১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

কালের কবলে ডলফিন ও শুশুক

কালের কবলে ডলফিন ও শুশুক - সংগৃহীত

ইরাবতী ডলফিনটি ধরা পরে রংপুর কুড়িগ্রামের ধরলা নদীতে। দৈনিক নয়া দিগন্ত সূত্রে প্রকাশ, জেলেদের জালে আটকে পড়া বিলুপ্ত প্রজাতির সামুদ্রিক ডলফিনটি দেখা-শুনার দায়িত্ব নিয়েছে রংপুর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। ৪ সেপ্টম্বর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলা শেখ হাসিনা ধরলা সেতুর এক কিলোমিটার পশ্চিমে ধরলা নদীতে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলেন রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের হাড্ডু মিয়াসহ একদল জেলে।

জাল টেনে কিনারে নিয়ে আসার একপর্যায়ে ডলফিনটি লাফালাফি করতে শুরু করে। জেলেরা বড় মাছ মনে করে খুশিতে টেনে তোলেন ডলফিনটি। নতুন জাতের মাছ ভেবে বিক্রির জন্য স্থানীয় বাজারে নিয়ে যায়। স্থানীয় যুবকেরা ডলফিনটি কিনে কোলে করে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের গাড়িতে তুলে দেন। ধরার সময় আঘাতপ্রাপ্তসহ তিন-চার ঘণ্টা পানি ছাড়া অবস্থানের কারণে এটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ভয় ছিল, লোনাপানির সামুদ্রিক দুর্লভ ডলফিনটি বাঁচবে কিনা। রংপুর চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, সর্বোচ্চ পরিচর্চায় ডলফিনটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। বর্তমানে ডলফিনটি রংপুর চিড়িয়াখানার শিশুপার্কের লেকে অবস্থান করছে। কালের কবলে বিলুপ্ত প্রাণীটিকে একনজর দেখার জন্য প্রতিদিন দর্শকের ভিড় বাড়ছেই।

এককালে যা ছিল সত্য এখন তা গল্প। নদীমাতৃক দেশের মানুষ হিসেবে দুই দশক আগেও নদীর বুক চিড়ে ‘ভুস’ করে শূকর ছানার মতো একটা কিছু ভেসে উঠতে দেখে থাকবেন। শৈশবে নদীর তীরে বসে ভুস করে ভেসে ওঠা প্রাণীটির মাথা গুণতাম। প্রাণীটির স্থানীয় পরিচয় ‘হুম মাছ’। আসল নাম শুশুক- আর কাব্যিক পরিচয় গাঙ্গেয় ডলফিন। প্রাণীটি এখন আর দেখা মেলে না। জানা যায় উইপোকার মতো বিস্ময়কর প্রাণী শুশুকও। হুম মাছ স্তন্যপায়ী মূক-বাকহীন ও জন্মান্ধ। উইপোকা জন্মান্ধ হয়েও মাটির তলায় অন্ধকার জগতে চক্ষুষ্কমানের চেয়েও বিস্ময়কর কাজ করতে পারেÑ তেমনি গভীর জলের তলায় বিস্ময়কর কাজ করতে পারত শুশুকও। ডলফিন বাস করে লোনা পানিতে আর শুশুক মিঠা পানির প্রাণী। মিঠা পানির শুশুকদের আরেক পরিচয় গাঙ্গেয় ডলফিন বা গ্যানজেস ডলফিন; আর বৈজ্ঞানিক নাম প্লাটিনিস্তা বা গাঙ্গেটিকা।

শুশুকের ফুলকা নেই। সেহেতু অক্সিজেন গ্রহণের জন্য মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে। জলবাষ্প ছেড়ে অক্সিজেন নিয়ে আবার তলিয়ে যায়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কর্তফুলী, বুড়িগঙ্গা ও সাঙ্গুই ছিল এদের প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র। এসব নদীতে একসময় কুমিরও বাস করত। দিদিমার কাছে শুনেছি, আমাদের পাশের বাড়ির কাসেমালীর বাবাকে কুমির নিয়ে গিয়েছিল। উদ্ধার করার জন্য শিকারি ডাকা হয়েছিল। কুমির শিকারি তীর-বল্লম নিয়ে সারা দিন নদীর কূলেকূলে হেঁটেও কুমিরের শুলুক-সন্ধান করতে পারেননি। চার দিন পর গলিত লাশসহ ছিন্নবস্ত্র পাওয়া যায় নদীর অপর পাড়ের কাদাজলে। নদীতে কুমির দেখিনি- দেখেছি অসংখ্য শুশুক। শুশুক চক্ষুষ্মান না হওয়ায় আলট্রাসনিক বা হাইপারসনিক শব্দ করে থাকে।

