১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

জাতীয় ঐক্য ও ফরাসি বিপ্লব

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এভাবে একাধিকবার মিলিত হয়েছেন ড. কামাল হোসেন ও বি. চৌধুরী - নয়া দিগন্ত

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। সরকার ও বিরোধী পক্ষের শক্তিবৃদ্ধি ও প্রভাব বিস্তারের মহড়া চলছে সমান্তরালে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারপক্ষকেই এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। কারণ, ক্ষমতাসীনেরা এ কাজে দলীয় শক্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার করছে বলে বিরোধী মহলে অভিযোগ রয়েছে। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা আর বিরোধী পক্ষ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বর্তমান সরকার পরপর দু’মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর এরা যেভাবে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তাতে বহুধাবিভক্ত বিরোধী দলগুলোর পক্ষে তাদের ক্ষমতা থেকে নামানো খুব একটা সহজসাধ্য হবে বলে মনে হয় না। তবে নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে পরিস্থিতির পরিবর্তনও হতে পারে।

জাতীয় সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলো বোধহয় সে কথাটাই ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে। তবে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল তো এখনো সাক্ষীগোপাল হয়েই আছে। মূলত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে বৃহত্তর ঐক্যের তাগিদ দীর্ঘ দিন থেকেই অনুভূত হচ্ছে। সে তাগিদকে গুরুত্ব দিয়েই বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটা ঐক্য প্রক্রিয়া চলছে বেশ জোরেশোরেই। বিষয়টি নিয়ে কখনো ১৯৫৪ সালের আদলে যুক্তফ্রন্ট, কখনো ১৯৬৫ সালের মতো সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ) এবং কখনো জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে। এ নিয়ে একেক সময়ে একেক কথা বলা হলেও এর গন্তব্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।

সঙ্গত কারণেই ঐক্যবাদীরা এখন পর্যন্ত আমাদের আশ্বস্ত করতে পারেননি। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হওয়ায় এ প্রক্রিয়া অনেকটা লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ঐক্যের নামে যা শুরু হয়েছে তাতে সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করা তো দূরের কথা, বরং সরকারের বিশাল বপুতে কাতুকুতু দেয়াও সম্ভব হয় কি না তা নিয়েও সন্দেহ করছেন অনেকেই। কারণ, ঐক্য প্রতিষ্ঠার নামে অনৈক্য, বিভাজন এবং পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি যেভাবে শুরু হয়েছে তাতে আশান্বিত হওয়ার খুব একটা সুযোগ থাকছে না। ঐক্য প্রক্রিয়ার রথী-মহারথীরা যদি এখনই নিজেদের গোঁফ নামাতে না পারেন, তা হলে ঐক্যের ভাগ্যে যে ইতিবাচক কিছু হচ্ছে না তা প্রায় নিশ্চিত।

রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনের ঘটনা এই প্রথম নয়, বরং এর বর্ণাঢ্য অতীতও রয়েছে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে প্রধান প্রধান বিরোধী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট নামীয় সমন্বিত বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন করেছিল। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। এর সাথে যুক্ত ছিল মাওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি, বামপন্থী গণতন্ত্রী দলের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ এবং মাহমুদ আলি সিলেটি। যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তারা যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

১৯৬৫ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন সফল করার জন্য গঠিত হয়েছিল সম্মিলিত বিরোধী দল বা কপ (Combined Opposition Parties or COP)। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দিলে রাজনীতিক দলগুলো জোট বেঁধে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেয়। এই লক্ষ্য নিয়েই কপ গঠিত হয়েছিল। নেতৃত্বে ছিলেন আইয়ুব-বিরোধী মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমউদ্দীন। ‘কপ’-এর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো হলোÑ আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, নেজামে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী। সামরিক শাসক আইয়ুব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করাই ছিল এই বিরোধীদদলীয় মোর্চ্চা গঠনের একমাত্র উদ্দেশ্য।

করাচিতে অনুষ্ঠিত ‘কপ’-এর কেন্দ্রীয় সভায় পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মনোনয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অন্য দিকে কনভেনশন মুসলিম লীগ আইয়ুব খানকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। যদিও কপ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। তবে কপের সাফল্য নেহাত কম ছিল না। হয়তো ঐক্যপন্থীরা সেটাকে প্রেরণার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।

১৯৫৪ সালে ‘যুক্তফ্রন্ট’ ও ১৯৬৫ সালে ‘কপ’ গঠন করতে সে সময় খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। সেখানে সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি, বরং জাতীয় স্বার্থ ও গণতন্ত্রতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যে সরকারবিরোধী শক্তিশালী ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে, তা যে শুরুতেই একটা শক্ত ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ঐক্যবাদী পক্ষগুলোর মধ্যে মূলধন বাদ দিয়ে লাভ-লোকসান নিয়ে রশি টানাটানি শুরু হয়েছে। যা ক্ষমতাসীনদেরই আনুকূল্য দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঐক্যবাদীরা এই প্রক্রিয়াকে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু যারা সরকার বিরোধী ঐক্যকে জাতীয় ঐক্য আখ্যা দিতে চান, তারা আমাদেরকে নিঃসন্দেহে ভুল বার্তায় দিচ্ছেন। কারণ, শুধু সরকারবিরোধী ঐক্যকে কোনোভাবেই জাতীয় ঐক্য বলার সুযোগ থাকে না। সে কথা ঐক্যবাদীরা না বুঝলেও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়।

