২২ অক্টোবর ২০১৮

কেন আলিবাবা নামটি বাছাই করেছিলেন জ্যাক মা

কেন আলিবাবা নামটি বাছাই করেছিলেন জ্যাক মা - ছবি : সংগৃহীত

চীনে শীর্ষ ধনীদের তালিকায় জ্যাক মা তৃতীয়। বর্তমানে তিনি বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন। ফোবর্স-এর প্রকাশিত শীর্ষ ধনীদের তালিকায় তিনি আছেন ২০তম স্থানে। প্রত্যাখ্যাত আর ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা তার জীবনে অসংখ্য। সম্প্রতি জ্যাক মা নিজ প্রতিষ্ঠান আলিবাবার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। শীর্ষ নির্বাহীর পদ ছাড়লেও তিনি আলিবাবার পরিচালনা পর্ষদে থাকছেন। শিক্ষায় মানবসেবার লক্ষ্যে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তরুণদের আইকন জ্যাক মা’র আদ্যোপান্ত নিয়ে লিখেছেন সুমনা শারমিন


চীনের অন্যতম বিত্তশালী জ্যাক মা গত ১০ সেপ্টেম্বর ৫৫ বছরে পা দিয়েছেন। ওই দিন থেকেই তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে জনহিতকর কাজে মনোনিবেশ করার কথা বলেছেন। তার এই ঘোষণা সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। তরুণদের উদ্যেশ্যে জ্যাক বলেন, আমি যেটা ভাবি, সেটাই যে সব সময় ঠিক তা নয়। তরুণদের আমি কিছু শেখাতে চাই না। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, আমি মনে করি এই পরামর্শ তাদের প্রয়োজন নেই।

১৯৬৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, চীনের দক্ষিণপূর্বাংশের হাংঝোও অঞ্চলে জ্যাক মা জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারে তার এক বড় ভাই আর এক ছোট বোন আছে। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক জ্যাক মা। স্বনামধন্য হয়ে ওঠার পরেও নিজের পারিবারিক জীবনকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক দূরে রাখেন। তার স্ত্রী ঝ্যাং ইং চীনে একজন শিক্ষক। স্কুলে পড়াকালীন তার সাথে দেখা হয়েছিল জ্যাক মা’র। ১৯৮০ সালের শেষে স্নাতক শেষ করার পর তারা বিয়ে করেন। শৈশবে জ্যাক মা-এরও ছিল ঝিঁঝিঁ পোকা ধরার শখ। তবে এ ক্ষেত্রে তার একটি ভিন্নধর্মী প্রতিভা ছিল, তিনি ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শুনে পোকার আকার আর ধরন বলে দিতে পারতেন। মার্শাল আর্ট তার অন্যতম শখ।

১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন, সে বছর তিনি একবার হাংঝোও সফর করেন। এরপর পর্যটকদের কেন্দ্রে পরিণত হয় জ্যাক মা-এর এলাকা। কিশোর বয়সে মা ভোরে ঘুম থেকে ওঠে শহরের প্রধান হোটেলটায় যেতেন আর সেখানকার পর্যটকদের শহর ঘুরে দেখানোর প্রস্তাব দিতেন। কিন্তু এতে তার লাভ? বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ইংরেজি শিখতে চাইতেন তিনি। তার বন্ধু হয়ে যাওয়া এক পর্যটকই তাকে ‘জ্যাক’ নামটি দেন, মা ইউয়ান থেকে তিনি হয়ে যান জ্যাক মা।

অর্থ বা কারো সাথে থাকা সংযোগ- দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকা মা-এর জন্য সামনে এগুনোর একমাত্র উপায় ছিল শিক্ষা। হাইস্কুলের পাঠ চুকানোর পর কলেজে ভর্তির আবেদন করেন তিনি। দু’বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে দু’বারই ফেল করেন তিনি। আবারো শুরু করেন পড়াশোনা। অবশেষে হাংঝোও টিচার্স ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন।

১৯৮৮ সালে স্নাতক শেষ করার পর শুরু করেন চাকরির খোঁজ, যত জায়গায় সম্ভব চাকরির আবেদন করেন। এক ডজনেরও বেশি জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হন জ্যাক। তাকে না নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল কেএফসির নামও। পরে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে একটি চাকরি পান তিনি। কাজটাকে ভালোবেসে ফেলা জ্যাক তার ছাত্রদের সাথে একদমই সাধারণ আচরণ করতেন। স্থানীয় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চাকরিতে তার মাসিক বেতন ছিল ১২ ডলার।
২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে জ্যাক মা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বার পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। ফলাফল? প্রতিবারই ফেল।

কম্পিউটার আর কোডিং নিয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট ব্যবহার করেন জ্যাক, মুগ্ধ হয়ে যান। অনলাইনে প্রথম যে শব্দ লিখে মা সার্চ করেন, তা ছিল ‘বিয়ার’। কিন্তু তাকে অবাক করে দেয় সার্চ-এ আসা ফলাফল। এতে ছিল না চীনা কোনো বিয়ারের নাম। এরপরই চীনের জন্য ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই শুরু করে দেন অনুবাদের ব্যবসা। চীনা একটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের পাওনা অর্থ পেতেও সহায়তা করেন। নিজের নেয়া দু’টি উদ্যোগই ব্যর্থ হয় জ্যাক-এর। চার বছর পর নিজ বাসায় ডেকে আনেন ১৭ বন্ধুকে। একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেইস বানাতে নিজের স্বপ্নের কথা বলেন তাদের কাছে, এতে বিনিয়োগের জন্য তাদের রাজিও করান। ভাবনা হচ্ছে, এই সাইটে রফতানিকারকরা তাদের পণ্যের তালিকা দেবেন আর ক্রেতারা এখান থেকে সরাসরি পণ্য কিনতে পারবেন।