সেই শব্দতরঙ্গের প্রতিধ্বনি শুনে বাদুরের মতো পদ্ধতিতে চলাফেরা ও শিকারের কাজ করে। আরেক দল বৈজ্ঞানিকের ধারণা, পানিতে কটকট জাতীয় শব্দ করে ওই পানির মধ্যেই এক ধরনের কম্পন সৃষ্টি করে। এরা শিকারের কৌশল হিসেবে এক জোড়া ফিন থেকে এক ধরনের তেল নিঃসরণ করে। তেলের গন্ধে অন্যান্য মাছ আকৃষ্ট হয়ে কাছে আসে।
কখনো একা কখনো দল বেঁধে চলাচল করে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিশু থাকে মা শুশুকের সাথে। জন্মের সময় শিশু শুশুকের গায়ের রঙ ঠিক চকলেটের মতো গাঢ় বাদামি রঙের। যত বড় হয় গায়ের রঙ হয় তত বাদামি ও মসৃণ। স্ত্রী শুশুক পুরুষ শুশুকের চেয়ে আকারে বড়। ১০-১১ মাস গর্ভ ধারণ শেষে দুই-তিন বছর পর মা শুশুক একটি বাচ্চা প্রসব করে থাকে। বাচ্চা অবস্থায় শিশু শুশুক মায়ের সামনে, পিঠের ওপর কিংবা পেটের নিচে অবস্থানসহ সাথে সাথেই থাকে। নিজেরা শিকার ধরার উপযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত মায়ের দ্ধু পান করে। এরা ২৬-২৮ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

শুশুক যখন মাছ ধাওয়া করত তখন প্রাণ বাঁচাতে মাছ কখনো কখনো লাফ দিয়ে পানির উপরে চলে আসেÑ মাছের সাথে শুশুকও উঠে আসে পানির উপরে। মাছের সাথে পানির কয়েক ফুট উপরে উঠে আসার দৃশ্য আমাদের দেশে মিঠা পানিতে আর দেখা যাবে না। এরা গভীর পানির বাসিন্দা হলেও বর্ষায় শাখা নদী বেয়ে অনেক উজানে চলে আসে। এমনকি শিকার তাড়া করতে করতে কখনো কখনো ঢুকে পড়ে বন্যাকবলিত ফসলের জমিতে। শুষ্ক মওসুমে পানি কমে গেলে ফিরে আসে নিজস্ব আবাসে।

আলীম আজিজ ৬ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক বণিকবার্তায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে গল্পাকারে ডলফিন আর শুশুকের বৈশিষ্ট্যসহ সম্পর্ক নির্ণয় করেছেন। গল্প থেকে জানা যায়, মূক-বাকহীন জন্মান্ধ এই প্রাণীটি ‘বনবিবির বার্তাবাহক’। অনেক বছর আগের কথা। মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়েছিল এক জেলে। চার দিকে প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস। বাতাসের দাপটে নৌকা ভেঙে খানখান। তীব্র স্রোতের টানে ছুটতে ছুটতে গাছের মতো একটা কিছুর সাথে জেলের শরীর আটকে যায়। জ্ঞান থাকাকালে গামছা দিয়ে নিজের শরীরকে গাছের সাথে শক্ত করে বাঁধে। ভয়ঙ্কর ঝড়ের ভয়াল রাত পার হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে দেখতে পায় সামনে বিশাল নারীমূর্তি।

ভয়ে পুনরায় অজ্ঞান হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতেই, ‘আমি বনবিবি, তুমি ভালো মানুষ হলে ভয় নেই। আমার দূত ও বার্তাবাহকরা তোমাকে নিরাপদে পৌঁছে দেবে।’ পরে যে বাহন জেলেকে পৌঁছে দিয়েছিল সে বাহনই ডলফিন। ডলফিনই ছিল বনবিবির দূত ও বার্তাবাহক। সেই পুরাকাল থেকেই ডলফিন ও শুশুক বনবিবির দূত ও বার্তাবাহক হিসেবে বিপদগ্রস্ত নাবিকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে থাকে।

ডলফিন আর শুশুক ঠিক এক নয়। শুশুকের পিঠে ডলফিনের মতো ডানা বা ফিন নেই। আকৃতি ও প্রকৃতির দিক দিয়ে সামান্য পার্থক্য হলেও শুশুক ইরাবতী ডলফিন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ডলফিন আর ইরাবতী ডলফিনের সম্পর্ক জানতে হলে জন অ্যান্ডারসনের গবেষণাকর্মের সাহায্য নেয়া আবশ্যক।

