানো আছে। কিন্তু এই অঙ্গের উপস্থিতি সম্বন্ধে কোটি কোটি মানুষই অজ্ঞ বা অসচেতন। শুধু ব্যথা উঠলেই আমরা জানি যে, অ্যাপেনডিক্স নামক একটি অঙ্গ আমাদের শরীরে আছে। ব্যথা উঠলেই আমরা বলি অ্যাপেনডিসাইটিস হয়েছে।

কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম বিখ্যাত ছোটগল্পের নাম ‘জীবিত ও মৃত’। গল্পটি হৃদয়গ্রাহী, চিত্তাকর্ষী। কিন্তু গল্পটি আমাদের কাছে বিখ্যাত, গল্পের শেষ লাইনটির জন্য বা শেষ ঘটনাটির জন্য। লাইনটি হলো : ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।’ এই বাক্যটি বাংলা ভাষায় লেখালেখি করে বা একটু গভীরভাবে বলাবলি করে, তাদের কাছে সুপরিচিত একটি বাক্য। কিন্তু ২০১৮ সালের তরুণ সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে বা এমনকি প্রবীণ সম্প্রদায়েরও অনেকের কাছে এই বাক্যের উৎপত্তির ইতিহাস অজানা। তাই একটি অনুচ্ছেদে সেই ছোটগল্পের হুবহু সারমর্ম না হলেও, সারসংক্ষেপ ও তাৎপর্যের মিশ্রিত একটি বর্ণনা উপস্থাপন করছি। অন্তত এক শ’ বছর আগের কথা। একটি রক্ষণশীল হিন্দু পরিবার। পরিবারপ্রধানের নাম শারদা শংকর। তার স্ত্রী আছে, শিশুসন্তান আছে কিন্তু সেই শিশুটি অসুস্থ। ওই সংসারেই, শারদা শংকরের কনিষ্ঠ ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর নাম কাদম্বিনী; তার সঙ্গে শিশুর ভাব বেশি। হঠাৎ একদিন কাদম্বিনীর হৃদয়ের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল; আমাদের বর্তমান ভাষায় হার্ট অ্যাটাক। সংসারের সবাই মনে করল কাদম্বিনী মরে গেছে। তাই পাড়ার কয়েকজন লোক, মৃত দেহটিকে পোড়াতে নিয়ে গেল, দূরে শ্মশানে।

সময়টা ছিল শ্রাবণ মাস। সন্ধ্যার পর বৃষ্টিবাদল প্রচুর হওয়ায় লোকগুলো মৃতদেহকে শ্মশানে রেখে কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে গেল। শীতল পানির পরশে (তথা সৃষ্টির যে কোনো রহস্যে) মৃতদেহটি খাড়া হয়ে দাঁড়াল; কিন্তু ওই ব্যক্তি (তথা কাদম্বিনী নামক মহিলাটি) নিজেকে এই জগৎ সংসারের একজন অধিবাসী বলে মনে করতে পারল না। অতএব, কাদম্বিনী আর ঘরে ফিরল না। একপর্যায়ে কাদম্বিনী আশ্রয় নিলো তার বন্ধুর বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও কিছুর সাথেই সে কোনো রকম যোগ অনুভব করতে পারল না। তাই, ওই বন্ধুর বাড়ি থেকে এক রাতে গোপনে, কাদম্বিনী ফিরে এলো শারদা শংকরের গৃহের অন্তঃপুরে। কাদম্বিনী পরম মমতায় অসুস্থ শিশুটিকে কোলে তুলে নিলো; শিশুর ‘কাকিমা’ ডাক, কাদম্বিনীর মনকে ক্ষণিকের জন্য মাটির সংসারে গেঁথে দিল। অসুস্থ শিশু তার কাকিমাকে ঠিকই চিনেছিল। সে সময় অসুস্থ শিশুর মা তথা শারদা শংকরের স্ত্রী কাদম্বিনীকে দেখে ফেলল; ভীষণ ভয় পেল। শারদা শংকরের পুরো সংসার এবং গ্রামের সবাই জানে, কাদম্বিনী মরে গিয়েছিল এবং তাকে দাহ (পোড়ানো) করা হয়েছে শ্মশানে; অতএব শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো কাদম্বিনীকে দেখে শিশুর মা প্রচণ্ড ভয় পাবে, এটাই স্বাভাবিক। কাদম্বিনী বলল, ‘দিদি, তোমরা আমাকে দেখিয়া কেন ভয় পাইতেছ? এই দেখো, আমি তোমাদের সেই তেমনই আছি।’ কিন্তু না, কেউই তার কথা বিশ্বাস করল না। তখন কাদম্বিনী তীব্র কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ওগো আমি মরি নাই গো, মরি নাই। আমি কেমন করিয়া তোমাদের বুঝাইব, আমি মরি নাই। এই দেখো, আমি বাঁচিয়া আছি।’

