১৫ নভেম্বর ২০১৮

‘বিষাদ সিন্ধু’র ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ

ভারতীয় লেখক আলো সোম বিষাদ সিন্ধু ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। - ছবি: সংগৃহীত

সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের কালজয়ী উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। ‘ওশান অব মেলানকলি’ নামে ভারত থেকে বইটির অনুবাদ করেছেন আলো সোম। আর এটি প্রকাশ করেছে নিয়োগী বুকস। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’র।

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ও প্রাচীনতম উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘বিষাদ সিন্ধু’ অন্যতম। হিজরি ৬১ সালে (৬৮০ খ্রিস্টাব্দে, ১০ অক্টোবর) ১০ মহররম সংঘটিত ইরাকের কারবালার যুদ্ধ ও এর পূর্বাপর ঘটনাবলী এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয়। ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর দৌহিত্র হাসান ও হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু, হোসেনের স্ত্রী জয়নাবের প্রতি ইয়াজিদের আকর্ষণ এসব ঘটনাকে উপজীব্য করে উপন্যাসটি রচনা করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এটি বহুল পঠিত একটি উপন্যাস। বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসটি যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিন ভাগে প্রকাশিত হয়; পরবর্তী সময়ে সেগুলো একখণ্ডে মুদ্রিত হয় ১৮৯১সালে।

বিষাদ সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৭ সালে। তিনি ১৯ শতকের বিখ্যাত বাঙালি লেখক। তিনি প্রায় ২৫টি বই লিখেছেন। তবে ‘বিষাদ সিন্ধু’ তার কালজয়ী গ্রন্থ।

আরো পড়ুন: নজরুল বিরল এক অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের নাম : অধ্যাপক রফিকুল

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, ৩০ আগস্ট ২০১৮

জাতীয় অধ্যাপক এবং নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম বিরল এক অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের নাম। এ সম তিনি নজরুলের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দাবি জানান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী উদ্যাপনের অংশ হিসেবে কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন বাংলা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন। ’নজরুলকাব্যে মিথিক-ঐতিহ্যিক প্রতিমা : ফিরে দেখা’ শীর্ষক একক বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী। 

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সাহিত্যসৃষ্টির পরিসর পর্যন্ত নজরুল বিরল এক অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের নাম। আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁর মতো অনন্য প্রতিভাকে এখনও আমরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। এখন সময় এসেছে সব ধরনের সংকীর্ণতামুক্ত হয়ে নজরুলকে তাঁর যথার্থ বৈশ্বিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা।

স্বাগত ভাষণে মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, নজরুল ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভা। যে অসাম্প্রদায়িক-শোষণমুক্ত সমাজ-রাষ্ট্র ও বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছেন আমাদেরও সে পথে এগোতে হবে। তবেই এদেশে নজরুল চেতনার যথাযথ বাস্তবায়ন ঘটবে।
একক বক্তা অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বার্থক উত্তরাধিকারী। তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম কবিতায় তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা ফুটিয়ে তোলার বাহন হিসেবে বিপুলভাবে মিথ ও ঐতিহ্যের অনায়াস ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ দ্বিধাহীন। তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানসের প্রকৃত সন্ধান পেতে হলে সমগ্র নজরুল রচনার পাঠ অত্যন্ত জরুরি। কারণ তাঁর কাব্যে ও অন্যান্য রচনায় মিথের ব্যবহার কোনো খ-িত সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেনা বরং সামগ্রিকভাবে বিশ্ব মানবমঙ্গলের আহ্বান ধ্বনিত করে।

সাংস্কৃতিক পর্বে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মো. রফিকুল ইসলাম। নজরুলগীতি পরিবেশন করেন শিল্পী ডালিয়া নওশীন এবং মাকসুদুর রহমান মোহিত খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা মাহবুবা রহমান।

