২০ অক্টোবর ২০১৮

মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগে

মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগে - ছবি: সংগৃহীত

আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। প্রতি আসনে এমপি প্রার্থী রয়েছেন তিন থেকে সাত জন। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে যেমন তুমুল প্রতিযোগিতা রয়েছে, তেমনি দীর্ঘ দিনের জিইয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। প্রত্যেক প্রার্থী নিজস্ব বলয় তৈরি করে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে গিয়ে কখনো কখনো মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সমর্থকেরা মারামারি, হানাহানি ও সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। বড় আকারে সংঘর্ষে জড়িয়ে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালী-৬ হাতিয়ায় চলছে চরম অরাজকতা। সেখানে গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতাসহ অন্তত আওয়ামী লীগের ১১ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। গত ১৬ এপ্রিল নোয়াখালী-৬ আসনের হাতিয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হয়েছে পঞ্চম শ্রেণীর মাদরাসা ছাত্র নীরব। নিহত নীরবের বাবা মিরাজ উদ্দিন ও চাচা আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম নান্টুও গুলিবিদ্ধ হন। আহত রাশেদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় এমপি সমর্থিত সন্ত্রাসীরা পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।

চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ওই সন্ত্রাসীরা তার বাড়িতে ঢুকে গোলাগুলি করে। এর আগেও আয়েশা ফেরদৌস এমপি ও তার স্বামী মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের হামলা-নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের। গত বছরের মার্চে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য উপজেলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন আহম্মেদকে রাতে আফাজিয়া বাজারে প্রতিপক্ষ গুলি করে হত্যা করে। এরপর এপ্রিলে আওয়ামী লীগ কর্মী নুর আলমকে প্রতিপক্ষ কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে হাতিয়ার মিরাজ বাহিনীর প্রধান মিরাজসহ তার বাহিনীর ছয় সদস্যকে ছয়টি দেশীয় অস্ত্র, পাঁচটা রামদা এবং ১০ পিস কার্তুজসহ গ্রেফতার করে কোস্টগার্ড।

এরা এমপির কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সরকারের আমলে হাতিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওয়ালী উল্যাহ, সাধারণ সম্পাদক ও চরকিং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মহিউদ্দিন আহাম্মদ, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদ, ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলাম রাজুসহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ২০-২৫টি করে মামলা দেয়া হয়েছে। হাতিয়া পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি ছাইফ উদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, হাতিয়ায় মোহাম্মদ আলীর শাসন খুলনার খুনি এরশাদ শিকদারকেও হার মানায়। তার অর্ডার ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। তার অন্যায়ের বিরোধিতা করলেই হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। দল মনোনীত ছয়জন ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হত্যাসহ ৮-১০টি করে মামলা দায়ের করেছেন তিনি। এ উপজেলায় কমপে দুই শ’ দলীয় নেতাকর্মী হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। তিনি জানান, আয়েশা ফেরদৌস এমপি হলেও মূলত মোহাম্মদ আলীই এ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন। 

নেত্রকোনা-৫ আসনের এমপি ওয়ারেসাত হোসেন বেলালের বিরুদ্ধে রয়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের নানা ক্ষোভ ও অভিযোগ। তাদের মতে, এমপির বিরুদ্ধে কথা বলে ঘরছাড়া হয়েছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেশ কিছু নেতাকর্মী ২৫ থেকে ৩০টি মামলার আসামি হয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের সাথে মনোনয়ন দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। গত ১৫ আগস্ট নেত্রকোনার পূর্বধলায় পাশাপাশি সমাবেশ ডাকে এমপি ওয়ারেসাত ও আহমদ হোসেনের সমর্থকরা।

দীর্ঘ দিন থেকে স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে এ দুই নেতার দ্বন্দ্ব থাকায় সেদিন ব্যাপক সংঘর্ষ হয় এবং মঞ্চসহ বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান লন্ডন যুবলীগের সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার তুহিন আহমেদ খান। তিনিও এমপির সমর্থকদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার তুহিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ উন্নয়নের রাজনীতি করে। কিন্তু এমপির মতো এমন কিছু লোক আছে যাদের অপরাজনীতির কারণে সাধারণ মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের ভাবমর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। দলের ক্ষতি হচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ার তুহিন বলেন, এলাকার মানুষ একটু শান্তি চায়। আগামী নির্বাচনে আমি আশা করব, যারা এলাকার মানুষের সাথে মিশে, এলাকার মানুষ নিয়ে কাজ করে, দলের ভাবমর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকে জননেত্রী শেখ হাসিনা এই আসনে তাদের মধ্যে থেকে মূল্যায়ন করবেন। 

ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন বর্তমান এমপি ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ওবায়দুল্লাহ আনোয়ার বুলবুল। দুজনই আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন। এ আসনের সাবেক এমপি ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের একটি গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে। তিনটি গ্রুপই পরস্পরবিরোধী রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন এমপির বিরোধ কারোরই অজানা নয়। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্রভাবে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরই বিরোধ আরো প্রকাশ্যে রূপ নেয়। তাদের পরস্পরবিরোধী প্রকাশ্য শোডাউন ও বক্তব্যে পুরো জেলার রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। 

নড়াইল-১ আসনেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তির বিরুদ্ধে রয়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিস্তর অভিযোগ। ওই আসনে বর্তমান এমপি কবিরুল হক ও নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিলু খানের মধ্যে মনোনয়ন দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। গত মাসে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে এমপির সমর্থকেরা নিলু খানের এক সমর্থককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার অভিযোগ আছে। ওই আসনে বর্তমানে এমপি বনাম স্থানীয় আওয়ামী লীগ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। ওই উপজেলায় প্রত্যেকটি দলীয় কর্মসূচি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পালন করেন নেতাকর্মীরা।

এ প্রসঙ্গে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য মো: অহিদুজ্জামান অহিদ বলেন, এমপি হওয়ার পরই মুক্তি বিশ্বাস আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে গেলেই তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা করে। মামলা দিয়ে হয়রানি করে। তিনি বলেন, স্কুলের পিয়ন নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করছেন। টিআর কাবিখাসহ উন্নয়নকাজের নামে দুর্নীতি করছেন। এসব কারণে প্রকৃত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন এমপির ওপরে ুব্ধ হয়ে পড়েছে। তৃণমূলের কেউই আগামী নির্বাচনে তার মনোনয়ন চায় না। গত ৯ জুলাই যশোরের মনিরামপুরে ছাত্রলীগ নেতারা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে যশোর-২ আসনের এমপি মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ আনেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনোরঞ্জন শীলকে বয়কটের ঘোষণা দেন বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতারা। 

যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ও সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশীদ মুন্না এবং ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমপি পুত্র মশিউর রহমান সজলের মধ্যে মনোনয়ন দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। স্থানীয়রা জানান, এরা কেউই কারো ছায়া মাড়ান না। ১৫ আগস্টের মতো বড় কর্মসূচিও পৃথকভাবে পালন করেছেন। দলীয় কর্মসূচিতে কোনো সমন্বয় নেই। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন জোটের শরিক দলের এমপি প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে জাসদের এমপি প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মো: শহীদুল ইসলাম মহাজোটের এমপি প্রার্থী হিসেবে ওই আসনে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

এ ছাড়াও সারা দেশে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, পিরোজপুর, নাটোরসহ বিভিন্ন আসনে বেশ কিছু এমপির বিরুদ্ধে এরকম হাজারো অভিযোগ রয়েছে তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের। নিজেদের বলয় ভারী করতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের লোকজন আওয়ামী লীগে ভেড়াচ্ছেন। অনেক এমপির হাত ধরে অনুপ্রবেশ ঘটছে বলে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে এসব তথ্য উঠেও এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দলের মধ্যকার বিরোধী রাজনীতি তুলে ধরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশেষ বর্ধিত সভায় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, তৃণমূলে দলের নেতারা একমঞ্চে ওঠেন না, কেউ কারো চেহারাও দেখতে চান না। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়া হয়। আওয়ামী লীগকে হারানোর জন্য আওয়ামী লীগই যথেষ্ট।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। তৃণমূলে যার জনপ্রিয়তা আছে, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে। তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। যারা বড় নেতা হয়েও জনবিচ্ছিন্ন তারা মনোনয়ন পাবেন না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সতর্ক করে তিনি আরো বলেন, সংসদীয় আসন ঘিরে দলীয় সভাপতির হাতেও ছয় মাস অন্তর এসিআর আসছে। শিগগিরই আরো একটি জরিপ রিপোর্ট আসবে। প্রার্থী বাছাইয়ে এগুলো গুরুত্ব পাবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের বড় দলগুলোর মধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। তবে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ সমস্যা আর থাকবে না। তখন সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে জেতানোর জন্য কাজ করবে। তিনি বলেন, দুয়েক জায়গায় ব্যতিক্রম হয় না, তা বলব না। তবে সেরকম কিছু হলে কেন্দ্র থেকে হস্তক্ষেপ করে সমাধান করা হবে। আগামী নির্বাচনে দলের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।


আরো সংবাদ