এ কথা বলেই, কাদম্বিনী একটি কাঁসার বাটি হাতে তুলে নিয়ে নিজের কপালে আঘাত করতে লাগল; কপাল ফেটে রক্ত বের হলো; তখন কাদম্বিনী পুনরায় চিৎকার করে বলল, ‘এই দেখো আমি বাঁচিয়া আছি।’ এতক্ষণ সংসারের কর্তা শারদা শংকর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন; অসুস্থ শিশু ‘বাবা বাবা’ করে চিৎকার করতে লাগল; ভীত রমণী তথা শারদার স্ত্রী মূর্ছা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তখন কাদম্বিনী চিৎকার করতে লাগল, ‘ওগো আমি মরি নাই গো, মরি নাই গো, মরি নাই।’ সে ঘর থেকে বের হলো, বাড়ির পেছনে তথা অন্তঃপুরের পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দিলো; শারদা শংকর উপরের ঘর থেকে শুনতে পেলেন, ঝপাস করে একটি শব্দ হলো। সমস্ত রাত বৃষ্টি পড়তে থাকল, পরের দিনও বৃষ্টি পড়তে থাকল। যখন বৃষ্টি কমে এলো, তখন শারদা শংকর উঁকি দিয়ে দেখল পুকুরে কিছু আছে কি না; দেখল কাদম্বিনীর ভাসমান দেহ। কাদম্বিনী যে আগে দাহ হয়নি, কাদম্বিনী যে মরেনি, এই কথা প্রমাণ করার জন্য আক্ষরিক অর্থেই তথা বাস্তবেই, মরণ ব্যতীত কাদম্বিনীর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। যা হোক, শত বছর ধরে, প্রবাদবাক্যে রূপ নিয়েছে ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। অ্যাপেনডিক্স এবং কাদম্বিনীর কাহিনী কেন বললাম, সেটা কলামের শেষ অনুচ্ছেদে আছে।

কয়েকটি সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম
চার-পাঁচটি পত্রিকার সৌজন্য কপি পাই; আবার চার পাঁচটি পত্রিকার গ্রাহকও। আট-দশটি পত্রিকা নিবিড়ভাবে বা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পড়া কঠিন এবং সময় ক্ষেপণকারী কাজ। তাই কোনো সময় কোনো পত্রিকা নিবিড়ভাবে পড়ি; আবার কোনো সময় সেরেফ চোখ বুলিয়ে যাই। কিন্তু উভয় পদ্ধতিতেই প্রথম পৃষ্ঠা, শেষ পৃষ্ঠা এবং সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার শিরোনামগুলোকে কোনোভাবেই অবহেলা করি না। ওই শিরোনামগুলোর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আছে; জোটের রাজনীতির সম্পর্ক আছে; ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় সরকারি জোট এবং রাজপথের বিরোধীদলীয় ২০ দলীয় জোট উভয়ের সম্পর্ক আছে। সেই শিরোনামগুলোকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি। প্রথমে তারিখ, তারপর পত্রিকার নাম, তারপর শিরোনাম এবং সবশেষে সংক্ষেপে আমার মন্তব্য।

