২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পাকিস্তানের নির্বাচন : অপ্রকাশ্য শক্তির তোড়জোড়

পাকিস্তানের নির্বাচন : অপ্রকাশ্য শক্তির তোড়জোড় - ছবি : সংগৃহীত

জাতীয় নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময় আগে ফলাফলের পূর্বাভাস দেয়াটা কঠিন। পানামা গেট কেলেঙ্কারির আগে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে পিএমএল-এন সহজে জয়লাভ করবে বলে আভাস দেয়া হয়েছিল। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসির মহিমায় আনন্দে আপ্লুত হয়ে জাতি সত্যিকারের ফল পাওয়ার আগে তাদের রাজনৈতিক ফলাফলের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে। এ দিকে, শিগগির সিপিইসিকে জাতীয় রাডার থেকে অন্য দিকে সরিয়ে দেয় পানামা কেলেঙ্কারি।

এই কেলেঙ্কারিতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ (পিএমএল-এন)-এর জনপ্রিয়তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে নয় বরং দলটির দৃশ্যমান এবং গোপন শত্রুরা এই কেলেঙ্কারিকে কাজে লাগানোর কারণে।

পিএমএল-এনের বিরুদ্ধে অনেক বিতর্কিত রায় চলমান রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেউ কেউ দল ত্যাগ করেছেন। সিনেটের নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হওয়ার পর দলত্যাগীদের অপর দলে ঢোকানোর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করার প্রয়াস চলে। অনেকেই মনে করেন, একটি অপ্রকাশ্য শক্তি এসব ঘটনার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। দ্রুত গুজব ছড়িয়ে পড়ে, ‘তারা’ পিএমএল-এনকে ক্ষমতায় ফিরে আসতে দেবে না। বাইরের ‘হামলার’ কারণে দলের অভ্যন্তরেও ফাটল ধরেছে। এসব তৎপরতার কারণে এবং নির্বাচনের সময় নওয়াজ শরিফের সম্ভাব্য অনুপস্থিতির ফলে তাদের ভোটারদের মনোবল ভেঙে গেলে ভোটারের উপস্থিতি কমে যেতে পারে।

এভাবে, পিএমএলের একটি শক্তিশালী সরকার গঠনের সম্ভাবনা পুনরায় হ্রাস পেয়েছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। ২০১৩ সালে নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ (সংরক্ষিত আসন ছাড়াই) ১২৬টি আসনে জয়লাভ করেছিল এবং স্বতন্ত্র, জেইউআইএফ, পিকেএমএপি এবং এনপিকে নিয়ে সহজেই ১৩৭-এর ম্যাজিক সংখ্যা অতিক্রম করে। এখন হয়তো পিএমএল-এন ৮০টি আসনের বেশি পাবে না। কেউ কেউ বলছেন, শাহবাজ শরিফের উত্থান বাধাগ্রস্ত করার জন্য নওয়াজ শরিফ হেরে যেতে চান। কিন্তু এনএবি, অর্থাৎ জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরো তাকে দোষী সাব্যস্ত করলে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য তার নিজেরই প্রধানমন্ত্রী দরকার।

পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ বা পিটিআই সাধারণভাবে ২৮টি আসন পেয়েছিল এবং এবার হয়তো এই সংখ্যা হিসাব করে ৭০-৮০ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পিএমএল-এনের ক্ষতি হলে তাদের হবে ‘অর্জন’। কেউ কেউ বলেছেন, এমনকি ‘প্রধান’ শক্তি পিটিআই বেশি আসন পাক, তা চায় না। তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতেই তারা এটা চান না। গতবার পিপিপি ৩২ আসন পেয়েছিল এবং তা হয়তো এই সময়ে বেড়ে ৪০ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
পিপলস পার্টি বা ফেডারেল কোয়ালিশনে পিপিপির নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। ছোট ছোট গ্রুপের জন্য (স্বতন্ত্র এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল) প্রায় ৭৫ আসন ছেড়ে দেয়া হতে পারে। তারপর হয়তো সবার একত্রে ৮৫টি আসন হতে পারে। এদের বেশির ভাগ আসন হতে পারে অপ্রকাশ্য শক্তির দর কষাকষির ফসল এবং এসব দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে চতুর্থ একটি শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েও যেতে পারে।

সুতরাং পিএমএল-এনকে ১৩৭ আসনে পৌঁছতে হলে হয়তো বাইরে থেকে প্রায় ৬০টি আসন প্রয়োজন। তারা এখনো স্বাধীন মানসিকতাসম্পন্ন লিবারেল পার্টিগুলোকেও হিসাব করতে পারেন। এসব দলের মধ্যে রয়েছে পিকেএমএপি, এনপি এবং এএনপি। এসব দলের ১০টি আসন পিএমএল-এন নিজেদের পক্ষে হিসাব করতে পারে। কিন্তু ছোট গ্রুপগুলোকে পিএমএল-এনকে এড়িয়ে চলতে বলা হলে সে ক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হবে পিপিপি নেতা জারদারিকে আইনগত দায়মুক্তি দিয়ে প্রেসিডেন্সির পথে নিয়ে যাওয়া।

