২১ নভেম্বর ২০১৮

শুক্রবার ঢাকা মাতাবেন পশ্চিমা ব্যান্ড বনি এম

শুক্রবার ঢাকা মাতাবেন পশ্চিমা ব্যান্ড বনি এম - সংগৃহীত

মঞ্চে গান আর নাচের যোগল পরিবেশনার কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই সামনে আসবে সত্তর দশকের গানের দল ‘বনি এম’ এর নাম। সারা বিশ্বের সঙ্গীত প্রেমীদের মনে সাড়া জাগানো এই ব্যান্ড শুক্রবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গাইবে। এর আগে ২০০১ সালে এই তারা বাংলাদেশ সফরে করলেও সেখানে ছিলেন না প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও দলনেতা লিজ মিচেল। কনর্সাটের আয়োজক প্রতিষ্ঠান ক্রেইন্স লিমিটেডের প্রধান কাজী ফায়সাল আহমেদ বলেন, লিজ মিচেলের উপস্থিতি আমাদের আয়োজনের সবচেয়ে বড় চমক।

ইউরো-ক্যারিবিয়ান ঘরানার এই দলটি গান পরিবেশন শুরু করবে সন্ধ্যা ৭টা থেকে। তার আগেই বিকেল ৬টায় গেট খোলা হবে শুধুমাত্র টিকেট ক্রয় করা দর্শকদের জন্য।

‘রাসপুতিন’, ‘ড্যাডি কুল’, ‘রিভারস অব ব্যাবিলন’ এর মতো মুখে মুখে ফেরা অসংখ্য গানে সত্তর দশকে বিশ্ব মাতিয়েছিল বনি এম। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ক্রেইন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী ফায়সাল আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বিশ্বখ্যাত সংগীত তারকাদের আমরা বাংলাদেশের দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করছি। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ঢাকায় এলেন বনি এম।’

দর্শক ও শ্রোতাদের জন্য তিনি আরও বলেন, ‘কনসার্টে থাকছে অনেক চমক। তবে সেটা কনসার্ট শুরুর আগে আমরা কাউকে বলছি না।’

বৃহস্পতিবার ঢাকায় পৌছে লিজ মিচেল বলেন, ‘বাংলাদেশে আসতে পেড়ে আমি খুবই গর্বিত। আমাদের ব্যান্ডের পথ চলা সত্তরের দশকে। বাংলাদেশেরও জন্ম সত্তরের দশকে এটা চিন্তা করতেই আমার অনেক ভালো লাগছে।’ ঢাকায় আসার আগে নিজের ফেইসবুক পেইজে ভক্তদের জন্য একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন ‘বনি এমে’র লিড ভোকাল লিজ মিচেল। এই ক্যারিরীয়-ব্রিটিশ গায়িকা বলেন, ‘হাই ঢাকা, আমরা আসছি ১৩ জুলাই। বিআইসিসিতে আমরা আসর মাতাবো দলবলে। আশা করছি, সবাই আসবেন। আমরা একসাথে গাইব, একসাথে অনেক মজা করব।’ ‘বেবি ডু ইউ ওয়ানা বাম্প’ সিঙ্গেলটি আরও জনপ্রিয় করে তুলতে চারজন কণ্ঠশিল্পীকে একত্র করেন জার্মানির ফ্রাঙ্ক ফারিয়ান। এরা ছিলেন লিজ মিচেল, মার্সিয়া বেরেল, মেইজি উইলিয়ামস, ববি ফেরেল।

