১৯ নভেম্বর ২০১৮

ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের - ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেসম্যান ও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রন পল বলেছেন, ইরান নিয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে তার দেশ। ১৯৫৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থান ও কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মুজাহিদিনে খালকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় রকমের ভুল। রন পল বলেন, আবারো মুজাহিদিনে খালকের মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টার অর্থ হচ্ছে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো সেখানে কাজ করছে।

জাতিসঙ্ঘের তদারকিতে ৬ জাতির সাথে হওয়া ইরানের পারমাণবিক চুক্তি ভঙ্গের কথা যুক্তরাষ্ট্র বললেও তার কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। উল্টো ইরানের সরকার পতন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে বিভিন্ন দেশের ওপর ইরানে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটিতে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মোকাবেলায় ইরান মার্কিন ডলারের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের সাথে নিজস্ব মুদ্রায় লেনেদেন ছাড়াও পণ্য আমদানির মূল্য তেল দিয়ে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক দিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ইরানে বিনিয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়লেও এর সুযোগ হিসেবে চীন, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তেহরানের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেন ও বিনিয়োগ আরো বৃদ্ধি করছে।
ইরানের তেলমন্ত্রী বিজান জাঙ্গানেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি সত্ত্বেও তার দেশের তেল উত্তোলন ও রফতানিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি বরং মার্কিন হুমকি মোকাবেলায় পরিকল্পনা সফলতার সাথে কাজ করছে। ওপেকের নীতি হচ্ছে- রাজনৈতিক চাপের কারণে কখনো আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতি পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তেল উত্তোলন বাড়াতে সৌদি আরবের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, যদি ইরান তেল রফতানি করতে না পারে তাহলে অন্যরাও তেল রফতানি করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, তিনি সৌদি আরবের দৈনিক তেল উত্তোলনের পরিমাণ ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত বাড়ানোর যে অনুরোধ করেছিলেন বাদশাহ সালমান তাতে সম্মতি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান ও ভেনিজুয়েলায় বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ সৃষ্টির’ লক্ষ্যে সৌদি আরবের তেল উত্তোলন বাড়ানো জরুরি। এভাবে ইরানের তেল উত্তোলন শূন্যের কোঠায় আনা হবে।

কিন্তু সৌদি আরব, আমিরাত, ইরাক, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশকে তেল রফতানি করতে হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী জাফারি প্রেসিডেন্ট রুহানির তেল রফতানির ক্ষেত্রে ‘চূড়ান্ত ও নিষ্পত্তিমূলক’ বক্তব্যের প্রশংসা করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে এ হুমকি বাস্তবায়ন করবে তার বাহিনী। হয় সবাই হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করবে অথবা কেউ করতে পারবে না। হরমুজ প্রণালী হলো ইরান ও ওমানের মাধ্যখানে অবস্থিত একটি সরু জলপথ। বিশ্বের ৩৩ শতাংশ জ্বালানি তেল এই জলপথ দিয়ে রফতানি হয়। জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ ২১ মাইল। এর মধ্যে কেবল চার কিলোমিটার জাহাজ চলাচলের জন্য উপযোগী।

যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি ডট কম এক খবরে বলছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন বিল আরবান এক বিবৃতিতে বলেছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক বিষয় প্রযোজ্য সেখানে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করব। আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মিডিয়া অনলাইন ব্লুমবার্গ বলছে, তেল রফতানিতে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দর দেড়শ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে এবং তা অবধারিত বিশ্ব মন্দা ডেকে আনবে। গ্লোবাল গ্রোথ অ্যাডভাইজারের ম্যানেজিং পার্টনার রুজবেহ আলিয়াবাদি বলেছেন, ইরানের তেল বিক্রি বন্ধের উদ্যোগ নিলে আন্তর্জাতিক মন্দা দেখা দেবে।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ইরানের সাথে বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে না। রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন একমত হয়েছে ইরানের সাথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে একটি স্থায়ী কৌশল নির্ধারণের জন্য। ইরানের সাথে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করেছে তুরস্ক। দেশটি বলেছে, তারা তা মানবে না। ভিয়েনায় যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া পরমাণু সমঝোতায় স্বাক্ষরকারী বাকি পাঁচ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে ইরানের বৈঠকের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মুগেরিনি এক বিবৃতিতে ইরানের সাথে তেল কেনা-বেচা, ব্যাংকিং লেনদেন এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ওই বৈঠকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট রুহানি জার্মান চ্যান্সেলর ও ফরাসি প্রেসিডেন্টের সাথে টেলিফোন সংলাপ করেন। সংলাপে তিনি বলেন, ভিয়েনা বৈঠকের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে পরমাণু সমঝোতার ভবিষ্যৎ। এর আগে ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ থাকা অবস্থায় ইউরোপ কিভাবে তেহরানের স্বার্থ রক্ষা করবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টি কর্মপরিকল্পনা ও কার্যপ্রণালী চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফ। তিনি বলেন, পরমাণু সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলায় বাকি দেশগুলোর কার্যক্ষেত্রে তাদের এই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এর আগে ইউরোপীয় তিন দেশের দেয়া প্যাকেজ প্রস্তাব ইরান গ্রহণ করেনি। অতীত অভিজ্ঞতায় ইরান দেখেছে, ইউরোপীয়রা নিজেদের স্বার্থই দেখে এবং মার্কিন নীতিই অনুসরণ করে। এক্ষেত্রে কোনো বাগাড়ম্বর না করে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ দেখতে চায় তেহরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের মাধ্যমে ইরানের রেজিম চেঞ্জের প্রকল্প এগিয়ে নিতে চায়।

পেন্টাগনের অনলাইন মিডিয়া ন্যাশনাল ইন্টারেস্টসহ একাধিক মার্কিন মিডিয়া বলছে- ইরানে রেজিম চেঞ্জ না করে ‘বিহেভিয়ার চেঞ্জ’ করা উচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের, যা উত্তর কোরিয়ার সাথে চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটির ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তেহরানের বিরুদ্ধে রেজিম চেঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়নে নেমেছেন। নিয়োগ হওয়ার আগেই মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য ইরানে রেজিম চেঞ্জ। বোল্টন লিবিয়ার উদাহরণ টেনে উত্তর কোরিয়ার সাথে আলোচনা প্রায় ভেস্তে দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের আইনজীবী রুডি গিউলিয়ানি বলেছেন, ট্রাম্প ইরানে রেজিম চেঞ্জের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, কংগ্রেসের অবশ্যই ইরানে রেজিম চেঞ্জে যা যা করা উচিত তা করতেই হবে। বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের শাসক পরিবর্তনের মালিক দেশটির জনগণ নাকি অন্য কেউ? কারণ, ইরানের শাসকেরা এখনো জনবিচ্ছিন্ন হননি।

 


আরো সংবাদ