আরো পড়ুন:  স্মৃতির রেখাচিত্রে নজরুল
হোসেন মাহমুদ, ৩১ আগস্ট ২০১৮


কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্য দিয়ে সে বিস্ময়ের অবাধ ‘বিস্ফোরণ ঘটেছিল। কবিতায় আগুন ঝরিয়ে ইংরেজ শাসনের ভিতটাকে জোরেশোরে নাড়া দিয়েছিলেন তিনি। পুরস্কার হিসেবে জুটেছিল কারাদণ্ড আর বই বাজেয়াপ্ত। কিন্তু রক্তে যার বিদ্রোহের স্রোত, প্রাণে যার অপরিসীম জীবনজোয়ার, তার কাছে জেল-জুলুম কোনো বিষয়ই হতে পারেনি। ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’Ñ এই হৃদয়প্লাবী হাঁক দিয়ে তিনি এসব তুচ্ছ কালিমাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ফের বিপ্লবের জয়গান গেয়েছেন। 

তবে নজরুল সারাজীবন বিদ্রোহের পতাকা অবনমিত না করলেও তার প্রাখর্য স্তিমিত হয়ে আসে প্রাক-মধ্যজীবনে। ১৯৩০-এর দিকে তিনি কবিতা ছেড়ে গানের ভুবনে প্রবেশ করেন। কবিতা, গল্প-প্রবন্ধ ছেড়ে পুরোপুরি গীতিকার-সুরকার হয়ে ওঠেন তিনি। তবে সেও বেশি দিনের জন্য নয়।

১৯৪২-এর জুলাই থেকে মৌনতার জগতে সমর্পিত হন। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার একদা বর্ণাঢ্য জীবনের যবনিকাপাত ঘটে। 
এ জীবনকালে নজরুল যেমন তাঁর গুণমুগ্ধ বহু মানুষের সংস্পর্শে আসেন, তেমনি অনেক গুণী মানুষও এ অসাধারণ মানুষটির সংস্পর্শে আসেন। নজরুলকে তারা নানাভাবে দেখেছেন। তাঁর সাথে অনেকের অনেক স্মৃতিও রয়েছে। নজরুলের মৃত্যুর পর তাঁদের কেউ কেউ নজরুলকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বা নাতিদীর্ঘ স্মৃতিকথা লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে অনেকের স্মৃতিকথাই মূল্যবান। 

নজরুল সম্পর্কে বহু জনের স্মৃতিচারণ নিয়ে ১৯৬০ সালে বিশ^নাথ দে’র সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ‘নজরুল স্মৃতি’। এ গ্রন্থের ভূমিকায় সম্পাদক জানিয়েছেন, ‘নজরুলের নিকট সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা কোনোদিনই ভুলবেন না তাঁর জ্যোতির্ময় মূর্তি, ভাস্বর ভানুত্ব। কবির সেই হিমালয় নির্ঝর গুরুগুরু কণ্ঠস্বর আজো তাঁদের কানে বাজে। মনে পড়ে ঘরোয়া মানুষ দরদী কবি নিত্যদিনের কতো ঘটনার স্মৃতি চিত্র।’ সম্পাদক বলেছেন, ‘.... কবি নজরুল সম্পর্কে পশ্চিম ও পূর্ব-বাংলার একশত একজন কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সমাজ সংস্কারক-বিপ্লবী নেতার লেখা নিয়ে ‘নজরুল স্মৃতি’ প্রকাশিত হলো।’ 
এ সব লেখার মধ্য থেকে কয়েকজনের স্মৃতিকথার চয়িত অংশ দিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বৈচিত্র্যময় জীবনের এ রেখাচিত্রটি গ্রন্থিত হলো।

