২১ নভেম্বর ২০১৮

ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হতে পারে উদ্ধার পাওয়া থাই শিশুরা

উদ্ধার পাওয়া থাই কিশোরদের কেভ ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা - ছবি : সংগৃহীত

থাম লুয়াং গুহা থেকে কিশোর ফুটবলারদের উদ্ধার করার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় চিয়াং রাই শহরের একটি হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে অবস্থানরত লোকজন উল্লাস করতে শুরু করে। এক পক্ষকাল আটক থাকার পর গতকাল ১২ কিশোর ফুটবলার ও তাদের কোচকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয় ; গুহায় থাকা এসব বাদুরের কারণেই দ্রুত বংশবৃদ্ধি হয় হিস্টোপ্লাজমস ছত্রাকের : এএফপি -
থাইল্যান্ডে যখন গুহায় আটক ১২ কিশোর ও তাদের কোচকে উদ্ধার করা হচ্ছিল, তখন পুরো বিশ্বজুড়ে প্রার্থনা চলছিল তাদের সুস্থভাবে ফিরে আসার। গত তিন দিনে একে একে তারা ফিরে এসেছে মুক্ত পরিবেশে। কিন্তু বিরূপ পরিবেশে থাকার কারণে তাদের সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে। কারণ অন্ধকার ও ভেজা গুহায় তারা দীর্ঘসময় কাটিয়েছে। এর ফলে তারা যেমন শারীরিক সমস্যায় পড়েছে, তেমনি শিকার হয়ে মানসিক অবসাদেরও। সব সময়ই গুহার ভেতর একটি বিপজ্জনক ও বিরল সংক্রমের শিকার হতে হয়। প্রায় সময়ই একে ‘কেভ ডিজিজ’ বা ‘গুহা রোগ’ও বলা হয়।

মঙ্গলবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্ধার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম দফায় উদ্ধার করা চারজনের মধ্যে দুজনের ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে। অন্যদের পরীক্ষা চলছে। তবে কারোরই জ্বর নেই বলে তারা উল্লেখ করেন। 

কেভ ডিজিজ কী?
কেভ ডিজিজকে স্পিøওনোসিস বলা হয়। এটা হচ্ছে হিস্টোপ্লাজমস ক্যাপসুলাতাম নামে এক ধরনের ছত্রাকের সংক্রমণ। ১৯৪০ সালে তুষারঝড়ে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নেয়া কয়েকজন এ সংক্রমণের শিকার হলে প্রথমবারের মতো কেভ ডিজিজের কথা আলোচনায় আসে। সাধারণভাবে এ ছত্রাক পুরো বিশ্বেই দেখা যায়। বর্ধনশীল এই ছত্রাকটি এশিয়ার গুহা থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীতে পর্যন্ত পাওয়া যায়। মাটিতেই এটি বৃদ্ধি পায় এবং বাদুর ও পাখির বিষ্ঠা থেকে এটি পুষ্টি সংগ্রহ করে।
কিভাবে এটি চিহ্নিহ্নত করা যায়?
যাদের এ রোগের ব্যাপারে সন্দেহ করা হবে তাদের প্রস্রাব, ফুসফুস, অন্যান্য টিস্যু ও রক্তের নমুনা রোগ শনাক্ত করতে সহায়তা করে এবং এ ক্ষেত্রে এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানেরও প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, ভ্রমণ ইতিহাস, গুহা পরিস্থিতি ও অন্যান্য লক্ষণও এ ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। যদি কেউ মাটি খনন করে তাহলে তার শরীরে এ ছত্রাক ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার শুধু হাঁটার দ্বারাও কারো শরীরে বায়ুবাহিত এ ছত্রাক ও রোগ ছড়াতে পারে। বাতাসে উড়ে এটি সাধারণ দর্শকের ফুসফুসে ঢুকে পড়ে। তবে এ ছত্রাক এতই ছোট যে, খালি চোখে তা দেখা যায় না। সাধারণভাবে হিস্টোপ্লাজমোসিসের বংশবৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত জায়গা হিসেবে গুহাকেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। গুহার বিশেষ পরিবেশে এই ছত্রাকের বংশবৃদ্ধির জন্য খুবই উপযোগী। আর বর্তমানে প্রতি বছর বিশ সহস্রাধিক লোক গুহা ভ্রমণে যাচ্ছে, ডাইভিং করছে। এর ফলে এ ছত্রাকের দ্বারা সংক্রমণের হারও বাড়ছে। এ ছত্রাকটি যদিও বায়ুর দ্বারা ছড়ায় তবে কোনো মানুষ বা প্রাণীর দ্বারা এ ছত্রাকের সংক্রমণ হয় না। 

রোগের লক্ষণ
এ গুহা রোগটি শনাক্ত করা বেশ কঠিন। আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য, ছত্রাক কতটুকু আক্রান্ত করেছে ইত্যাদি বিষয়ের ওপর এর শনাক্তকরণ নির্ভর করে। অনেক সময় স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির ক্ষেত্রে এর কোনো লক্ষণই হয়তো ধরা পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এ রোগে মানুষ বিশেষ কোনো অসুস্থতার মধ্যেও পড়ে না। তাদের মধ্যে হয়তো জ্বর, কাশি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঠাণ্ডা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বুক ব্যথা দেখা দিতে পারে। ছত্রাক সংক্রমণের তিন এবং ১৭ দিন পরে এ লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে। তবে যদি কারো অন্য বড় কোনো রোগ থাকে, যেমন অনিয়ন্ত্রিত এইডস অথবা ক্যান্সার তাহলে এক্ষেত্রে ছত্রাকের সংক্রমণটি ফুসফুসের পাশাপাশি ব্রেনেও আঘাত করতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে এটি তার মৃত্যুর কারণও হতে পারে। 

প্রতিকার ও প্রতিরোধ
বেশির ভাগ সময়েই একটি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর এই কেভ ডিজিজ নিজে থেকেই সেরে ওঠে। তবে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যদি এ সংক্রমণ হয় তাহলে সেক্ষেত্রে ছত্রাকরোধী কিছু ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। এর মেয়াদ হতে পারে তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত। 
যেহেতু এ ছত্রাক অনেক জায়গাতেই পাওয়া যায়, তাই এ থেকে বাঁচা কঠিন। তবে একটি উপায়ে তা থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়, আর তা হলো, নিজের আশপাশ পাখি ও বাদুরের বিষ্ঠা থেকে পরিষ্কার রাখতে হবে। আর যারা গুহা ভ্রমণে বা ডাইভিংয়ে যেতে চান, তারা স্থানীয় লোকজন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে পরামর্শ করে কাজ করলে এবং ধূলিকণা থেকে রক্ষাকারী বিশেষ মাস্ক পরলে সংক্রমণের হার অনেকটা কমতে পারে। আর অন্য রোগ যাদের আছে, তাদের ক্ষেত্রে গুহা ভ্রমণ পরিহার করতে হবে।


আরো সংবাদ