১৯ নভেম্বর ২০১৮

কালাপানির রাজনীতির ছমছমে পরিণতি!

কালাপানির রাজনীতির ছমছমে পরিণতি! - ছবি : সংগৃহীত

দেশের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখছি প্রায় ১০ বছর হতে চলল। এমন একটি সময় ছিল যখন প্রতি সপ্তাহে অন্তত চারটি নিবন্ধ লিখতে হতো। বহুমুখী কাজের চাপে বছরখানেক হলো লেখার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছি। এখন নয়া দিগন্ত এবং আরেকটি দৈনিকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে কলাম লিখতে গিয়ে সপ্তাহের তিনটি দিন আমাকে নিদারুণ ব্যস্ত থাকতে হয়। পাঠকদের রুচি, চাহিদা, পছন্দ-অপছন্দ এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মনোভাবকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিয়মিত কলাম লেখা যে কতটা কঠিন তা কেবল আমার মতো অধমরাই হাড়ে হাড়ে টের পান।

নয়া দিগন্ত পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয় সাধারণত প্রতি শুক্রবার। অন্য দিকে, বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয় এক দিন পর- অর্থাৎ প্রতি শনিবার। সাধারণত প্রতি সোম, মঙ্গল ও বুধবারে লেখালেখি করি এবং বুধবার বিকেলের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় বিভাগে লেখা পাঠিয়ে দিই। অন্যান্য কলাম লেখকের ক্ষেত্রে কী হয় জানি না- তবে বিগত দিনে কলাম লিখতে গিয়ে আমি সর্বদা অবারিত ও অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছি। কোনো সম্পাদক কিংবা পত্রিকার মালিকপক্ষের অনুরোধ-উপদেশ কিংবা ফরমায়েশের কলামিস্ট হওয়ার দুর্ভাগ্য আমাকে কোনো দিন তাড়িত করেনি বিধায় সর্বদা নিজের কাছে নিজেকে প্রচণ্ড দায়বদ্ধ রাখি। আমার কারণে যেন পত্রিকার সুনাম বৃদ্ধি পায়; পাঠক সংখ্যা বাড়ে এবং বিজ্ঞাপনদাতারা আকৃষ্ট হন, সে জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করে একটি সুখপাঠ্য নিবন্ধ রচনায় নিজেকে নিরন্তর শাণিত করতে থাকি।

আমাদের দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে যে কলাম বা নিবন্ধ বা উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়ে থাকে তা মূলত রাজনৈতিক বিষয় নিয়েই রচিত। একজন পাঠক হিসেবে বেশির ভাগ উপসম্পাদকীয় পড়তে পারি না, কারণ এক দিকে যেমন ওগুলোকে চর্বিত চর্বণ বলে মনে হয়, তেমনি এগুলোর মধ্যে না থাকে কোনো সাহিত্যরস কিংবা লেখকের মুনশিয়ানা। লেখকেরা কোনো রকম প্রস্তুতি, চিন্তা-ভাবনা এবং গবেষণা না করেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেবল পত্রিকার পাতা ভরার জন্য লিখে থাকেন। ফলে তাদের নিবন্ধে কোনো দিকনির্দেশনা, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, জাতীয় স্বার্থ ইত্যাদি না থাকার কারণে পত্রিকার বেশির ভাগ পাঠক সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন না। আমার ক্ষেত্রে যেন পাঠকদের বিরক্তি, তাচ্ছিল্য এবং এড়িয়ে যাওয়ার মতো অবমাননাকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য অতি সতর্কতার সাথে চিন্তা-ভাবনা ও লেখাপড়া করি, প্রতিটি বিষয় উপস্থাপনের চেষ্টা করি।

পাঠক হিসেবে আরো একটি বিষয় বেশ বিরক্তির সাথে লক্ষ করি যে, বেশির ভাগ লেখক নিজের রাজনৈতিক বোধ ও বিশ্বাস কোনো রকম রাখঢাক না করেই পাঠকদের ওপর চাপিয়ে দিতে চান। অন্যান্য শ্রেণিপেশার মতো সাংবাদিক এবং কলামিস্টদের বেশির ভাগই প্রচলিত রাজনীতি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এমন একপেশে এবং একচোখা লেখালেখি করেন, যার কারণে মানুষের বিবেকের দ্বার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে- নীতিবোধ উঠে যাচ্ছে এবং বিচার-বিবেচনা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের কলামিস্ট তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক বিশ্বাসের লোকজনের ভালো কিছু কি দেখতে পারেন না? এমনকি প্রতিপক্ষের লোকজনের ওপর ভয়াবহ অন্যায়-জুলুম ও নির্যাতন সংঘটিত হলেও তারা শুধু মুখ বুজে থাকেন। না বরং কেউ কেউ প্রকাশ্যে উল্লাস শুরু করে দেন এবং মজলুমের বিরুদ্ধে বানোয়াট কেচ্ছা কাহিনী রচনা করে এক অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালান।

