২০ অক্টোবর ২০১৮

রাজনৈতিক সঙ্কট কোন পথে

রাজনৈতিক সঙ্কট কোন পথে - ছবি : সংগৃহীত

দেশের থমথমে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে শঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। এক দিকে সরকার পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অন্য দিকে বিরোধী পক্ষ দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে আন্দোলন ও শক্তি প্রয়োগের কৌশল বিবেচনা করছে। সরকার পক্ষ মনে করছে, উল্লেখযোগ্য কোনো ছাড় না দিয়ে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতার নবায়ন করাটা হবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় বিরোধী ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে না এলে ফলাফল নিশ্চিতভাবে শাসকদলের পক্ষে যাবে। আর যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে তাহলে সিটি করপোরেশনের মতো নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাবে। আর বিরোধী জোট মনে করছে, দেশের মানুষ সুযোগ পেলে ভোটের এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করবে। এ জন্য নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ডাক দিতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে ভয়কে জয় করে।

সরকারি দলের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র একতরফা নির্বাচনে ইতিবাচক ফল পাওয়ার আশাবাদের সাথে সাথে একটি ঝুঁকির শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। এই সূত্র মতে, ঝুঁকিটি হলো যেকোনো পরিস্থিতিতে গণবিস্ফোরণের মতো অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা। এটি হলে সাম্প্রতিক ভিন্ন ইস্যুর দু’টি আন্দোলনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে গণবিস্ফোরণের যে ঘটনা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

সম্প্রতি কোটাবিরোধী আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ ছাত্ররা এত বিপুলভাবে সম্পৃক্ত হয়, শক্তি প্রয়োগ এবং কৌশল কোনোটাই এটি দমনে কার্যকর হয়নি। সরকার দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে ইস্যুটিকে আড়ালে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেও কোনো সুফল পায়নি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারি চাকরির প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে কোটা বিলুপ্ত করার পরিপত্র জারি করতে হয়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। এই আন্দোলনের দাবিটি কোটাবিরোধী আন্দোলনের মতো সুনির্দিষ্ট না হলেও সড়ক নিরাপদ করার ব্যাপারে বেশ কিছু পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হয়েছে। যদিও এই আন্দোলনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কিছু দমনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, ভোটের অধিকারের ব্যাপারে সর্বাত্মক কোনো ঐক্য তৈরি করে আন্দোলনের ডাক দিলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেও পড়তে পারে। আর শেষ মুহূর্তে এ ধরনের কিছু ঘটলে জনপ্রশাসন ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। এ ধরনের কিছু যাতে না ঘটে তার জন্য সরকার রাজপথে জাতীয় ইস্যুর আন্দোলন তৈরির আগে দলীয় ইস্যু নিয়েই যাতে কর্মসূচি আসে সে চেষ্টা করছে। সে জন্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ অক্টোবর। ধারণা করা হচ্ছে, এই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ দণ্ড দেয়া হলে বিএনপি বা ২০ দল রাস্তায় নামবে। এই ইস্যুতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যারা সম্পৃক্ত হয়েছেন তারা সবাই নামবেন না। এতে করে আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমনের সুযোগ পাবে সরকার। আর দমন শেষ হলে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এতে বিএনপির অবস্থা থাকবে পরাজিত ধরনের, যা সরকারি দলের জন্য কৌশলের দিক থেকে অনুকূল হবে।

সরকার পক্ষ যে রাজনৈতিক কৌশলের কথা ভাবছে তার বিপরীতে বিরোধী পক্ষেরও ঘোষিত-অঘোষিত নানা কৌশল রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বিরোধী পক্ষ বিশেষ করে বিএনপির অগ্রাধিকারে রয়েছে সর্বব্যাপী এক জাতীয় ঐক্য। সর্বাধিকসংখ্যক দলকে এই ঐক্যে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা থাকবে তাদের। এ ক্ষেত্রে কিছু দল ও নেতা সরকারের সাথে নানা বন্ধনে আবদ্ধ থাকার বিষয়টিও বিএনপি নেতৃত্বের অজানা নয়। এ অবস্থায় যতটা সম্ভব একটি জাতীয় ঐক্য তৈরি করে সামনে এগোনোর কথা ভাবছে বিএনপি। বৃহত্তর এ ঐক্যের জন্য বিদ্যমান ২০ দলীয় ঐক্য ভেঙে দেয়া তথা সিকি পেতে গিয়ে টাকা হারানোর ঝুঁকি নিতে চায় না বিএনপি। এ কারণে বিকল্প ধারার দুয়েকজন নেতার কার্যক্রমের ব্যাপারে তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।

