২০ অক্টোবর ২০১৮

গণপূর্ত অধিদফতরে বদলি আতঙ্ক

গণপূর্ত অধিদফত - ছবি : সংগৃহীত

সরকারের শেষ সময়ে গণহারে বদলি শুরু হয়েছে সরকারি ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতরে। প্রতি কর্মঘণ্টায় বদলির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন একজন করে কর্মকর্তা। গত দেড় মাসে (আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর) ৩০ কর্মদিবসে বদলি হয়েছেন ১৫৩ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে পাঁচজনেরও বেশি কর্মকর্তার নাম বদলির তালিকায় এসেছে। এদের মধ্যে উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীও রয়েছেন। গণপূর্ত অধিদফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অফিস আদেশ অনুসন্ধানে এসব তথ্য মিলেছে। এখন গণপূর্ত অধিদফতরে চলছে বদলি আতঙ্ক।

অভিযোগ ওঠেছে, এসব বদলির বেশির ভাগই হচ্ছে আর্থিক লেনদেনে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের মেয়াদ সরকারের মেয়াদের সাথে সাথেই (ডিসেম্বর) শেষ হচ্ছে। যে কারণে, প্রধান প্রকৌশলী মো: রফিকুল ইসলাম বাণিজ্য করে নিজের পকেট ভর্তি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের ঢাকায় বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়ে আসা হচ্ছে। আবার অনেকের পোস্টিং দিচ্ছেন তাদের পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রিপাড়া, সংসদ, গণভবন, বঙ্গভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আর এসব পদ ফাঁকা করতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কর্মরতদের সরিয়ে দিচ্ছেন অন্যত্র। শুধু টেন্ডারে অনিয়ম ও জালিয়াতি করেই তিনি সরকারের কয়েক শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

এসব কাজে পাঁচ কর্মকর্তা তাকে সহযোগিতা করছেন বলে জানা যায়। তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সিন্ডিকেট। এরা হলেনÑ ঢাকা সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সোহরাওয়ার্দী, সিটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত উল্লাহ, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক চৌধুরী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডল এবং শেরে বাংলা নগর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত দেড় বছরে বিভিন্ন পদের দেড় হাজারেরও বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। এ কারণে, গণপূর্তে কর্মরতরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলী জানান, তারা আতঙ্ক নিয়ে অফিসে ঢোকেন। আবার একই টেনশন নিয়ে প্রতিদিন অফিস শেষ করেন। কখন বদলির চিঠিটা হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে, তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। 

তারা জানান, প্রতিটি বদলির জন্য বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এটাও আবার কয়েক ভাগে বিভক্ত। রাজধানীর যেসব এলাকায় নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বেশি, সেসব এলাকায় বদলির জন্য নেয়া হয় ১৫-২০ লাখ টাকা। মাঝারি কাজের জায়গার জন্য ১০-১৫ লাখ টাকা। আর রাজধানীতে থাকার জন্য নেয়া হয় ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকা। রমনা, ধানমন্ডি, শেরে বাংলা নগর ও গুলশান এলাকায় বদলির জন্য সর্বাধিক টাকা নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একজনকে শাস্তিস্বরূপ রাজধানীর বাইরে বদলি করা হয়েছে বলে জানা যায়। আর্থিক লেনদেনে তুষ্ট হয়ে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। আবার কেউ টাকা দিতে রাজি না হলে তাকে বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পাঠানো হয়েছে, এমন নজিরও আছে। 

সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক টাকা থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কাজ ইজিবি টেন্ডারের মাধ্যমে দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও অভিযোগ রয়েছেÑ বড় কাজের প্রায় সবগুলোই ম্যানুয়াল ওটিএমের মাধ্যমে নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দেয়া হচ্ছে। সিভিলের পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল (ইএম) কাজে বিশেষ করে লিফট ক্রয় কাজে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ডিভিশনের আওতাধীন প্রকল্পে লিফট ক্রয়ের টেন্ডার দেয়ার এখতিয়ার ওই ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর থাকলেও প্রধান প্রকৌশলী তাদের এখতিয়ার রুদ্ধ করে দিয়ে সব চাহিদা একসাথে করে পূর্তভবন থেকে তিনি নিজেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। মতিঝিল, উত্তরা ও আজিমপুরসহ বিভিন্ন ডিভিশনের প্রায় তিন শ’ লিফট ক্রয়ের কাজ নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে প্রদান করা হয়েছে বলে জানা যায়। এ দিকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত কাজও ইজিবি ছাড়াই নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে দিয়ে দেয়া হয়েছে নির্ধারিত কমিশনের মাধ্যমে।

এ দিকে, গণহারে বদলি এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কথা বলার জন্য প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।


আরো সংবাদ