বাংলাদেশের কোটি কোটি সচেতন নাগরিকের মতো আমারও একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস রয়েছে। আরো আছে রাজনৈতিক পরিচয় এবং জাতীয়ভাবে স্বীকৃত পদ-পদবি ও পরিচিতি। রাজনীতির বাইরে সামাজিক পরিবেশ, পেশাগত স্বার্থ, ধর্মবোধ, ব্যবসায়িক অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা করলে আমাকে নিতান্ত ‘হাভাতে’ প্রকৃতির লোক মনে করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থ উপার্জন করে ধনী হওয়া এবং একই সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করে পরিচিতি লাভ করার বাসনা নিয়েই সব উচ্চাভিলাষী লোকজন নিরন্তর চেষ্টাতদ্বির করে থাকেন। এই কাজে সফল হওয়ার জন্য ভালো মানুষেরা কঠোর পরিশ্রম, জ্ঞান অর্জন, সৎ জীবনযাপন এবং মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন। অন্য দিকে, একই কর্মের জন্য মন্দ লোকেরা মিথ্যাচার, অনাচার, টাউটগিরি, বাটপাড়ি, ধোঁকাবাজি, দালালিসহ নানা অপকর্মে নিজেকে ইবলিসের একধরনের দোসর বানিয়ে ফেলেন।

কলামিস্ট হিসেবে যখন পথচলা আরম্ভ করেছিলাম, তখন একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং জাতীয় সংসদে সেই দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলাম। সংসদ সদস্য হওয়ার আগে আমাকে দলীয় মনোনয়ন যুদ্ধে জয়লাভের জন্য প্রায় ১০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি সংসদীয় এলাকায় অন্তত ২৫ জন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। আবার সেই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জ্ঞান-গরিমা, দক্ষতা-অভিজ্ঞতা ও অর্থ উপার্জন করেই আমাকে মাঠে নামতে হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতি এবং সেই রাজনীতিতে সফল হওয়ার পথটি অতিক্রম করা একজন মানুষ হিসেবে আমার পক্ষে নিজ দলের কিছু নেতাকর্মীর মন্দকর্মের বিরুদ্ধে সরব হওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। একইভাবে বিরোধী দলগুলোর পক্ষে ন্যায়সঙ্গত কথা বলা যে, কতটা কঠিন, তা আমার মতো লোক তো, দূরের কথা- স্বয়ং বিরোধী দলের লোকজনের পক্ষেও সম্ভব নয়। প্রচলিত রাজনীতির প্রথা ভঙ্গ করে যা শুরু করেছিলাম তা বিগত ১০ বছর ধরে আজো চালিয়ে যাচ্ছি। সম্মানিত পাঠকদের সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি, এহেন কর্মের জন্য ঘরে-বাইরে, দলে-বিদলে, পথেঘাটে কিংবা দেশ-বিদেশে এক মুহূর্তের জন্যও বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়িনি। অধিকন্তু, যে সম্মান, মর্যাদা, সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

আমার রাজনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমায় কিংবা সাংবাদিকতা অথবা টকশোর বক্তা হিসেবে আজ অবধি একজন লোকও পেলাম না যিনি আপন স্বার্থ, বৃত্ত বা বলয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সৎ সাহস নিয়ে, নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে নির্ভয়ে সত্য কথাটি উচ্চারণ করেছেন। নিজে যেমন আওয়ামী লীগের এমপি হওয়া সত্ত্বেও বেগম জিয়া, জিয়াউর রহমান, তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল, রিজভী আহমেদ, ইলিয়াস আলী প্রমুখের পক্ষে বহুবার বহু কথা লিখেছি এবং টকশোতে বক্তব্য রেখেছি, তেমনি বিএনপির কাউকে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা, শেখ পরিবার এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের ভালো কর্ম কিংবা তাদের ওপর বিভিন্ন সময়ে জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপারে একটি শব্দও লিখতে বা বলতে শুনিনি। কাদের মোল্লার ফাঁসির এক দিন আগে তার সম্পর্কে যেভাবে লিখেছিলাম, সে দিন কয়জন জামায়াত নেতা কিংবা মরহুম কাদের মোল্লার ক’জন আত্মীয় ওভাবে লিখতে সাহসী ও উদ্যোগী হতেন তা আমি বলতে পারব না। একইভাবে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী প্রমুখ সম্পর্কেও একাধিকবার লিখেছি।