১৯৭৬ সালে জার্মানিতে একটি টিভি অনুষ্ঠানে ‘ড্যাডি কুল’ গানের সাথে দলীয় পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে বনি এম। আর এর পর পরই এই সিঙ্গেলটির কাটতি বেড়ে যায় হু হু করে; প্রতি সপ্তাহে এক লাখ। এরপর টানা এক দশক পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ডিসকো ব্যান্ড বনি এমকে। বিশ্বও মাত হয়েছিল তাদের গানের তালে। ১৯৭৭ এ ‘মা বেকার’ অল্পের জন্য ইউকে টপ চার্ট হারালেও, ‘বেলফাস্ট’ ধরে রেখেছিল শীর্ষ-১০। পরের বছর ‘রিভারস অব ব্যাবিলন’ আর ‘ব্রাউন গার্ল ইন দ্য রিং’ নিয়ে বনি এম উঠে গেল জনপ্রিয়তার ত্তুঙ্গে।

‘রিভারস অব ব্যাবিলন’ ইউকে টপ চার্টের এক নম্বর স্থানটি ধরে রাখে ৫ সপ্তাহ। পরে তাদের গাওয়া ‘ব্রাউন গার্ল ইন দ্য রিং’ গানটি আগের গানটিকে নামিয়ে দেয় দ্বিতীয় স্থানে। টানা উনিশ সপ্তাহ ইউকে টপ চার্টের শীর্ষ দশে ছিল এই গানটি। গানটি ২০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল তখন। যুক্তরাজ্যের টপ চার্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যবসা সফল সিঙ্গেল হওয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ-৪০ এ জায়গা করে নেওয়া বনি এমের একমাত্র গানও এটিই। সফলতা সাথে সাথেই চলছিল বনি এমের; ওই বছর ‘নাইটফ্লাইট টু ভেনাস’ অ্যালবামের ইউকে টপ চার্ট জয় করার পর ‘রাসপুতিন’ উঠে এলো ইউকে টপ চার্টের শীর্ষ-১০ এ। পরের বছরও একের পর এক হিট সিঙ্গেল নিয়ে টপ চার্টে পোক্ত আসন করে নিতে থাকে বনি এম। এপ্রিলে আসে ‘ইটস এ হলি-হলিডে’। আর তারপর সেপ্টেম্বরে ‘ওশেনস অব ফ্যান্টাসি’ উঠে যায় একেবারে টপ চার্টের প্রথম স্থানটিতে। গানের সাথে সাথে বনি এমের মঞ্চ কাঁপানো পারফরম্যান্সও সাড়া জাগিয়েছিল। আর তাই ১৯৭৭ সাল থেকে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন লিজ মিচেলরা। লন্ডন, বার্লিনসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে শ্রোতাদের মাতিয়ে ২০০৬ সালে ভারতের গোয়ায় ৩৭তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের আসর মাতিয়েছিল বনি এম। বনি এম জন্মের এক দশক পর ফ্র্যাঙ্ক ফারিয়ান পেছনে ফিরে খুঁজে পান ১৮টি প্লাটিনাম এবং ১৫টি গোল্ড এলপি; দুইশর বেশি গোল্ড ও প্লাটিনাম সিঙ্গেলস; সেই সঙ্গে সারা বিশ্বে ১৫ কোটি ইউনিট বিক্রি হওয়ার তৃপ্তি।


তবে এরপর ব্যান্ডটিকে অনেক ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ফ্র্যাঙ্ক ফারিয়ানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ব্যান্ডের একমাত্র পুরুষ সদস্য ড্যান্সার ও পারফর্মার ববি ফেরেল ছেড়ে যান বনি এম। ববি পরে আবার ফেরতও আসেন এবং বনি এমের খোলনলচে পাল্টে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই ব্যান্ডের সাথেই ছিলেন। ২০১০ সালে ৬১ বছর বয়সে মারা যান ববি ফেরেল। ৮০’র দশকের শেষে ব্যান্ডের লাইন আপে নতুন মুখ আনেন ফ্র্যাঙ্ক। কিন্তু ৭০’র বনি এম দলটি ভক্তদের হৃদয়ে এমন পোক্ত আসন নিয়েছিল যে লিজের পাশে নতুনদের আগের মত আর গ্রহণ করেনি তারা। তবে পুরনো গানগুলো নিয়ে ‘বনি এম মেগা-মিক্স’ ১৯৯২ সালের শেষে আবারও ইউকে চার্টে শীর্ষ দশের মুখ দেখায় ব্যান্ডটিকে।


