২০ নভেম্বর ২০১৮

পানাহার সম্পর্কে ইসলামের মূলনীতি দুটি

পানাহার সম্পর্কে ইসলামের মূলনীতি দুটি - ছবি : সংগৃহীত

জীবনধারণের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। জীব মাত্রেই পানাহারে অভ্যস্ত। পানাহার ব্যতীত জীবনধারণ অসম্ভব। মহান স্রষ্টা তাই প্রত্যেক প্রাণী সৃষ্টির সাথে সাথে প্রাণধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করেছেন। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে বলা হয় ‘রিজিক’। প্রত্যেক সৃষ্টির জন্যই স্রষ্টার পক্ষ থেকে রিজিকের ব্যবস্থা রয়েছে। যিনি স্রষ্টা, তিনিই রিজিকদাতা। তাই স্রষ্টার এক নাম ‘রাজ্জাক’। রাজ্জাক শব্দের অর্থ রিজিকদাতা।

মানুষের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা মহান স্রষ্টা দু’ভাবে করেছেন। প্রথমত, প্রকৃতি থেকে আলো-হাওয়া পানি ইত্যাদির জোগান যেভাবে অন্যসব প্রাণী পেয়ে থাকে, মানুষ সেভাবে অনায়াসে ঐসব ভোগ করে। অন্যসব প্রাণী প্রকৃতি থেকে যেসব রিজিক পায়, সেভাবেই তারা সেগুলো ভোগ করে। কিন্তু মানুষ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত রিজিক ছাড়াও তার ইচ্ছা-রুচি ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রিজিক উৎপাদন করে। এজন্য তাকে কিছুটা পরিশ্রম করতে হয়। যেমন ভূমিকর্ষণ করে কৃষিকাজের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যবস্ত ও ফল উৎপাদন, উৎপাদিত খাদ্যবস্ত রুচি অনুযায়ী বিভিন্নভাবে রন্ধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভক্ষণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এটা মানুষের বিশেষ রুচি, চাহিদা ও স্বাদ গ্রহণের তাগিদে করা হয়। এ কারণে অন্যসব প্রাণী থেকে মানুষের পানাহারের ধরন ও উপকরণ বহুলাংশে ভিন্ন।

ইসলাম স্রষ্টা-প্রদত্ত দ্বীন। ‘দ্বীন’ অর্থ সামগ্রিক জীবন-ব্যবস্থা। জন্ম থেকে মৃত্যু, শৈশব থেকে বৃদ্ধত্ব, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জীবনের আদি-অন্ত, সব ক্রিয়া-কর্ম, চিন্তা-ভাবনা-আচরণ, জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাধনা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে ইসলাম সুষম, সুন্দর ও মানুষের জন্য এক সুসঙ্গত বিধান প্রদান করেছে। স্রষ্টা-প্রদত্ত এ বিধান শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য। পানাহারের ব্যাপারে আল-কুরআনে তিনটি মূলনীতির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি হলো-
‘খাও, পান করো, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়। প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করা আল্লাহ পছন্দ করেন না।’ (সূরা ৭ : আয়াত : ৩১)।

জীবনধারণের জন্য পানাহার অপরিহার্য। কিন্তু উপরোক্ত আয়াতে মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পানাহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত পানাহার স্বাস্ত্যের জন্য ক্ষতিকর, নৈতিকতার দৃষ্টিতেও তা অন্যায় ও গর্হিত। কারণ পৃথিবীতে খাদ্য উৎপাদন, খাদ্যের জোগান ও সরবরাহ সীমাবদ্ধ বা পরিমিত। সামর্থ্যবান ও সুবিধাভোগী মানুষ প্রয়োজনাতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অবশ্যই অভুক্ত থাকবে বা প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান থেকে বঞ্চিত হবে। তা ছাড়া, ‘অতিরিক্ত’ অর্থ অপচয় করা। কোনো কিছু অপচয় করা নৈতিকতার দৃষ্টিতে অপরাধ। অপচয়কারীকে কেউ পছন্দ করে না। আল্লাহ নিজেও পছন্দ করেন না। আল-কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘অপচয়কারী শয়তানের বন্ধু।’ এরদ্বারা অপচয় করা কতটা খারাপ বা আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।