মাঝে মধ্যে এ কথাও ভেবেছি, আমি কি ভুল করেছি? অথবা আমি কি নেহাত একজন বোকা-ধরনেরও গোঁয়ার গোবিন্দ প্রকৃতির মানুষ? তা না হলে আমাদের দলের যেসব প্রভাবশালী লোকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা তো দূরের কথাÑ গোপনে ফিসফিস করে কিছু বলতেও লোকজনের পিলে চমকে যায়, সেখানে তাদের সম্পর্কে সমালোচনা করার সাহস আমার আসে কোত্থেকে? অন্য দিকে, বিরোধী দলের সবাই যখন সব কাজে নিজেদের ষোলোআনা স্বার্থ দেখতে পায় এবং যে কোনো মূল্যে ছলে বলে কৌশলে সরকারের দুর্নাম-বদনাম রটিয়ে তাদের অপদস্থ, পরাজিত ও নাস্তানাবুদ করার পাঁয়তারা চালায় সেখানে বিরোধী দলের পক্ষে কথা বলে আমি আসলে কী বুঝাতে চাচ্ছি? আমাদের দলকানা সমাজ আমার এসব কর্মকে কুলহারা কলঙ্কিনী বা কুলটা নারীর কর্মের মতো ভেবে আড়ালে-আবডালে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে কি না তা নিয়েও বহুবার ভেবেছি। কাজ করতে গিয়ে সামান্যতম বাধা না পাওয়া এবং উল্টো নানাভাবে নানা মহল থেকে সম্মান-মর্যাদা লাভ সত্ত্বেও কেন আজ অবধি একজন লোকও আমাকে অনুসরণ করল না- এমন প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পাইনি।

টকশো, সভা-সমিতি, সেমিনারের বক্তা এবং পত্রিকার কলাম লেখক হিসেবে আমি সব সময় আপন গণ্ডি থেকে বের হয়ে নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠভাবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে কথাবার্তা বলেছি এবং লেখনীর মাধ্যমে মতামত প্রকাশ করেছি। বক্তা হিসেবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ তেমন কষ্টসাধ্য নয়- যেমনটি হয়ে থাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে। একটি বিষয় শুরু করে সমান গতিতে শেষ পর্যন্ত টেনে নেয়া সত্যিকার অর্থেই কঠিন। লেখার মধ্যে একধরনের ছন্দ, টান এবং মেলোডি না থাকলে পাঠকপ্রিয়তা পাওয়া যায় না। অন্য দিকে, পরিচ্ছন্ন হাস্যরস, কৌতুক, ব্যঙ্গ, গল্প-কাহিনী, ঐতিহাসিক উপাখ্যান ইত্যাদি না থাকলে কোনো লেখাই সুখপাঠ্য ও মানসম্পন্ন হয় না।

প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে, জনমত সম্পর্কে লেখক যদি সচেতন না হন তবে পাঠকেরা তার লেখা পড়েন না। সর্বোপরি, লেখার মধ্যে বৈচিত্র্য না থাকলে তা নিতান্ত একঘেঁয়ে মনে হয় সবার কাছে। কাজেই লেখক যদি একই বিষয় নিয়ে বারবার লিখতে থাকেন তবে পাঠক শিরোনাম দেখেই বলে দিতে পারেন যে, নিবন্ধের ভেতরে কী সব বিষয়বস্তু রয়েছে। ফলে তারা বিস্তারিত না পড়ে শুধু শিরোনামে চোখ বুলিয়ে পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে অন্য খবরে চলে যান।

উল্লিখিত বিষয়গুলো মাথায় রেখে প্রথম দিন থেকেই চেষ্টা করে আসছি আমার লেখনীতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করার জন্য। কর্মজীবনের শুরুতে দেশের নামকরা কয়েকটি পত্রিকায় সাংবাদিকতার সুবাদে পত্রিকামালিক, সম্পাদক ও বিভাগীয় সম্পাদকের আশা-আকাক্সক্ষা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অন্য দিকে, বাংলাদেশের কয়েকজন প্রথিতযশা ও কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিকের কাছে হাতে-কলমে শিক্ষা লাভ এবং তাদের সান্নিধ্য লাভের অভিজ্ঞতার আলোকে পত্রিকা অফিসের টেকনিক্যাল বিষয়াদি, সম্পাদকীয় নীতি এবং বাণিজ্যিক বিষয় সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তা মন-মস্তিষ্কে ধারণ করে কলম চালানোর কারণে আজ পর্যন্ত কোনো পত্রিকা কিংবা গণমাধ্যমের সাথে সামান্যতম ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হয়নি।