এদিকে ১৯৯০ সালে আদালত থেকে জানানো হয়, কিংবদন্তি এই ব্যান্ডের গোড়ার দিকের চার সদস্যদের প্রত্যেকে বনি এমের নামে নিজ নিজ শো করতে পারবেন। ৭০’র পর বনি এমের কালিম্বা দ্য লুনা (১৯৮৪) ইউরোপীয় টপ চার্টে টিকে ছিল ভালভাবেই। নতুন-পুরনো গান নিয়ে ২০১১ সালে বাজারে আসে ‘দ্য ক্রিসমাস মিক্স’। ব্যান্ডের ৪০ বছর পূর্তিতে ২০১৫ সালে পুরনো গানগুলোর সিডি, এলপি ও ডিভিডি নিয়ে ‘ডায়মন্ড’ রিলিজ করে বনি এম। চলতি বছর জুনে শ্রীলংকায় কনসার্টে যোগ দিতে যান লিজ মিচেল।


শ্রীলংকার ডেইলিমিররের সাথে সাক্ষাৎকারে ‘ড্যাডি কুল’ অথবা ‘রাসপুতিন’ এর মত জনপ্রিয় গানগুলো তারও পছন্দের তালিকায় আছে কি না জানতে চাইলে ৬৫ বছরের বলিষ্ঠ কণ্ঠের গায়িকা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বলেন, ‘সত্যি বলছি, আমার কোনও বিশেষ পছন্দ নেই। আমি মনে করি, প্রত্যেক গানের একটি নিজস্ব বক্তব্য রয়েছে, রয়েছে এর নিজস্ব প্রেম। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক গানকেই তার মতো করে উপস্থাপন করাটাই আমার কাছে গুরুত্ব রাখে।’ ‘বনি এম ফিচারিং লিজ মিচেল অরিজিনাল লিড সিঙ্গার লাইভ ইন ঢাকা’ কনসার্টের আয়োজক ফায়সাল আহমেদ জানান, ক্রেইন্স লিমিটেড টিকেটের মূল্য ঘোষণা করেছিল চলতি মাসের শুরুর দিকেই। নিজেদের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে টিকেট প্রি বুকিং নেওয়া শুরু হয়েছে।
পিমিয়াম টিকেট ১২ হাজার টাকা, গোল্ড ৪ হাজার ৮০০ টাকা, সিলভার ৩ হাজার ৫০০ টাকা, গ্যালারি টিকেটের মূল্য ২০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমিত সংখ্যক প্রিমিয়ার টিকেটে থাকছে কনসার্টের শিল্পীদের সাথে দেখা করার সুযোগ। তিনি জানান, ঢাকায় বিএফসির নির্দিষ্ট কিছু আউটলেট, ওয়েস্টিন হোটেলের লবি বুথ, কফি বিন অ্যান্ড টি লিফ ছাড়াও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাগডুম এবং যেতে চাও- এর ওয়েবসাইটে টিকেট মিলবে অনুষ্ঠান শুরুর আগে পর্যন্ত।

ক্রেইন্স লিমিটেড এর আগে ২০০১ সালে ব্রায়ান অ্যাডামস, ২০১২ সালে আশা ভোঁসলে এবং এমএলটিআর, ২০১৩ সালে জুলিয়ান মার্লে, ২০১৫ সালে গানস অ্যান্ড রোজেস এর গিলবি ক্লার্ক, ২০১৭ সালে রিচার্ড মার্ক্সের কনসার্টেও আয়োজন করেছে।


প্রসঙ্গত, এ পর্যন্ত আটটি স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেছে ‘বনি এম’। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাদের প্রথম অ্যালবামের নাম ‘টেক দ্য হিট অব মি’। ১৯৮৫ সালে সর্বশেষ অ্যালবাম প্রকাশ পায় তাদের। নাম ‘আই ডান্স’।

 


আরো সংবাদ