১৯৭০ সালের দিকে জন অ্যান্ডারসন নামক প্রাণীবিজ্ঞানী ও গবেষক ইরাবতী ডলফিনের খোঁজে তরী ভাসান। বার্মা ও দক্ষিণ চীন উপকূল চষেও ইরাবতী ডলফিনের সন্ধান পেলেন না। ভাটি ছেড়ে উজানে আসতেই অ্যান্ডারসন হতবাক। দেখেন, মিঠা পানিতে বাস করছে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিন। মিঠা পানি আর লোনা পানিতে বসবাসরত ডলফিনে সামান্য পার্থক্য। অ্যান্ডারসন এই উপসংহারে পৌঁছলেন যে, ইরাবতী ডলফিন দুই প্রকারের। একটি ওরাকেল্লা ব্রিভেরওসট্রিস অন্যটি ওরাকেল্লা ফ্লুমিনাসিস- সম্পর্কে খালাত ভাইয়ের মতো। একটার পছন্দ লোনা পানি আরেকটার পছন্দ মিঠা পানি। পার্থক্য শারীরিক নয়- আবাসিক। ইরাবতী ডলফিনের যে সম্প্রদায় মিঠা পানির ঘোলা পানিতে বাস করে তারাই গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক। মিঠা পানির ওরাকেল্লা দুনিয়া থেকে মুছে যেতে শুরু করেছে। জানা যায়, সুন্দরবন এলাকা থেকেও অদৃশ্য হতে শুরু করেছে ওরাকেল্লার দল।

ভারতীয় উপমহাদেশে গাঙ্গেজ ও ইরাবতী এই দুই প্রকার রিভার ডলফিন বাস করে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই দুই প্রকারের মধ্যে কোনো প্রভেদ ছিল না। ইরাবতী ডলফিনের মুখের সামনের অংশ লম্বাটে। এরা সাধারণত সাগরের কাছাকাছি বাস করে, এরা পুরাপুরি মিঠা পানির ডলফিন নয়। গাঙ্গেয় ডলফিন তথা শুশুক ((Platanista gangetica) থাকে মূলত গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ঘোলা পানিতে। কয়েক বছর আগে বুড়িগঙ্গায়ও শুশুক দেখা গেছে। যেহেতু এরা পানির উপরে বাতাস থেকে শ্বাস নেয়, সেহেতু নদীর দূষিত পানিও তেমন কোনো অসুবিধা হয় না।

অসুবিধা হলো, পানি অত্যধিক দূষিত হওয়ার ফলে শুশুকের খাওয়ার মতো অন্য কোনো প্রাণী নদীতে বাস করে না। শুশুকের বড় শত্র“ মানুষ ও মনুষ্য সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা। শুশুকের তেল দিয়ে এক প্রকার কবিরাজি ওষুধ তৈরি হয়। এক শ্রেণীর মাছের ঘের মালিক অধিক মাছের জন্য ঘেরে শুশুকের তেল ব্যবহার করে। প্রতি লিটার তেলের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ৭০ দশকের পর থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ এবং অতিমাত্রায় মাছ শিকারের ফলে আশঙ্কাজনকভাবে প্রাণীটি কমতে শুরু করছে।

নদী থেকে বালি উত্তোলনকালে ব্যবহৃত প্রযুক্তির আঘাত, নদীতে প্রদত্ত বাঁধ ইত্যাদি কারণে এদের আবাস বিনষ্ট হওয়ায় আর বাড়ছে না। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারেন্ট জালের অস্তিত্ব জন্মান্ধ শুশুকের হাইপারসনিক রাডারে ঠিক মতো কাজ না করায় আটকে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত শুশুক। তেল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিধন চলছেই। প্রতি বছর ৯ হাজার টন কীট-পতঙ্গ নাশক ও ছয় হাজার টন সার ব্যবহার করা হয় নদীকূলবর্তী জমিতে। এরে নির্যাস পানিতে মেশার ফলে শুশুক শিশুরা এখন আর দম নিতে পারে না। আমাদের শিশুরা আর কোনো দিন শুশুক দেখতে পাবে না।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকাল সূত্রে প্রকাশ, সুন্দরবনের আরো প্রায় ১৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় নদীতে বাড়ানো হচ্ছে বিরল প্রজাতির ডলফিনের অভয়ারণ্য। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সুন্দরবনের ঢাংমারী, চাঁদপাই ও দুধমুখী এলাকার নদীকে ডলফিনের অভয়ারণ্য ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এ তিনটি এলাকার ১০.৭ বর্গকিলোমিটার নদীতে রয়েছে ইরাবতী ডলফিন ও শুশুকের বিচরণ। স্রষ্টার সৃষ্টিতে কোনো কিছুই অকারণ নয়। আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে কোনো বস্তু বা প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার আগে কিছু টের পাওয়া যায় না। যখন পাওয়া যায় তখন আর ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগই থাকে না, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বুঝতে পারার মতো।

লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