যদিও তা ক্ষমতাসীনদের স্ববিরোধিতা ও বিলম্বিত উপলব্ধি। এর আগে আওয়ামী লীগ তাদের শরীক দলের নেতাদের সাথে চা-চক্র করে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দিয়ে লোক হাসিয়েছিল। মূলত জাতীয় ঐক্য বলতে বিশেষ দল, গোষ্ঠী বা শ্রেণী বিশেষের ঐক্যকে বোঝায় না, বরং দলমত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার নামই জাতীয় ঐক্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঐক্যপন্থীরা সরকারি দলকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্যের কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। এমনকি ঐক্যপন্থী নেতা ডা. জাফরুল্লাহ ‘জামায়াতকে জাতীয় ঐক্যে রাখা হবে না’ বলে কোন ঐক্যের বাণী শুনিয়েছেন তা কারো বোধগম্য নয়। জামায়াত ছাড়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের আখের নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন।

আমাদের দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্যের কথা কল্পনা করারও সুযোগ নেই। কারণ, আমরা রাজনীতিতে সে সংস্কৃতি এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। খুব সঙ্গত কারণেই সরকারবিরোধী ঐক্য ‘যুক্তফ্রন্ট’ ও ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ গঠন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ-সংশয়টা বেশ জোরালো। শুরুতে ঐক্যপন্থীদের মধ্যে জামায়াত নিয়ে টানাহেঁচড়া হলেও এখন তার পরিসর অনেকটাই বেড়েছে। জামায়াত ইস্যুতে অনেকটাই সফল হওয়ার পর তারা এখন বিএপিতে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। এমনকি কেউ কেউ বিএনপিকেও জামায়াতের মতো অচ্ছুত-অপয়া আখ্যা দিতেও কসুর করছেন না। মূলত জামায়াত ইস্যুতে বিএনপির অতিমাত্রায় নমনীয়তায় তাদেরকে এ সুযোগ করে দিয়েছে। এতে বিএনপির লাভের পরিবর্তে ক্ষতিই হচ্ছে। তারা নিজেদের শক্তি নির্ভর হওয়ার পরিবর্তে যেভাবে পৃষ্ঠপ্রদর্শন শুরু করেছে তাতে আগামী দিনে তাদেরকে বড় ধরনের খেসারতও দিতে হতে পারে।

মূলত ঐক্য প্রক্রিয়াকে জোরদার ও সফল করার জন্য বিএনপির আন্তরিকতাকে দুর্বলতা হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। আর এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য ঐক্যে একটা পক্ষ নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইছে। ফলে তারা বিএনপি যাতে আগামীতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ না হয়ে তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকে সে বিষয়টিই এখনই পাকাপোক্ত করতে চাইছে। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার নামে তারা আগামী দিনে সরকারের নিয়ামক শক্তি বা প্রতিভূ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। ফলে নাম, প্যাড ও সাইবোর্ডসর্বস্ব একনেতার দলগুলোও বিএনপির কাছে ১৫০ আসন দাবি করে বসেছে। বিষয়টি বিএনপিকে গভীরভাবে ভাবার তাগিদ সৃষ্টি করেছে।

জামায়াত ইস্যুতে সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী ও তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী যে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন, তা পিতা-পুত্রের জোট গঠনের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অতীত সে কথারই সাক্ষ্য বহন করে। জামায়াতের দুই নেতা যে মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন, সে মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি ছিলেন বি. চৌধুরী। তিনি যখন বিএনপির মহাসচিব ছিলেন, তখন মুসলিম লীগের শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আবদুুল আলীম ছিলেন রেলমন্ত্রী। তাই জামায়াতকে বিএনপি থেকে আলাদা করতে পারলে যারা লাভবান হন, কেউ কেউ পিতা-পুত্রকে তাদেরই প্রতিভূ মনে করছেন।

জামায়াতকে জোটে রাখার জন্য সরকারসহ কিছু ঐক্যবাদী দল বিএনপিকে তুলোধুনো করলেও দলটির সাথে মধুচন্দ্রিমার সুখানুভূতি থেকেই কেউই মুক্ত নয়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীনেরা জামায়াতকে সাথে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। আজ যারা ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য জামায়াতকে প্রধান অন্তরায় মনে করছেন, তাদের অতীত পর্যালোচনা করলেও একই চিত্র ভেসে ওঠে। আসলে কাজের সময় সবাই জামায়াতকে ব্যবহার করেছে।

আর কাজ শেষ হলেই তাদের বিভিন্ন অপবিশেষণে বিশেষিত করা হয়েছে। আমাদের দেশের রাজনীতির এতটা অবনোমন কখনোই কাক্সিক্ষত ছিল না।

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) ফরাসি, ইউরোপ এবং পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফরাসি বিপ্লবের মূলনীতি ছিল ‘স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, অথবা সম্পত্তির পবিত্র অধিকার’। প্রাক বিপ্লবকালীন মুহূর্তে ফরাসিরা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিল। আর তাদের এ কাজে সহায়ক হয়ে উঠেছিল ফরাসি দার্শনিক, সাহিত্যিক সর্বোপরি বুদ্ধিজীবীরা। ফলে একটি সফল বিপ্লব সাধিত হয়েছিল। তাই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে এলিট শ্রেণীর ঐক্যই যথেষ্ঠ হবে না, বরং উদ্দেশ্য সাধনে জনগণকেও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এগুতে হবে ফরাসি বিপ্লবকে মানদণ্ড ধরেই। একটি ইস্পাতকঠিন ঐক্যই আমাদের কাক্সিক্ষত মুক্তি এনে দিতে পারে।

[email protected]


আরো সংবাদ