ইন্দ্রজিৎ রায় তাঁর স্মৃতিকথা ‘কিশো৬র-আচার্য নজরুল’-এ তাঁর জীবনের একটি স্বল্পজ্ঞাত তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন ধর্মভীরু, দানশীল, সরলচিত্ত আর আপনভোলা মানুষ। তিনি স্থানীয় মসজিদে ইমামতি আর পীর হাজী পাহলোয়ানের দরগাহে খাদেমগিরি করে প্রাপ্ত যৎসামান্য অর্থে সংসার চালাতেন। বাংলা ও উর্দু ভাষায় তাঁর রীতিমতো দখল ছিল। হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো সুন্দর, ঝরঝরে। নজরুল উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার এই গুণগুলো নিজের মধ্যে কমবেশি পেয়েছিলেন। ইন্দ্রজিৎ রায় লিখেছেন, ‘নজরুলের লেখাপড়ার প্রথম ধাপ শুরু হয় তাঁর বাবার কাছে। বাবাই ছিলেন তাঁর সর্বপ্রথম শিক্ষাগুরু। তারপর অক্ষর পরিচয় শেষ হলে তাকে ভর্তি করে দেয়া হলো পাঠশালায়। ...খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন নজরুল ইসলাম। মক্তবের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার আগেই তিনি বেশ সাবলীলভাবে আর নির্ভুল উচ্চারণে ‘কোরান শরীফ’ পাঠ করতে পারতেন। তাঁর আরবী, উর্দু বিশেষ করে আরবী উচ্চারণ আর সঠিক কোরান পাঠ শুনে একবার এক জবরদস্ত মৌলানা বালক নজরুলের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।’ 
ব্রিটিশ আমলে পুলিশে চাকরি পেয়েছিলেন পঞ্চানন ঘোষাল। তাঁর স্মৃতিচারণ ‘নজরুল-স্মৃতি’-তে নজরুল জীবনের বেদনাঘন একটি দিক উঠে এসেছে। তিনি পুলিশে নিয়োগ পেয়ে জোড়াসাঁকো থানায় ছিলেন। সে সময় নজরুল ওই থানা এলাকায় বাস করতেন। একদিন উপরের নির্দেশে গোয়েন্দা পুলিশের সাথে ভোর ৪টায় তাকে নজরুলের বাড়িতে যেতে হয় খানা-তল্লাশির জন্য। নজরুল তাদের কোনো বাধা না দিয়ে তাদের সহযোগিতা করছিলেন। সব তল্লাশির পর একটি বাক্স খুলতে যেতেই নজরুল ছুটে এসে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের বললেন, না, না, ওটাতে হাত দেবেন না। এরপর পঞ্চানন ঘোষালের ভাষায়, ‘তাঁকে এইভাবে হঠাৎ বিচলিত হতে দেখে পুলিশের সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। ওই বাক্স খুলে উপুড় করা মাত্র কাজী সাহেবের চোখ হতে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল। আমরা এ যাবৎ কাল তাঁর চোখ হতে শুধু আগুন ঝরতে দেখেছি। ও রকম শক্ত একজন মানুষের চোখে জল দেখে সকলেই অবাক হলাম। ওই বাক্সে কিছু শিশুর খেলনা ও শিশুর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ছিল। এগুলো কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম পুত্র স্বর্গত বুলবুলের ব্যবহার্য সামগ্রী।’

লেখক-গবেষক আজহারউদ্দিন খান ১৯৪৯ সালে ৮ সেপ্টেম্বর নজরুলকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি ‘জীবন-সায়াহ্নে কবি নজরুল’ শীর্ষক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘... হঠাৎ দেয়ালে টাঙানো কবির ছবি দেখলুম। কি অপরূপ সুন্দর ছবিখানা। ছবিটা দেখে মনটা একটু গুমরিয়ে উঠলো সেই উজ্জ্বল প্রোজ্জ্বল মহান মুখশ্রী, সেই তীক্ন আরক্ত অপাঙ্গ চোখ, সেই উদার গম্ভীর স্বচ্ছ ললাট! আর কি দেখবো? ...কবি নজরুল বেরিয়ে এলেন। চমকে উঠলুম, এ নজরুলকে দেখে চোখ কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না যে ইনিই বিদ্রোহী কবি নজরুল! পরনে একটি লুঙ্গি ও ধূসর বর্ণের হাফশার্ট। মুখে একটা উত্তেজনার ভাব ফুটে বেরুচ্ছে, তাঁর সেই বিদ্রোহী প্রাণশক্তির ছাপ অস্তরাগের বিলীয়মান আভার মতো মুখে খেলা করছে। ....আবার কবির টাঙানো ছবির প্রতি দৃষ্টি পড়ে গেল, শিউরিয়ে উঠলাম, যেন চিনতে পারছিনে। এ কবি আর ছবির কবি যেন এক নয়- ভিন্ন। যে কবি বলেছিলেন, ‘ আমি বিশ্বাস ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির’ তাঁর উন্নত শিরের ও ইন্দ্রিয়ের দরজাগুলো একে একে রুদ্ধ হয়ে আসছে। মুখ তাঁর শীর্ণ, আগুনের মতো গায়ের রং ফিকে হয়ে গেছে, কেশরের মতো যে কেশগুচ্ছ তাঁর ঘাড় বেয়ে নামতো তা উঠে গেছে, সে সৌম্য মূর্তি আর নেই। তাঁর কবিতার বই রইলো, রইলো তাঁর বিচিত্র বহু কর্মান্বিত জীবনের উজ্জ্বল অবিনশ্বর ইতিহাস কিন্তু সমস্ত কীর্তির অন্তরালে ছিলেন যে কবি নজরুল, তিনি আর নেই তাঁর স্থানে আছে রোগে জীর্ণ নজরুল।’