‘আলিবাবা আর চল্লিশ চোর’ গল্পে গুপ্তধন লুকানো জায়গার দরজা খুলতে গোপন পাসওয়ার্ড ব্যবহারের বিষয়টি হয়তো সবারই জানা। বিশ্বজুড়ে নিজের প্লাটফর্মের মাধ্যমে ছোট আর মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিয়ে আসছেন অনেক বড় সম্ভাবনা, এমন আশা মাথায় ছিল তার। এই ধারণা মিলিয়ে স্যান ফ্রানসিসকোর এক কফিশপে বসে নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘আলিবাবা’ নামটি বেছে নেন তিনি। শিগগিরই এই সেবা বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষকে টেনে আনতে শুরু করে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি গোল্ডম্যান স্যাকস-এর কাছ থেকে ৫০ লাখ আর এর কিছুদিন পর সফটব্যাংক-এর কাছ থেকে দুই কোটি ডলার সংগ্রহ করে।

জ্যাক আলিবাবায় মজার একটা পরিবেশ বজায় রাখতেন। কর্মীদের সাথে সম্পর্কটা এতটাই মজার ছিল যে, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবার যখন লাভের মুখ দেখে, সেবার তিনি প্রতিকর্মীকে একটি করে সিলি স্ট্রিং দেন মজা করার জন্য। ই-কমার্স খাতে ইবে’র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলিবাবার অধীনে ‘টাওবাও’ নামে নতুন প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেন আলিবাবা। এ সময় নিজেদের কাজ করার শক্তি বাড়াতে বিরতির সময় হাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার ব্যায়াম করতেন।

২০১৩ সালে মা আলিবাবার প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরে আসেন জ্যাক মা, হয়ে যান নির্বাহী চেয়ারম্যান। ২০১৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে আলিবাবা শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরু করে। নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে শেয়ার বিক্রি শুরু করে আলিবাবা। প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার সময় প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ধরা হয় ১৫ হাজার কোটি ডলার। এর মাধ্যমে চীনের শীর্ষ ধনীর জায়গাটাও চলে যায় জ্যাক মা’র দখলে, সে সময়ের হিসাবে তখন তার মোট সম্পদের মূল্য ছিল ২৫০০ কোটি ডলার। নভেম্বরের ১১ তারিখ চীনে ‘সিঙ্গল’স ডে’পালন করা হয়। কারো সাথে কোনো প্রেম বা বৈবাহিক সম্পর্কে না থাকা চীনের ‘সিঙ্গল’ ব্যক্তিদের জন্য এ দিনটি উদযাপন করা হয়।

চীনা দিনপঞ্জিকায় এটি হচ্ছে আলিবাবার ব্যবসায়ের জন্য সবচেয়ে বড় দিন। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি এ দিনে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার বিক্রির রেকর্ড গড়ে। ২০১৭ সালে এ রেকর্ড ভাঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি, সে বছর বিক্রি হয় প্রায় ২৫০০ কোটি ডলারের পণ্য।

এতটা অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার পরেও জ্যাক মা’র শখের তালিকাটা আট-দশটা সাধারণ মানুষের মতোই। বই পড়তে আর কুং ফু ফিকশন লিখতে ভালোবাসেন তিনি। তার শখের মধ্যে আছে পোকার খেলা, মেডিটেশন আর তাই চি অনুশীলনও। তাই চি হচ্ছে এক ধরনের চীনা মার্শাল আর্ট।
জ্যাক মা-এর আবেগের জায়গাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশবাদী হয়ে ওঠার পেছনেও কারণ রয়েছে তার। নিজের স্ত্রীর পরিবারের একজন অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য দূষণ দায়ী ছিল বলে ধারণা হয় তার। এ থেকেই পরিবেশবাদী হয়ে ওঠেন তিনি। নেচার কনজার্ভেন্সির বৈশ্বিক সদস্য হন তিনি, ২০১৫ সালে ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ-এর একটি আয়োজনে বক্তব্যও রাখেন। চীনে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ২৭ হাজার একর জমির তহবিলে যোগানে সহায়তা করেছেন তিনি।

আলিবাবা যেহেতু দাঁড়িয়ে গেছে, সে কারণে তিনি এখন সময় দিচ্ছেন জনহিতকর কাজে। বিশেষ করে শিক্ষাখাতে তার আগ্রহ বেশি। তিনি যে জ্যাক মা ফাউন্ডেশন করেছেন। সেই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি এখন চীনের গ্রামপর্যায়ে শিক্ষার জন্য কাজ করবেন। তিনি কাজ করে যেতে চান ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্মে মানুষের কল্যাণে।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বৈঠকের পর সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেন মা। বাণিজ্য নিয়ে ট্রাম্পের রক্ষণশীল মনোভাব থাকা সত্ত্বেও জ্যাক মা বলেন, চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, ট্রাম্পকে কিছু সময় দিন। তিনি উন্মুক্ত মনের।

জ্যাক মা পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাহী চেয়ারম্যান হবেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ডেনিয়েল ঝ্যাং। ৪৬ বছর বয়সী ঝ্যাং আলিবাবার সিঙ্গলস ডে প্রচারণা চালু করেন। সিঙ্গলস ডে হচ্ছে অনলাইন কেনাবেচায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজন।


আরো সংবাদ