২২ অক্টোবর ২০১৮

মসজিদে তালা কেন?

মসজিদে তালা কেন? - ছবি : সংগৃহীত

রাজধানী দিল্লি লাগোয়া হরিয়ানা রাজ্য বর্তমানে হিন্দুত্ববাদের ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাজ্যগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এখানে বিজেপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ওইসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেগুলোর কারণে মুসলমানরা নিজেকে দ্বিতীয় স্তরের নাগরিক ভাবে। গত কয়েক মাস ধরে হরিয়ানার গুরগাঁওয়ে মুসলমানদের জুমার নামাজ আদায়ে বাধা দেয়া হচ্ছে, আর এখন তো প্রশাসন এক ধাপ আগে বেড়ে মসজিদেই তালা মেরে দিয়েছে। এটা সেই মসজিদ, যা মুসলমানরা বিধি মোতাবেক জমি ক্রয় করে নির্মাণ করেছে এবং গত চার বছর ধরে যেখানে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করে আসছে।

উগ্রপন্থীরা মসজিদে নামাজ আদায়ে বাধা দেয়ার জন্য আজান নিয়ে হই চই শুরু করে। তারা বলেছে, মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা আজান তাদের আরামের ব্যাঘাত ঘটায়। ‘সুতরাং লাউডস্পিকার নামিয়ে ফেলা হোক।’ মসজিদ কমিটি স্বদেশী ভাইদের কষ্টের প্রতি খেয়াল করে ছাদ থেকে মাইক নামিয়ে নিচে রেখেও দিয়েছিল এবং নিচু আওয়াজে আজান দেয়া হচ্ছিল; কিন্তু উগ্রপন্থীদের শত্র“তা ছিল মূলত মসজিদের সাথে। সুতরাং তারা প্রশাসনকে চাপের মধ্যে ফেলে একতরফা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মসজিদকে তালাবদ্ধ না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয়নি। এ বিষয়ে মসজিদ কমিটিকে কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি, কিংবা এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে কোনোভাবে অবহিত করা হয়নি। গুরগাঁওয়ের যে শীতলা কলোনিতে এ মসজিদ বানানো হয়েছে, সেখানে মুসলমানদের রয়েছে প্রায় ৩০০টি ঘর। ওই কলোনিতে মন্দির, গুরুদুয়ারা ও চার্চের মতো উপাসনালয়ও রয়েছে। তবে তালা ঝোলানোর কাজটা শুধু মদিনা মসজিদেই করা হয়েছে। ৮৭ গজের এ মসজিদ বিধি মোতাবেক জমি কিনে এবং সরকারি যাবতীয় শর্ত পূরণ করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

প্রশাসন মসজিদে তালা ঝোলানোর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে, ‘এ মসজিদ যেহেতু ভারতীয় বিমানবাহিনীর অস্ত্রাগারের তিন শত মিটারের মধ্যে পড়ে, তাই এখানকার নিরাপত্তার প্রতি লক্ষ রেখে নামাজ আদায়ের অনুমতি দেয়া যেতে পারে না।’ অথচ এ মসজিদের আশপাশে নির্মিত বহু ভবন এমনিই রেখে দেয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অভিযোগ করা হয়নি। হরিয়ানা রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে এমন উত্তেজনাপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালান হচ্ছে, যা মুসলমানদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করার মাত্রার চেয়েও বেশি। আপনাদের মনে আছে, ছয় মাস আগে হরিয়ানার গুরগাঁও শহরে খোলা জায়গায় জুমার নামাজ আদায়ে বাধা দেয়া হয়েছিল।

‘সাইবার নগরী’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এ নতুন শহরে হাজার হাজার মুসলমান মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে এবং হাজার হাজার মুসলিম শ্রমিক এখানে নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছে। এসব লোক প্রতি জুমায় আশপাশের খালি স্থানে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করছিল; কিন্তু একদিন হঠাৎ উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা এখানে জুমার নামাজের সময় তাদের তাড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে নামাজ পড়তে বাধা দেয়। সেখানে উপস্থিত পুলিশ ওই মুহূর্তে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করেনি। বরং উগ্রবাদীদের চাপে পুলিশ এসে মুসলমানদের খোলা ময়দানে জুমার নামাজ আদায় করতে নিষেধ করেছে। পরে এ বিষয়ে হরিয়ানা সরকারের বদনাম হলে তারা স্থানীয় মুসলমান ও উগ্রবাদীদের একসাথে বসিয়ে একটি নাটকীয় ‘চুক্তি’ করে এবং কয়েকটি খালি প্লটের মধ্যেই জুমার নামাজ আদায় সীমাবদ্ধ করে দেয়।

এর সাথে এ কথাও বলে দেয়া হয়, মুসলমানরা খালি প্লটগুলো ব্যতীত শুধু ঘর আর মসজিদে নামাজ আদায় করবে। বড় কষ্টের কথা হচ্ছে, হরিয়ানায় অসংখ্য ঐতিহাসিক মসজিদ বিরান পড়ে রয়েছে, যেখানে প্রশাসন মুসলমানদের নামাজ আদায়ের অনুমতি দেয় না। এ মসজিদগুলো স্বাধীনতার আগে ওখানকার বাসিন্দা মুসলমানরা বেশ আগ্রহ নিয়ে নির্মাণ করেছিল; কিন্তু দেশ ভাগের ফলে এ অঞ্চল মুসলমানশূন্য হয়ে যায়। এখন মুসলমানরা নতুন স্থানে প্লট ক্রয় করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ শুরু করলে নিরাপত্তার অজুহাতে এতে নামাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। গুরগাঁওয়ের শীতলা কলোনিতে অবস্থিত মদিনা মসজিদের বিষয়টিও ওই গোঁড়ামি, সঙ্কীর্ণতা ও মুসলিম বিদ্বেষের কুফল।

আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, এটা সেই হরিয়ানা রাজ্য, যেখানে দু’বছর আগে প্রাদেশিক সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, আদালতের কার্যক্রমে ব্যবহৃত উর্দু ও ফারসি শব্দ পরিহার করে এর পরিবর্তে হিন্দি শব্দ ব্যবহার করা হবে। ফারসি ও উর্দু শব্দকে আদালতের কার্যক্রম থেকে পরিহার করার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে বলা হয়েছিল, ওই শব্দগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে। এক দুর্নীতিপরায়ণ সরকার এবং তার দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন নিজেদের অপকর্মের দায় এমন ভাষার ওপর চাপাচ্ছিল, যা বিশ্বকে সভ্যতা ও ভদ্রতার পাঠ দান করেছে। উর্দু ও ফারসি যে শব্দগুলোর ব্যবহারের দ্বারা মানুষকে সভ্য ও ভদ্র ভাবা হয়, তা হরিয়ানা সরকারের বাঁকা চোখে ‘দুর্নীতিসহায়ক’।

এর চেয়ে বেশি কষ্টকর আর কী হতে পারে, যখন থেকে ভারতে বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে, তখন থেকেই সেসব বস্তু মিটিয়ে দেয়া বা বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র চরমে পৌঁছেছে, যা মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট। স্বাধীনতাযুদ্ধের মুসলিম যোদ্ধাদের নামে নামকরণকৃত পার্কগুলো এবং মুসলিম বাদশাহদের নামে বানানো সড়ক ও অন্যান্য স্থানের নাম দ্রুততার সাথে বদলে ফেলা হচ্ছে। সম্প্রতি লাক্ষেèৗতে স্বাধীনতাযুদ্ধের জনপ্রিয় যোদ্ধা বেগম হজরত মহলের স্মরণে নামকরণকৃত হজরত মহল চকের নাম বদলে করোটিল চক করা হয়েছে।

মুসলমানদের নাম ও কীর্তিকে মিটিয়ে ফেলতে লিপ্ত গোঁড়া ও সঙ্কীর্ণমনা উগ্রবাদী গোষ্ঠী এ বাস্তবতা সম্পর্কে জানে না যে, ভারত থেকে যদি মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সভ্যতা-সংস্কৃতিকে মিটিয়ে দেয়া হয়, তাহলে এখানে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। গুরগাঁওয়ের মদিনা মসজিদে সরকারিভাবে তালা দেয়ার ঘটনায় স্থানীয় মুসলমানদের মাঝে বেশ অস্থিরতা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা জোরালো কণ্ঠে প্রতিবাদ করে বলেছে, যদি মদিনা মসজিদ নামাজের জন্য খুলে না দেয়া হয়, তাহলে তারা নিজেরাই এ জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গুরগাঁও মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন আদালতের যে রায়কে পুঁজি করে মসজিদে তালা ঝুলিয়েছে, তা ২০১৫ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, ভারতীয় বিমানবাহিনীর অস্ত্রাগারের ৩০০ মিটার এলাকার ভেতর কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু যে মদিনা মসজিদকে তালাবদ্ধ করা হয়েছে, তা ওই আদালতের রায়ের আগে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, একটি মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে ভেসে আসা আওয়াজের আজান এবং এখানে আদায় করা নামাজ দ্বারা বিমানবাহিনীর অস্ত্রাগারের কী এমন ক্ষতি হতে পারে?

বাহ্যত এটি শুধু গোঁড়ামিপনা। এর লক্ষ্য সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী সংগঠনগুলোর কৃপা হাসিল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। গুরগাঁওয়ের মদিনা মসজিদে তালা ঝোলানোর কিছু দিন আগে একই ধরনের কাজ পূর্ব দিল্লির বারহামপুরী এলাকায় করা হয়েছিল। ওই এলাকার একটি গলিতে মুসলমানেরা নামাজ আদায়ের জন্য একটি ঘরকে মসজিদ বানিয়ে ব্যবহার শুরু করেছিল; কিন্তু স্বদেশী ভাইয়েরা এর বিরুদ্ধে এত বিশাল অভিযোগ দায়ের করে যে, পুলিশ কোনো কিছু না ভেবেই মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, বারহামপুরীর ওই গলিতে মুসলমানদের ৪৭টি ঘর রয়েছে, পক্ষান্তরে অমুসলমানদের ঘর রয়েছে মাত্র ১৪টি। তথাপি মুসলমানদের নামাজ আদায়ে বাধা দেয়া হয়েছে। ভারতে এ ধরনের অসহনীয় ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকার তা থামানোর পরিবর্তে উগ্রবাদীদের সামনে মাথা নত করে চলছে। মুসলমানদের ইবাদত ও ধর্মকর্মে বাধা দেয়া ভারতের সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধানে রক্ষিত, ধর্মীয় স্বাধীনতার স্পষ্ট বিরোধিতা।

যে সরকার ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’-‘সবার সাথে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং সবার উন্নয়ন’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং সংবিধান মেনে চলার শপথ গ্রহণ করেছে, তারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিধিবিধান এবং গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারগুলো লুণ্ঠন করছে। এ পরিস্থিতি ভারতের জন্য চরম জঘন্য এবং চিন্তার বিষয়। মূলত বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের ইবাদত তথা ধর্মকর্ম থেকে দূরে রেখে তাদের হিন্দুত্বের মাঝে শামিল করার চেষ্টা চলছে। আর এখন পরিপূর্ণ ক্ষমতা অর্জনের পর আরএসএসের ওই চেষ্টা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয় অনুভব করা যাচ্ছে।

মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দু টাইমস ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