বিএনপি নেতৃত্ব মনে করে, সারা দেশে সরকারের বিপক্ষে বিপুল জনমত রয়েছে। কিন্তু অবাধ সুষ্ঠু ও অংশীদারিত্বমূলক কার্যকর নির্বাচনের দাবি আদায়ের জন্য জনমত একমাত্র নির্ণয়ক নয়। এ জন্য দেশের ভেতরে-বাইরের প্রভাবশালী পক্ষগুলোর নিয়ামক ভূমিকা রয়েছে। তাদের সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে ছোট দলের বড় নেতাদের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। এ কারণে আন্দোলন এবং পরবর্তী নির্বাচনে ছাড় দিয়ে হলেও জাতীয় ঐক্য গড়তে চায় বিএনপি। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের ন্যূনতম অবস্থান হলো ২০ দলীয় ঐক্য অটুট রেখে বৃহৎ ঐক্য। এ ক্ষেত্রে ২০ দলের জোটবদ্ধ কোনো দলের ব্যাপারে আপত্তি থাকলে যুগপৎ কর্মসূচি প্রদানের বিষয়টিও ভাবছে বিএনপি।

বিএনপির হাইকমান্ড মনে করে, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং মামলা- গ্রেফতার দিয়ে আন্দোলন দমন করতে চায় সরকার। কিন্তু যে আন্দোলনে সাধারণ মানুষ নেমে পড়ে সেখানে সরকারের কিছুই করার থাকে না। এই বিবেচনা থেকে তারা বড় ধরনের উসকানির মুখেও ধৈর্য ধারণ করার নীতি নিতে চাচ্ছে। দলের ফোরামে সিদ্ধান্ত হলে আগামী ১০ অক্টোবর মামলার রায়ের পরে আন্দোলন হতে পারে। তা না হলে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত আন্দোলন আরো পরেও হতে পারে। 

এ দিকে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে কূটনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ মেরুকরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাইছে সেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সরকারের ধারাবাহিকতাকে সমর্থন করছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি দুই দিনের ভারত সফর করেছেন। তার এই সফর নিয়ে ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, ভারত-রাশিয়া সামরিক চুক্তি করলে, ভারতের ওপর বাণিজ্য অবরোধ আনা হবে। 

বাংলাদেশের আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে প্রধান প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। মার্কিন দূতাবাস স্পষ্ট বলছে, বিএনপি অংশ না নিলে ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের এক নৈশভোজে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট বলেছেন, ‘দেশের অন্যতম প্রধান একটি দলকে বাদ দিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না।’ আগামী নির্বাচন যেন ‘সব দলের অংশগ্রহণে’ হয় সে জন্য এখন থেকেই উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দেন বার্নিকাট। 

ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাইছে। তাদের মতে, তিনটি শর্ত পূরণ হলে একটি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে। প্রথমত, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে হবে; যেন দলগুলো অবাধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে জনরায়ের প্রতিফলন ঘটতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র এবং সরকারের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনের পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকবে নির্বাচন কমিশনের কাছে।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কূটনীতিক শিবিরে এখন এক ধরনের বিভক্তি দেখা দিয়েছে। রাশিয়া ও চীন বাংলাদেশের প্রভাবশালী কূটনৈতিক অংশীদার হলেও তারা নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই দুই দেশের অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষে। মিয়ানমার ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহায়তা করছে মূলত পাশ্চাত্য ও মুসলিম জাহান। তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। রাশিয়া-চীন অন্য দেশের গণতন্ত্র নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। ভারতের অবস্থান এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশটি কোন পথে যাবে তা স্পষ্ট নয়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা দু’টি বিকল্প সামনে রেখে দেশটি তার করণীয় বিবেচনা করছে। এই বিকল্পের একটিতে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটিতে রাশিয়ার প্রভাব রয়েছে। তবে দ্রুততম সময়ে তাদের অবস্থান কোন পক্ষে সেটি স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

 


আরো সংবাদ