অথচ দেখা যায়, একশ্রেণীর বিত্তবান লোক যে পরিমাণ খায়, তার চেয়ে বেশি নষ্ট করে। সমাজে ধনী-দরিদ্র সবশ্রেণীর মানুষ বসবাস করে। ধনীরা যেখানে অতিরিক্ত আহার গ্রহণ অথবা খাদ্যের অপচয় করে থাকে, তাদের প্রতিবেশী অনেকে হয়তো ক্ষুধা নিবারণের উপযুক্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। তারা অভুক্ত থাকে। এটা শুধু বৈষম্য নয়, নিতান্ত অমানবিক। বেশি বেশি রান্না করা, প্রয়োজনাতিক্ত খাদ্য প্লেটে নিয়ে তা থেকে কিছুটা খেয়ে, বাকিটা ফেলে দেয়া ধনীদের জন্য একটি ফ্যাশন বা ভদ্রতা প্রদর্শনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ তাদের প্রতিবেশী অনেকে হয়তো ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছে। এজন্য আল্লাহর রাসূল সা: বলেন, ‘প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে যে ব্যক্তি পেট পুরে খায়, সে ঈমানদার নয়।’ (বুখারি শরিফ)।

পবিত্র কুরআনে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ ও খাদ্যের অপচয় না করার যে নির্দেশ রয়েছে তার সমর্থনে আরো একটি আয়াত উদ্ধৃত হলো- ‘অপচয় করো না, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না’ (সূরা ৬ : আয়াত ১৪১)।

পানাহারের ক্ষেত্রে ইসলামের দ্বিতীয় মূলনীতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু আমি তোমাদের প্রদান করেছি, তা থেকে উত্তম জিনিসগুলো তোমরা ভক্ষণ কর, তবে অনধিকার চর্চা করো না। অনধিকার চর্চাকারীদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ, আর কারো ওপর আল্লাহর ক্রোধ নিপতিত হলে, সে অবশ্যই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।’ (সূরা ২০ : আয়াত-৮১)।

পানাহারের ক্ষেত্রে ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি সম্পর্কে মহান আল্লাহর ঘোষণা- ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার করো, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুজি হিসাবে দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় করো আল্লাহর, যদি তোমরা তাঁরই বন্দেগি করো। তিনি তোমাদের ওপর হারাম করেছেন, মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং সেসব জীব-জন্তু যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা হয়। অবশ্য অনন্যোপায় হয়ে এবং নাফরমানি ও সীমালঙ্ঘন না করে যদি কেউ (প্রয়োজনের তাগিদে সামান্য পরিমাণে) ভক্ষণ করে, সেজন্য কোনো পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান, ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৭২-৭৩)।

পানাহারের ক্ষেত্রে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি প্রধান মূলনীতির মধ্যে প্রথমটি হলো- ভালো, পবিত্র ও হালাল খাবার গ্রহণ এবং দ্বিতীয়টি হলো- পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ না করা ও অপচয় করা থেকে বিরত থাকা।
লেখক : শিক্ষাবিদ

আরো পড়ুন :

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব
আনিসুর রহমান এরশাদ
মহানবী সা: সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাইল আ:-এর মাধ্যমে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান আহরণ করেছেন। হেরা গুহায় ধ্যান করেছেন মানবজাতির সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ ও পদ্ধতি নিয়ে। জ্ঞানকে সংরক্ষণের জন্য মুখস্থকরণ, অন্যকে অবহিতকরণ তথা জ্ঞানবিতরণ ও লিপিবদ্ধকরণের কৌশল অবলম্বন করেছেন। তিনি জ্ঞান অর্জনকে উৎসাহিত করতে বলেছেন, ‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর জন্য ফরজ। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, সে আল্লাহর পথে রয়েছে যে পর্যন্ত না সে প্রত্যাবর্তন করে।’ (তিরমিজি ও দারেম, মেশকাত শরিফ)

জ্ঞানের ব্যবহারগত দিকটাকে গুরুত্ব দেয়া : মহানবী সা: জ্ঞানের ব্যবহারগত দিককে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে আবুযার! ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যে নিজের জ্ঞান থেকে উপকৃত হয় না।’

জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিতকরণ : একদিন হজরত রাসূল সা: দেখলেন মসজিদে দু’টি দল বসে আছে। একটি দল ইসলামি জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত এবং অপরটি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও মুনাজাতে ব্যস্ত। আল্লাহর নবী সা: বললেন, ‘উভয় দলই আমার পছন্দের, কিন্তু জ্ঞানচর্চাকারী দলটি প্রার্থনায়রত দলটি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর আমি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে শিক্ষা দানের লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছি।’ অতঃপর মহানবী সা: জ্ঞানচর্চাকারী দলটিতে গিয়ে বসলেন।
জ্ঞানীকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন : মহানবী সা: বলেন, ‘লজ্জা দুই প্রকারের। বুদ্ধিবৃত্তিক লজ্জা এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা। বুদ্ধিবৃত্তিক লজ্জা জ্ঞান থেকে উৎসারিত এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা অজ্ঞতা মূর্খতা হতে উৎসারিত হয়।’

জ্ঞানের উত্তম প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ : হজরত মুস্তাফা সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ক্ষণিকের জন্য হেয় ও প্রতিপন্ন হতে প্রস্তুত হয় না, সে সারা জীবন অজ্ঞতার কারণে হেয় ও প্রতিপন্ন হয়।’ জ্ঞান অর্জন গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকলেও প্রশ্ন উঠতে পারে উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে। উপায় চারটি : ০১. নিজে জানা; ০২. অপরকে জানানো; ০৩. যারা চিন্তা গবেষণায় অগ্রসর কিন্তু কর্মে পিছিয়ে অথবা যারা চিন্তা গবেষণা ও কর্মে অগ্রসর তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে। যারা চিন্তা গবেষণায় পশ্চাৎপদ কিন্তু কর্মে অগ্রসর অথবা চিন্তা গবেষণা ও কর্মে পশ্চাৎপদ তাদের অবস্থার পরির্বতনে বা উন্নয়নের চেষ্টায়। নবী করিম সা: বলেছেন : ‘জ্ঞানী ব্যক্তিরা দুই প্রকারের : যে আলেম নিজের জ্ঞানের ওপর আমল করে তার জ্ঞান তার জন্য পরিত্রাণদাতা হয়। আর যে আলেম নিজের জ্ঞানকে ত্যাগ করে সে ধ্বংস হয়ে যায়’।

জ্ঞান বিতরণ সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় : মহানবী সা: বলেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষা দাও, এটি মানুষকে আল্লাহভীতি শিক্ষা দেয়, যে জ্ঞানার্জন করে, সে আল্লাহকে সম্মান করে, যে তা দান করে সে যেন শিক্ষা দেয়, এ জ্ঞান যে ধারণ করে সে সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয়। কারণ বিজ্ঞান মানুষকে ভুল ও পাপ থেকে রক্ষা করে এবং বেহেশতের পথ আলোকিত করে।’

জ্ঞানার্জনকে উত্তম ইবাদত ঘোষণা : হজরত আয়েশা রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে অহি পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি ইলম তলবের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করবে, তার জন্য আমি জান্নাতের পথ সহজ করে দেবো এবং যে ব্যক্তির দুই চক্ষু আমি নিয়েছি তাকে তার পরিবর্তে আমি জান্নাত দান করব।’ ইবাদত অধিক হওয়া অপেক্ষা ইলম অধিক হওয়া উত্তম। দ্বীনের তথা ইলম ও আমলের আসল হচ্ছে শোবা-সন্দেহের জিনিস থেকে বেঁচে থাকা।’