১০টিরও বেশি দল নিয়ে কোয়ালিশন সরকার পরিচালনা করার ধারণা পিপিপিকে দেয়া হতে পারে। তবে আসিফ আলী জারদারি সহজেই নওয়াজের বিরুদ্ধে ক্রোধ দেখাতে নাও চাইতে পারেন।

যাহোক, পিটিআইয়ের অতিরিক্ত ৬০টি আসন দরকার হতে পারে। ছোট ছোট গ্রুপগুলো এগিয়ে যাওয়ার সঠিক নির্দেশনা পেলে হয়তো পিটিআইয়ের জন্য তাদরকে কাছে টানা সহজ হবে। তবে ১০টিরও অধিক দল নিয়ে সেটআপ করার ধারণা পিটিআইকেও আতঙ্কগ্রস্ত করতে পারে। পিএমএল-এনের অনুপযোগী হওয়া সত্ত্বেও পিটিআই হয়তো পিপিপিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইবে না। কেউ কেউ বলেন, ‘প্রধান’ শক্তিগুলো ইমরানকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর ব্যাপারে সতর্ক। আবার তারা ছোট গ্রুপগুলোকে একত্রে করে শাহ মেহমুদকে বিকল্প হিসেবে রেখেছেন।

ইমরানের পক্ষ থেকে ‘না’ বলা হলে সিনেট স্টাইলের অপর একটি বিকল্প উপায় নিয়ে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা-ভাবনা আছে। সেটা হলো, ছোট ছোট দলগুলোকে নিয়ে পিপিপির সাথে কোয়ালিশন গঠন করা হবে। এই কোয়ালিশনের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন একজন প্রবীণ, নম্র ও শান্ত স্বভাবের ভদ্রলোক। আর কোয়ালিশন সরকারের প্রেসিডেন্ট হবেন জারদারি। তিনিও হয়তো এই বিচিত্র বর্ণের লোকদের পিএমএল-এনের চেয়ে অগ্রাধিকার দেবেন। সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট জারদারিরও অনানুষ্ঠানিক অনেক ক্ষমতা থাকবে। এই অবস্থায় পিএমএল-এন আর পিটিআইকে মন খারাপ করে বিরোধী দলে যেতে হবে এবং তাদের বিরোধীদলীয় নেতার আসন অর্জন করার জন্য সংগ্রাম করতে হবে। এ অবস্থায় উভয় দলই বেসামরিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য একত্রে কাজ করতে পারে।

এই বিকল্প ব্যর্থ হলে এবং ছোট দলগুলো পিটিআইয়ের সাথে ঐক্যবদ্ধ হলে, জারদারি দ্রুত অধিকতর স্থিতিশীল সরকার এবং মধ্যপন্থীদের সাথে যোগ দিতে পারেন। পিটিআইয়ের বিশৃঙ্খল কোয়ালিশনকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি প্রয়োজনে পিএমএল-এন, পিকেএমএপি, এনপি এবং এএনপি, দলত্যাগী ও দুর্নীতিবাজদের নিয়ে একসাথে কোয়ালিশন গঠন করতে পারেন। একটি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ালিশনের অব্যাহত তাগিদে এটা তখন অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়তে পারে। এভাবে নির্বাচন-পরবর্তী কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হতে পারে চাতুর্যপূর্ণভাবে। ’৯০ দশকের মতো ভোট কারচুপির পরিপ্রেক্ষিতে ’৫০-এর দশকের মতো অস্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে পারে- সেখানে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রায়ই পরিবর্তন আসবে। পিএমএল-এন অথবা পিটিআই ১০০ আসনের বেশি আসনে জয়লাভ করলেই কেবল এ ধরনের অবস্থা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু এটা হবে বলে মনে হচ্ছে না।

চূড়ান্তভাবে কে জয়লাভ করবে, তা বিভিন্ন দল বাস্তবে কত আসন পাচ্ছে তার ওপর এবং ‘ক্ষমতাশালী’দের ওপর নির্ভর করবে। পিপিপি ছাড়া অন্য কোনো স্থিতিশীল সরকার গঠিত না হলে জারদারি প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। এতে করে ‘এক জারিদারি সবার ওপর ভারী’Ñএই স্লোগান বৈধতা পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিনি তার দলকে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী করানোর মতো যোগ্য নন, যিনি এখন অনেকটা নির্জীব।

কিন্তু কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার হবে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট লোভী। মাত্র চারটি পার্লামেন্ট (১৯৭২, ২০০৩, ২০০৮ এবং ২০১৩) মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। এর মধ্যে তিনটি পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে। যেসব পার্লামেন্টের দ্রুত অবসান ঘটেছে (১৯৮৮ সালের পার্লামেন্ট ছাড়া) সেগুলোর প্রায় সব ক’টির নির্বাচন সুষ্ঠু ছিল না। তাই ইতিহাস বলে, কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে যে পার্লামেন্টের জন্ম হয়, সেই পার্লামেন্ট মেয়াদ শেষ করতে পারে না। এভাবে নির্বাচিত এবং অপ্রকাশ্য শক্তির মহাকাব্যিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। কিন্তু কোনো পক্ষই এই যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করতে পারবে না।

লেখক : ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলির একজন সিনিয়র ফেলো এবং একটি প্রগ্রেসিভ পলিসি ইউনিটের প্রধান।
পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার


আরো সংবাদ