(এক) ৯ আগস্ট ২০১৭। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘হিসাব-নিকাশে দুই জোট : জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলকে নিয়েই নির্বাচনে যাবে আওয়ামী লীগ; জোট রেখেই অন্যদের সঙ্গে সমঝোতা চায় বিএনপি’। আমার মন্তব্য : দু’টি জোটের বাইরে অন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল আছে, তাদের সাথে যোগাযোগ বা তাদের সাথে নিয়ে আন্দোলন করার জন্য যোগাযোগ বেশ আগে থেকেই ছিল। ৯ আগস্ট ২০১৭ এই সংবাদকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই সংবাদে, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক এক জায়গায় লিখেছেন, ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি আসন ভাগাভাগির রাজনীতি করতেও আগ্রহী দলটি।’ উল্লেখ্য, তখন ম্যাডাম খালেদা জিয়া জেলের বাইরে ছিলেন। (দুই) ২৬ আগস্ট ২০১৭। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘নির্বাচনী প্ল্যানে জাপা জামায়াত : এরশাদের নেতৃত্বে দ্বিমুখী প্রস্তুতি; জামায়াতের প্রস্তুতি নীরবে গোপনে’। আমার মন্তব্য : যেহেতু দলটির নিবন্ধন নেই, সেহেতু দলটি একাধিক বিকল্প সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

(তিন) ৭ জানুয়ারি ২০১৮। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘জোটের আবদারে বিব্রত দুই দল : আওয়ামী লীগের শরিকরা চায় শতাধিক আসন; বিএনপির কাছে প্রত্যাশা দেড় শতাধিক’। মন্তব্য : চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে তফাৎ থাকতে পারে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু চাওয়া-পাওয়া নিয়ে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সেই চেষ্টা করাটাও প্রয়োজন। (চার) ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। প্রথম আলো : ‘খালেদাকে ছাড়া বিএনপিকে নির্বাচনে চায় আওয়ামী লীগ’। আমার মন্তব্য : গত এক-দেড় বছর ধরে, বিশেষ করে গত পাঁচ মাস ধরে সরকার যেভাবে বেগম জিয়াকে কারাগারে অন্তরীণ রেখেছে এবং আইনের জোর-জবরদস্তিমূলক অপব্যবহারের মাধ্যমে তাকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে, এতে বোঝা যায় যে, সরকার বেগম জিয়াকে রাজনীতি থেকে না হলেও নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু ৮ জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত বিএনপি নেতাদের এবং ২০ দলীয় নেতাদের কথাবার্তা থেকে এটা স্পষ্ট খালেদাকে ছাড়া নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। তবে নির্বাচন হতে আরো চার মাস বাকি। (পাঁচ) ১২ মার্চ ২০১৮। প্রথম আলো। ‘নির্বাচন নিয়ে এখনই আলোচনা চায় বিএনপির শরিকেরা’। এ বিষয়ে মন্তব্য : কয়েকটি শরিক দলের এইরূপ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর এসেছে : ‘বেগম জিয়া কারাগারে এই সময় আসন বণ্টন নিয়ে কথাবার্তা বলা বাস্তবসম্মত নয়’। (ছয়) ১৭ মার্চ ২০১৮। যুগান্তর। ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : যোগ্য প্রার্থীর সন্ধানে আওয়ামী লীগ বিএনপি’। এ ব্যাপারে মন্তব্য : খুবই স্বাভাবিক একটি কথা। তবে যোগ্য প্রার্থীর সন্ধানে বিএনপি এটা যেমন ঠিক, সবাই বিশ্বাস করেন যে, জোটের কথা মাথায় রেখেই সন্ধান করা হচ্ছে বা হবে। (সাত) ২৮ মার্চ ২০১৮। মানবজমিন। ‘জোটের বৈঠকে নেতাদের ঐকমত্য, আগে খালেদার মুক্তি, পরে নির্বাচন’। এ ব্যাপারে মন্তব্য : সংবাদটি পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় আছে এবং এটি একটি বড় সংবাদ।