পাঠকদের কথা মাথায় রেখে আমি সাধ্যমতো রাজনৈতিক বিষয়, ধর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পরিবার-সমাজ-গোত্র, শিক্ষা-দীক্ষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, নীতি-নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয় নিয়মিতভাবে এবং পালাক্রমে লিখে আসছি। এতসব বিষয়ের মধ্যে ধর্ম-কর্ম নিয়ে লিখতে গিয়ে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করি। কারণ বিষয়টি অতীব স্পর্শকাতর এবং এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করার যথেষ্ট সুযোগ থাকে। মানুষ ধর্মের কথা শুনতে যত না পছন্দ করে, তার চেয়ে বেশি পছন্দ করে ধর্ম নিয়ে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক এবং ক্ষেত্রবিশেষে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে। আমাদের ধর্মের বিভিন্ন মতবাদ, মাজহাব, তরিকা ইত্যাদি নিয়ে যেমন শত শত বছর ধরে তর্ক-বিতর্ক-দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত এবং যুদ্ধ বিগ্রহ চলছে দুনিয়াব্যাপী, তার চেয়েও বহু গুণ বেশি হয়েছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, শিখ, বাহাই, অগ্নি উপাসক ইত্যাদি ধর্মমতের অনুসারীদের মধ্যে।
ধর্ম নিয়ে নানা মতবিরোধ ও বিতর্ক আবার স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ইদানীংকালের নির্মমতম রোহিঙ্গা সমস্যা হচ্ছে- মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের উগ্র বৌদ্ধ মতবাদের বিষবাষ্প।

এখানে এ কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, রাখাইনের বৌদ্ধদের মতো কিন্তু মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলের বৌদ্ধরা উগ্র নয়। এমনকি তাদের রাজধানীতে সেই প্রাচীনকাল থেকে মুসলমান ও বৌদ্ধরা দৃষ্টান্তমূলক সম্প্রীতি বজায় রেখে চলছেন। ধর্মীয় মতবাদ নিয়ে এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের যে বিরোধ এর আগে হয়েছে, তার চেয়েও বহু গুণ বেশি বিরোধ হয়েছে নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে। আমরা এ কথা জেনে অবাক হয়ে যাই যে, ইদানীংকালে প্রতিটি ধর্মের সম্মানিত ধর্মীয় নেতা ও শাস্ত্রবিদেরা কিন্তু তাদের জীবিতকালে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে দারুণভাবে বিতর্কিত ও সমালোচিত ছিলেন। কেউ কেউ রাষ্ট্র, সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন। কাজেই ধর্ম নিয়ে কিছু লিখতে আমার যেমন বুক কাঁপে, তেমনি সাধারণ গৎবাঁধা লেখার বাইরে বিশ্লেøষণমূলক ব্যতিক্রমী লেখা ছাপতে সম্পাদকের বুকের মধ্যে কেমন ধুকধুকানি শুরু হয়ে যায়, তা-ও বিলক্ষণ টের পাই।

সম্মানিত পাঠক হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, আজ আমি কেন ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি? অর্থাৎ শিরোনামের রাজনীতির কালাপানিতে কী ধরনের ছমছমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা না বলে কেন এত সব কথা বলছি। পাঠকদের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য জানাচ্ছি, নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুদ মজুমদার সপ্তাহ কয়েক আগে হঠাৎ করে তার স্বভাবসুলভ ভদ্রতা ও বিনয়মিশ্রিত কণ্ঠস্বরে টেলিফোনের অপরপ্রান্ত থেকে জানালেন, পাঠকেরা আপনার কাছ থেকে বেশি বেশি রাজনৈতিক লেখা আশা করে এবং তারা ধর্মীয় লেখা পছন্দ করে না।

মাসুদ ভাইয়ের ফোন পাওয়ার পর আমি রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসলাম। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে সাম্প্রতিক রাজনীতির এমন কোনো ইতিবাচক ভূত-ভবিষ্যৎ দেখতে পেলাম না- যা কিনা পাঠকদের সামনে লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরা যায়। আমার মনে হলো- আমাদের পুরো রাজনৈতিক অঙ্গন যেন একধরনের হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং ছেলে ভুলানো কল্পলোকের গল্পের সাগরে ডুবে রয়েছে। আর সেই সাগরের পানি এতটাই ঘুটঘুটে কালো যে, সেখানকার বাসিন্দারা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। সাগরের সেই পানির রঙ কি রাজনীতির ময়লা-আবর্জনা দ্বারা কালো হয়েছে, নাকি রাজনীতির আলোর অভাবে কালো দেখাচ্ছে, তা নিয়ে অবশ্য এখনো চিন্তা-ভাবনা শুরু করিনি। তবে অন্য সব অন্ধকারের কালো ছায়ার মতো আমাদের হতাশার সাগরের কালাপানি আমার মনে ভীষণ ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে- প্রায়ই আমার গা ছমছম করে ওঠে মহাজাগতিক অথবা ভৌতিক কোনো কাণ্ডকারখানার আশঙ্কায়।


আরো সংবাদ