২০ অক্টোবর ২০১৮

মাঠ নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন চায় আ’লীগ

মাঠ নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন চায় আ’লীগ - ছবি : সংগৃহীত

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কয়েকটি ধাপে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এর অংশ হিসেবে শুরুতেই রাজনীতির মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় সরকার। বিশেষ করে নির্বাচনী তফসিলের আগে বা পরে সরকারবিরোধী বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে উঠতে দিতে চান না সরকারি দলের নীতিনির্ধারকেরা। এ সময় সরকারের সমমনা ছোটখাটো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনী আবহ তৈরির চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে এলে শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন কী রকম হবে আর না এলে কী রকম হবে তারও ছক কষে রাখা হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে তা সামাল দিতে বিদেশী বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সাথেও সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটের সরকারবিরোধী বড় ধরনের আন্দোলন হলে এবং দেশী-বিদেশী চাপে প্রয়োজনে নতুন কোনো পথ খোলা রাখার জন্য সংসদের আরো একটি অধিবেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। 

সূত্রগুলো জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে সরকার এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। একই সাথে সংসদ বহাল রেখেই এ নির্বাচনের পক্ষে তারা। এ ক্ষেত্রে বিএনপি জোটের সম্ভাব্য আন্দোলনকে মোকাবেলায় নির্বাচনী তফসিলের আগেই সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা হতে পারে। এতে তফসিলের পর বড় আন্দোলন তৈরিতে বিএনপি জোট ব্যর্থ হবে বলে সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিএনপিকে সভা-সমাবেশের সীমিত সুযোগ দেয়া হলেও সেসব কর্মসূচি সামনে রেখেও ধরপাকড় অব্যাহত থাকবে। এ নীতির অংশ হিসেবে গত শনিবার অনুষ্ঠিত বিএনপির মানববন্ধন থেকে অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে সমাবেশকে সামনে রেখে সারা দেশেই ধরপাকড় করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আন্দোলন দমনে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রাখা হতে পারে।

এ দিকে সরকারবিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের দমনের পাশাপাশি নির্বাচনী আবহ তৈরিতে সচেষ্ট থাকবে সরকার। সে ক্ষেত্রে সরকারের সমমনা ছোটখাটো রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোকে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় রাখবে আওয়ামী লীগ। সরকারের সহযোগিতায় গড়ে তোলা হবে এমন জোট। সরকারের সমমনা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মিছবাহুর রহমান চৌধুরী ও তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপিকে নিয়ে ১৫টি ছোটখাটো দলের সমন্বয়ে সর্বশেষ শনিবার এমন একটি জোট গঠিত হয়। এ জোট গঠনে আওয়ামী লীগ ও সরকারের দু’জন প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকের পরোক্ষ সিগন্যাল ছিল বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সমালোচনার সাথে সাথে যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্য প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে সরকারি দল। 

সূত্রগুলো জানায়, আগামী নির্বাচনে বিএনপি আসবে বলেই আপাতত প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে সরকার। সেই লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের আভাস দিয়ে দলের বর্তমান এমপিদের সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিতর্কিত এমপিদের মনোনয়ন দেয়া হবে না বলে তিনি এরই মধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টিসহ জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন কেমন হবে তাও প্রায় চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। আর বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করলে জোটের বড় শরিক দলগুলোকে পৃথকভাবে মাঠে নামানো হবে। এ ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের চেয়ে বেশিসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া সরকারবিরোধী জোটের কোনো দলকেও কাছে টেনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেষ্টা করা হবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিষয়টি মেনে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধ্য করতে প্রয়োজনে বিদেশী বন্ধুদেরও কাজে লাগানো হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি এবারো নির্বাচন বর্জন করলে সেটি নিয়ে যাতে আন্তর্জাতিক মহলে কোনো বিতর্ক না হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদারে তৎপর রয়েছে সরকার। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেসব প্রভাবশালী দেশের শীতল সম্পর্ক রয়েছে সেসব বন্ধুরাষ্ট্রকে কাজে লাগাতে চান নীতিনির্ধারকেরা। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশ ভারত, রাশিয়া ও চীনকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। 

কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দুর্বল করতে চান। তার মাধ্যমে চীনের সমর্থন আদায়ের পক্ষে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ ছাড়া রাশিয়ার সাথে ভারতেরও খুব ভালো সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ৫ জানুয়ারির ‘বিতর্কিত ও একতরফা’ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল বিরোধিতা থাকলেও প্রতিবেশী ভারত ও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ তৎপরতায় সেটি আর বেশি দূর এগোয়নি। সে জন্য এবারো এসব দেশের জোরালো সমর্থন চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন কূটনৈতিক উইংকে কাজে লাগানো হচ্ছে।

এ দিকে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনী তফসিলের আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী জোটের তৎপরতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জনগণকে বড় ধরনের কোনো আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে পারলে সরকারও তার নীতি পরিবর্তন করতে পারে। সে জন্য বর্তমান অধিবেশনকে শেষ অধিবেশন বলা হলেও আপাতত দশম জাতীয় সংসদের আরেকটি অধিবেশনের পথ খোলা রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সব কিছু নির্ভর করবে বিএনপি জোটের কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানামুখী চাপের ওপর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপাল থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমরা চাই বিএনপি আন্দোলন করুক। কারণ আন্দোলন ছাড়া কোনো দাবি আদায় করা যায় না।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রতিটি দলেরই নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল থাকে। আর আমাদের কৌশল হচ্ছে দেশের উন্নয়ন করে জনগণের সমর্থন অব্যাহত রাখা। গত ১০ বছরে দেশের ঈর্ষণীয় উন্নয়ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধারা অব্যাহত রাখতে জনগণ আবারো আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এরই মধ্যে দেশী-বিদেশী নানা জরিপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের জনপ্রিয়তার কথা উঠে এসেছে। আর সংবিধান না মেনে নির্বাচন চাওয়া এবং অবৈধভাবে ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপির কৌশল। আর সেই কৌশলের কারণে তারা নির্বাচন বর্জন করলেও আমাদের কিছু করার নেই।


আরো সংবাদ