জ্ঞানেই পরকালীন জীবনের মুক্তি : হজরত আবু হুরাইরা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘মুমিনের মৃত্যুর পরও তার আমল ও নেক কাজগুলোর মধ্যে যার সওয়াব তার কাছে পৌঁছতে থাকবে তা হচ্ছে ইলম, নেক সন্তান এবং সদকায়ে জারিয়াহ।’ জ্ঞান ছাড়া দুনিয়া কিংবা পরকাল কোনো জীবনেই মুক্তি মিলবে না। যে জ্ঞানটা বিবৃতিমূলক জ্ঞান বা প্রকাশিত তা জানার জন্য যেভাবে জ্ঞান সাধককে চেষ্টা করতে হয় সেভাবেই বুদ্ধিবৃত্তিক গুণকে সাধারণ স্তরের ঊর্ধ্বে ওঠানো সম্ভব নয়। মনে রাখা জরুরি, তাত্ত্বিক জ্ঞান বস্তু সমন্বয়ের সক্ষমতা দেয়, কিন্তু ব্যবহারিক জ্ঞান কিভাবে চলতে হবে, বলতে হবে তার ক্ষমতা দেয়। বিচারিক ক্ষমতাকে প্রবল করতে হলে অভিজ্ঞতানির্ভর বোধকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি সচেতনতার মাত্রাকে সূক্ষ্ম বিবেচনার উপযোগী পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এটা নিঃসন্দেহে সত্য যে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও লাভ হয় জ্ঞান। কিন্তু অভিজ্ঞতা কি প্রত্যক্ষ নাকি পরোক্ষ- সেটি বুঝাও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্ঞানীরাই জান্নাতে যাবে : সহিহ-আল বুখারি শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান আহরণ করে সে প্রচুর লাভ করে, আর যে ব্যক্তি কোনো পথচলাকালে জ্ঞান লাভ করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’
জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি : শিক্ষা সম্প্রসারণে মহানবী সা: প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শিক্ষা প্রদানের জন্য সাফা পাহাড়ের পাদদেশে বিশিষ্ট সাহাবি আরকাম বিন আবুল আরকামের বাড়িকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেন। সে হিসেবে দারুল আরকামই ইসলামের প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্মশিক্ষা দেয়া হতো।
জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠাকরণ : হিজরত-উত্তরকালে মহানবী সা: মসজিদে নববীতে সাহাবিদের শিক্ষা দান করতেন; যা ইতিহাসে ‘মাদরাসাতুস সুফফা’ নামে অভিহিত ছিল। এটা ছিল জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন। জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন মানেই হচ্ছে এমন একটি সংগঠন, যেখানে বুদ্ধিমত্তা ও সফলতার সাথে সাংগঠনিক পরিসরে শিক্ষা আদান-প্রদান এবং জ্ঞান সৃষ্টি-সংগ্রহ-বিতরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। সংগঠনের স্বকীয়তা বা স্বতন্ত্রতা অক্ষুণœ রাখার স্বার্থে সংগঠনের নিজস্ব জ্ঞানকে ব্যবহার করে।

উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া : মসজিদে নববী ছাড়াও সেই সময় মদিনায় কয়েকটি স্থানে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে ইসলামের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ইতিহাস পাওয়া যায়। শিক্ষার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পাঠ্যসূচির প্রয়োজন। মহানবী সা: একটি সমন্বিত সিলেবাস নির্ধারণ করেন। তিনি ইসলামি শিক্ষার জন্য মহাগ্রন্থ আল কুরআন শিক্ষার সাথে সাথে আকাইদ ও ইবাদতের নিয়ম-কানুন, স্বাস্থ্যশিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি, জীববিদ্যা, প্রকৃতিবিদ্যা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র আকাশ-বাতাস প্রভৃতির সমন্বয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কবিষয়ক নানা ধরনের শিক্ষা দিতেন। সাহাবিরা অল্প সময়ের মধ্যে পবিত্র কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য, উত্তরাধিকারী আইন, চিকিৎসাবিদ্যা, ফিকহ, তাজবিদ, দর্শনসহ সময়োপযোগী পণ্য বিপণন প্রক্রিয়াও রপ্ত করতে পারতেন। যুদ্ধবিদ্যা ও সমরাস্ত্র তৈরিতেও তারা পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। সাহাবিদের মধ্যে কয়েকজন সাহাবি বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক পাণ্ডিত্য লাভ করেন। বিশেষ করে হজরত জায়িদ বিন সাবিত রা: ফারায়িজ শাস্ত্র বা উত্তরাধিকারী আইন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: তাফসির শাস্ত্র, হজরত হাসসান বিন সাবিত রা: সাহিত্য ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। গ্রিক, কিবতি, ফারসি, হিব্রু, ইথিওপীয় প্রভৃতি বিদেশী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও মহানবী সা: ব্যাপক গুরুত্ব দিতেন।

নারী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া : নারী শিক্ষাকে মহানবী সা: সমভাবে গুরুত্ব দিতেন। পুরুষদের মতো নারীদেরও জ্ঞানার্জন ফরজ করেছেন। হিজরতের পর তিনি সপ্তাহে এক দিন শুধু নারীদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য সময় দিতেন। নারীদের পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জবাবও দিতেন তিনি। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা:, হাফসা রা:, উম্মে সালমা রা:সহ অনেক নারী সাহাবিকে তিনি উঁচুমানের শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন।
উপসংহার : মহানবী সা:-এর প্রদর্শিত পন্থায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আলোকিত মানুষ তৈরি দেশ-জাতি-মানবতার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে অপরিহার্য। জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হবে সমাজ, তৈরি হবে আলোকিত মানুষ। এ জন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলন, জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন, জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শই অনেক বেশি কার্যকর।
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