সংবাদদাতা একটি বড় বিশ্লেষণ করেছেন জোটের অভ্যন্তরে আসন বণ্টনসংক্রান্ত ইন্টারঅ্যাকশন নিয়ে। (আট) ০৩ এপ্রিল ২০১৮। নয়া দিগন্ত। ‘নির্বাচন : বিএনপির চার এজেন্ডা’। আমার মন্তব্য : সংবাদে মূলত ডক্টর খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে চারটি শর্ত প্রযোজ্য- এক. খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রেখে নির্বাচন নয়, দুই. নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক, তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে, চার. নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে। ৮ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কথাগুলো পুনরায় বলেছেন। এ কথাগুলোর সঙ্গে আমরাও একমত। (নয়) ৬ এপ্রিল ২০১৮। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘ভোটের আগে জোটের সমস্যা : ঢাল তলোয়ার নেই, তবুও হতে চায় নৌকার মাঝি; জোটের বাইরে বামরা করতে চায় আলাদা কিছু; এলাকায় নেই, তবুও চাওয়া ধানের শীষের মনোনয়ন; একলা চলো নীতিতে জামায়াত’। আমার মন্তব্য : শিরোনামটার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। সচেতন পাঠক নিজে উপসংহার টানতে পারেন। (দশ) ২০ এপ্রিল ২০১৮। কালের কণ্ঠ। ‘আসন ছাড় দিয়েও বড় জোট চায় বিএনপি’। আমার মন্তব্য : শিরোনামটি খুব স্পষ্ট। আসন ছাড় দেয়ার বিষয়টি বিদ্যমান ২০ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে যেমন আলোচনার বিষয়, তেমনি সম্প্রসারিত সম্ভাব্য বড় জোট বা সমমনা ভিন্ন জোটের শরিকদের সঙ্গেও আলোচনার ব্যাপার। কেউ বলেন, শিগগির আলোচনা করলে ভালো, কেউ বলেন, আগে ক্ষমতাসীন জোটের আসন বণ্টন দেখো তারপর। কেউ বলেন, যেখানে সেখানে আসন দিলেই তো হবে না, বণ্টনকারী এবং বণ্টন গ্রহীতা উভয়কেই কম হোক বেশি হোক ছাড় দিতে হবে। (এগারো) ২৮ এপ্রিল ২০১৮। মানবজমিন। ‘ভোট রাজনীতিতে নয়া জোটের আওয়াজ’।

আমার মন্তব্য : ২০০৮-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনের আট-দশ সপ্তাহ আগে যুক্ত ফ্রন্ট নামক একটি জোট হয়েছিল। ওই যুক্ত ফ্রন্ট, নির্বাচনের পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত না হলেও, প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। আগামী নির্বাচন এগিয়ে এলে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মেরুকরণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। (বারো) ২ জুন ২০১৮। যুগান্তর। ‘বিএনপির সঙ্গে এখনই আলোচনা চায় : শরিক দলের দাবি ১৭৫ আসন’। এখানে আমার মন্তব্য এতটুকুই যে, চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য থাকবে; কিন্তু ফয়সালাটি যেন সম্মানজনক হয় এটা গুরুত্বপূর্ণ। (তেরো) ৩ জুন ২০১৮। যুগান্তর। ‘জোটের আসন বণ্টন : সময় চায় আওয়ামী লীগ’। আমার মন্তব্য : তিন লাইন আগে যে মন্তব্য করেছি, সেটা এখানেও প্রযোজ্য। (চৌদ্দ) ৫ জুলাই ২০১৮। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘তারেকের টেবিলে বিএনপির ৩০০ আসনের প্রার্থী তালিকা।’