প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘মনে পড়ে তার দিলদরিয়া প্রাণের কথা। এমন প্রাণ নিয়ে খুব কম মানুষই জন্মায়। মজলিসি সভাসদ, হাসিগল্পের নায়ক, ভাবালু গায়ক, বলিষ্ঠ আবৃত্তিকার, বিশিষ্ট সুরকার, গুণীর গুণগ্রাহী, উদার সরল মানুষ যে রেখে ঢেকে কথা কইতে জানত না যখনই আমাদের সভায় আসরে আসত ছুটে, হেঁটে নয় অট্টহাস্যে ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে, এসেই জড়িয়ে ধরত দিলীপ দা বলে এমন মানুষ কটাই বা জীবনে দেখেছি? 
প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহ্ম্মদ কাজী নজরুল চরিত্রের এক অতুলনীয় বিশালতার দিক তুলে ধরেছেন তাঁর ‘কাজীদার কথা’য়। তিনি বলেছেন, ‘ বাংলা গানে গজল সুরের প্রথম আমদানি করেন নজরুল ইসলাম, যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে। ... গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল রুমে তাঁর গানের বড়ো বড়ো খাতাগুলো পড়ে থাকতো। সেই খাতা থেকে কোনো কোনো নতুন কবি গান লিখে নিয়ে কাজীদার লাইন শুদ্ধ প্রায় হুবহু নকল করে নিজের লেখা বলে গ্রামোফোনে চালাবার চেষ্টা করতে লাগলো। কাজীদাকে বললাম সে-কথা। তিনি হেসে বললেন, ‘দূর পাগল, মহাসমুদ্র থেকে ক’ঘটি পানি নিলে কি সাগর শুকিয়ে যাবে? আর নবাগতের দল এক-আধটু না নিলে হালে পানিই বা পাবে কী করে?’ নজরুল সম্পর্কে আরেকটি কথা বলেছেন আব্বাসউদ্দীন ‘বিশ বৎসর প্রায় কাজীদার সাহচর্যে ছিলাম; এর মধ্যে একদিনও তাঁর মুখে পরনিন্দা শুনিনি।’ 

প্রথিতযশা গায়ক-সুরকার শচীন দেব বর্মণ (এস ডি বর্মণ) তাঁর ছোট্ট লেখা ‘কাজীদা’-তে বলেছেন, ‘ কাজীদা, শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত কাজী নজরুল ইসলাম যে কতোবড়ো গুণী, জ্ঞানী, কতোবড়ো স্রষ্টা, কবি ও শিল্পী, তাঁর ব্যক্তিত্ব যে কতো মহান, তাঁর বৈশিষ্ট্য যে কতোখানি এবং তাঁর স্থান যে কত উঁচুতে তা দেশে-বিদেশে কারো অজানা নেই। ... তাঁর গান গেয়ে যে আনন্দ ও তৃপ্তি পেয়েছি তা আমার মনে সর্বদাই গেঁথে আছে ও থাকবে। তাঁর গান গেয়ে আমি ধন্য হয়েছি।’

কবি-লেখক-সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু ‘স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক লেখায় নজরুল সম্পর্কে বলেছেন, ‘ বিদ্রোহী’ পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিক পত্রে, মনে হলো এমন কখনো পড়িনি। অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করছিল, এ যেন তাই; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এই যেন বাণী। ... নতুনের কেতন সত্যিই উড়লো। নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হলেন। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে এতখানি বিখ্যাত অন্য কোনো কবি হননি।’

