১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

নতুন জটিলতায় ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া

ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ - ছবি : সংগৃহীত

আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দু’টি দেশ ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। এক সপ্তাহ আগে উভয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় সম্প্রদায় অর্থডক্সদের নিউ এয়ার উদযাপনের সময় উভয় দেশের দুই নেতা এক সাক্ষাৎকারে মিলিত হন। তখন তারা উভয় দেশের সীমান্ত খুলে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকারটি হয় জালাম্বেসা নামে সীমান্তবর্তী একটি শহরে।

এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে গত মাসের ১৭ তারিখে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওই সময় ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকি এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবে আহমেদ সৌদি আরবের জেদ্দায় এক শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। যদিও ওই শান্তিচুক্তির বিস্তারিত কিছু এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এর পর গত সপ্তাহে আবার জালাম্বেসায় এই সাক্ষাতে মিলিত হওয়ার মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়া আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল।

দুই দেশের মধ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয় গত জুন মাসে। গত ১৪ জুলাই ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকির ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা সফরকালে ইথিওপীয় প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত আবেগতাড়িতভাবে ‘আপনি আমাদের নেতা’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবেও তখন তার বক্তৃতায় উপস্থিত জনতার সামনে ঘোষণা করলেন, ‘আমরা যদি এক হয়ে যাই, তাহলে ‘আসাব’ও আমাদেরই হবে। আসাব হলো ইরিত্রিয়ার রেড সি-পোর্ট। এ পোর্টটি এককালে ইথিওপিয়ারই অংশ ছিল। এই পোর্ট আবার ইথিওপিয়ারই হবে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই ঘোষণা শুধু দুই দেশের প্রতীকী শান্তি আলোচনাই নয়, এটি দুই দেশের মধ্যে সামাজিক পুনরেকত্রীকরণের ইঙ্গিত বলেও মনে করে আন্তর্জাতিক মহল।

দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি টেলিফোন লাইন খুলে দেয়া এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইটও পুনরায় চালু করা হয়েছে। ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ফোনে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া, উভয় দেশ তাদের দূতাবাস চালু এবং পুরনো বাণিজ্যিক রুট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ উৎসাহ দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই শান্তিপ্রক্রিয়াকে ‘আফ্রিকায় আশার আলোকে নতুন বাতাস বইছে’ বলে অভিহিত করেন। দুই দেশের মধ্যে শান্তি দীর্ঘমেয়াদি হবে এবং হর্ন অব আফ্রিকায় তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হয়। ইথিওপিয়া থেকে ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীনতা লাভের পর উভয় দেশের মধ্যে এতকাল তেমন সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থা ছিল না। কিন্তু এতে শান্তিপ্রক্রিয়া কখনো থেমে থাকেনি।

ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়ার পৃথকীকরণ বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে তখনকার আন্তর্জাতিক মহল এবং নতুন ইথিওপিয়ান সরকার সমর্থন দিয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে তা আদর্শ পৃথকীকরণ হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। আজো এ দুই রাষ্ট্র তাদের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাবই বজায় রেখেছে। বলা যায়, তারা ইতিহাসের ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে না।

শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়
১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে ৩০ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন এ দুই রাষ্ট্রের মধ্যে প্রাথমিকভাবে শান্তি আলোচনা আবার শুরু হয়েছে।

বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় ইথিওপিয়ার পিপলস রেভলিউশনারি ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইপিআরডিএফ) এবং ইরিত্রিয়ান পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (ইপিএলএফ) উভয়ই ইথিওপীয় কমিউনিস্ট সামরিক সরকার, ‘দ্য ডারগ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে কমিউনিস্ট সরকারকে হটিয়ে আদ্দিস আবাবা ও আসমারা উভয়ই তাদের মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তাদের এই ক্ষমতা গ্রহণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক অভিনন্দিতও হয়েছিল। তখন দুই রাষ্ট্রের দুই ক্যারিশমেটিক নেতা ইথিওপিয়ার মেলেস জেনাভি এবং ইরিত্রিয়ার ইসাইয়াস আফওয়ার্কিকে আফ্রিকান নেতাদের ‘পরবর্তী প্রজন্ম’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহল বেশ বাহবা জানায়।
পৃথক হওয়ার পর উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম ‘আসমারা সন্ধি’ নামে একটি কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদিত হয়। ২৫টি দলিল সংবলিত ওই চুক্তিপত্রে প্রতিরক্ষাসহ সব খাতে দু’টি দেশকে সংহত করার একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

ইরিত্রিয়ার অর্থনীতি ইতোমধ্যে বেশ সুসংহত হয়ে উঠেছে এবং তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। এ ছাড়া ইথিওপিয়া বিশ^বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের বেশির ভাগ পণ্য পরিবহনের জন্য ইরিত্রিয়ার প্রধান বন্দর আসাবের ওপর এখনো নির্ভরশীল। দু’টি দেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইরিত্রিয়ানদের ইথিওপীয় নাগরিকত্বের প্রায় সব সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখেই ওই সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাস্তবিকভাবে উভয় জনগোষ্ঠী এমনভাবে বসবাস করছে, যেন তারা একই রাষ্ট্রের নাগরিক। পৃথক হওয়ার পরও উভয় দেশের জনগণ যেন একই রাষ্ট্রের, এমন এক মনমানসিকতা পোষণ করছে উভয় জনগোষ্ঠী।
বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইথিওপিয়ায় প্রথম সফরে এসে প্রেসিডেন্ট আফওয়ারকি ঘোষণা করেন, অর্থনৈতিক একত্রীকরণের পর উভয় দেশ রাজনৈতিক একত্রীকরণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তখন ইথিওপিয়ার নেতা জেনাভিও এটাকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন এটা হয়তো এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

শান্তিপ্রক্রিয়ার দ্বিতীয় উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং উভয় দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে যেহেতু শান্তি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী এবং যেহেতু উভয় দেশই উত্তপ্ত বিষয় নিয়ে আর সঙ্ঘাতে জড়াতে চায় না, তাই উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় খুব একটা বেগ পেতে হবে না বলেই মনে করে আন্তর্জাতিক মহল। নতুন করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উভয় দেশের জনগণের মধ্যে এক নস্টালজিয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধ জেগে আছে। ইথিওপীয় এবং ইরিত্রিয়ান জনগণের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্বন্ধ মজবুত, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই এ সম্পর্কই তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এই শান্তি প্রতিষ্ঠা অতীতেও করার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং ১৯৯৮ সালের দ্বন্দ্বের ফলে তার চরম পরিণতি হয়েছে। তবে উভয় দেশের অভিন্ন স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ববোধ বজায় রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা খুব একটা কঠিন বিষয় হবে না বলেই সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।


আরো সংবাদ