আমার মন্তব্য : বেশির ভাগ মানুষ বলছেন এই তালিকা জেনুইন নয়। অনেক মৃত ব্যক্তির নাম এই তালিকায় আছে! আমার নাম দুইটি আসনে লেখা আছে; যদিও জানি যে, একটি শরিক দলের প্রধান হিসেবে আমার আসন নিয়ে প্রধান শরিক বিএনপির মনে কোনো দ্বন্দ্ব নেই; আমি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে নির্বাচন করব ইনশা আল্লাহ; যদি শর্তগুলো পূরণসাপেক্ষে নির্বাচন হয়। (পনেরো) ৬ জুলাই ২০১৮। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘প্রার্থী তালিকা তৈরি হচ্ছে আওয়ামী লীগেরও।’ আমার মন্তব্য : ৫ জুলাই এই পত্রিকাটি বিএনপির ৩০০ আসনের তালিকা ছাপায়; ৬ জুলাই তারিখে ১৩৫টি আসনের তালিকা ছাপাল। এটা কি জেনুইন নাকি অন্য কিছু, সে সম্বন্ধে আমার কোনো বক্তব্য নেই। (ষোলো) ৭ জুলাই ২০১৮। বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘১৫ আসনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে হেফাজত’। এটা কি জেনুইন নাকি অন্য সে সম্বন্ধে আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে এটুকু অনুভব করি যে, সরকারপন্থী হেফাজত এবং সরকারের বাইরে হেফাজত, উভয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য আছে।

অ্যাপেনডিক্স কাদম্বিনী এবং রাজনীতি
পাঁচ বছর আগে হেফাজতে ইসলাম নামক অরাজনৈতিক সংগঠনের আন্দোলন অর্থাৎ ঢাকা মহানগরীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশটি ছিল সরকারের জন্য অ্যাপেনডিক্সের ব্যথা বা অ্যাপেনডিসাইটিসের মতো সমস্যা। তখন ৫ মে রাতেই সরকার অপারেশন করে অ্যাপেনডিক্স ফেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিককালের কোটা সংস্কার আন্দোলনও সরকারের জন্য অ্যাপেনডিসাইটিসের মতো। ব্যথাটা ওঠার আগে যেমন নোটিশ দেয় না, তেমনি কোটাসংস্কার আন্দোলনও একটু একটু করে দানা বেঁধে হঠাৎ ব্যাপক রূপ ধারণ করেছিল রমজানের আগে। এ রকম অ্যাপেনডিক্সতুল্য ঘটনা ২০ দলীয় জোটের রাজনৈতিক প্রবাহেও থাকতে পারে; আমরা সে সম্পর্কে সচেতন থাকাই ভালো। ছোটগল্পের কাদম্বিনী পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করল; ঝাঁপ দেয়াটা বাস্তব, মৃতদেহটা ভেসে ওঠা বাস্তব; এর আগে সে বেঁচে ছিল-সেটাও বাস্তব। কিন্তু বেঁচে থাকার বাস্তবতা বিশ্বাস না করায় পরের দু’টি বাস্তবতা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পত্রিকার কাজ দেশবাসীকে অবহিত রাখা, সচেতন রাখা। পাঠকের কাজ পড়া এবং অবহিত থাকা। মুদ্রিত কথাগুলোতে যেমন সংবাদ থাকে, তেমনি লাইনগুলোর মাঝখানে অমুদ্রিত অবস্থায়ও সংবাদ থাকে। যে পাঠক যত বেশি বুদ্ধিমান, তিনি তত বেশি অমুদ্রিত সংবাদ আবিষ্কার করতে পারেন। এ কথা খেয়াল রেখেই অনেক শিরোনাম উদ্ধৃত করলাম।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

 


আরো সংবাদ