নজরুল একবার ঢাকায় আসেন। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘বিশ^দ্যিালয়ের সিংহদ্বারে এক মুসলমান অধ্যাপকের (খুব সম্ভবত ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আশ্চর্য যে বুদ্ধদেব বসু তার নাম উল্লেখ করেননি) বাসা, সেখান থেকে নজরুলকে ছিনিয়ে আমরা কয়েকটি উৎসাহী যুবক চলেছি আমাদের ‘প্রগতি’র আড্ডায়। ... হেঁটেই চলেছি আমরা, ... জনবিরল সুন্দর পথ আমাদের কলরবে কলরবে মুখর, নজরুল (একাই) একশো। চওড়া মজবুত জোরালো তাঁর শরীর, লাল-ছিটে-লাগা বড়ো মদির তাঁর চোখ, মনোহর মুখশ্রী, লম্বা ঝাঁকড়া চুল তাঁর প্রাণের ফূর্তির মতোই অবাধ্য। .... প্রাণশক্তির এমন এমন অসংবৃত উচ্ছ্বাস, এমন উচ্ছৃঙ্খল, অপচয় অন্য কোনো বয়স্ক মানুষের মধ্যে আমি দেখিনি। দেহের পাত্র ছাপিয়ে সব সময় উথলে পড়ছে তাঁর প্রাণ, কাছাকাছি সকলকেউ উজ্জীবিত করে, মনের সকল খেদ ও কেদ ভাসিয়ে দিয়ে।’ 

নজরুলের ঘনিষ্ঠবন্ধু ও সহপাঠী প্রখ্যাত সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ভোলে না কেউ ভোলে’ গ্রন্থের প্রায় পুরোটাজুড়েই নজরুলের স্মৃতিচারণ করেছেন। তারপরও বন্ধু নজরুল সম্পর্কে তাঁর অনেক কথাই না বলা রয়ে গেছে। ‘বন্ধু নজরুল’ শীর্ষক পৃথক স্মৃতি কথায় তিনি মহান, উদার কবি নজরুলের রেখাচিত্র এঁকেছেন। শৈলজানন্দ লিখেছেন, ‘চওড়া বুকের ছাতি, বড়ো বড়ো চোখ, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সুন্দর দেহ। মাথার চুলগুলো কিছুতেই বাগ মানছে না এই নজরুল! ... আমরা তখন পনেরো-ষোল বছরের কিশোর বালক। রানীগঞ্জে থাকি। দু’জন দুটো স্কুলে পড়ি, কিন্তু থাকি খুব কাছাকাছি। এক পুকুরে ¯œান করি, সাঁতার কাটি, আম, জাম, কামরাঙা গাছ থেকে পেড়ে নুন দিয়ে খাই, একসঙ্গে বেড়াতে যাই, সুখ-দুঃখের গল্প করি।’ পল্টন থেকে আসার পর নজরুলের অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেনÑ ‘সবাই তাকে নিয়ে হৈচৈ করছে, টানাটানি করছে, বলছে গান গাও, কবিতা শোনাও। বাহবা দিচ্ছে, প্রশংসা করছে। কিন্তু তিনি যে কি খেয়ে ও কেমন করে বেঁচে আছেন সে দিকটি দেখছে না। একটি পয়সাও নজরুলের আসছে না কোথা থেকেও।’
শৈলজানন্দ বলেছেন, ‘সে সময় নজরুল তার গল্পগুলোর কপিরাইট বিক্রির চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু তিনি চাননি যে তাঁর এ অবস্থার কথা অন্য কেউ জানুক।’ শৈলজানন্দ শেষদিকে লিখেছেন, ‘কবি এবং গীতিকার নজরুল সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাই দেশবাসীর কাছ থেকে পেয়েছে সে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আর প্রণতি। একদিন জীবন দেবতার কাছ থেকে পেয়েছে সে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ আর অপরিমাণ যন্ত্রণা। কবি নজরুলের চেয়ে মানুষ নজরুল অনেক-অনেক বড়। শিশুর মতো সরল, নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, নিরহঙ্কার, এমন অজাতশত্রু হৃদয়বান এবং আনন্দময় পুরুষ এ যুগে সচরাচর দেখা যায় না।’ হ


আরো সংবাদ