১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

বড় পদ, ছোট ব্যক্তি

বড় পদ, ছোট ব্যক্তি - ছবি : সংগ্রহ

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আয়োজন ভেঙে দেয়ার পর ইমরান খান একটি টুইটের মাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, যদি ওই প্রতিক্রিয়াটিই বেশ পরিমার্জিতভাবে সবিস্তারে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে ব্যক্ত করতেন, তাহলে সারা বিশ্বের সামনে শুধু ইমরান খান নয়, পাকিস্তানেরও অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যেত।

কিছুদিন আগে সাংবাদিকদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর একটি বৈঠকে খাওয়ার মানিকা ও পাকপত্তনের ডিপিও নিয়ে বেশ কথা হচ্ছিল। এক ঘণ্টা পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোচনা শেষ না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করলাম, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে আপনার না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আরেকবার কি ভেবে দেখা উচিত নয়? কেননা, যদি আপনি যান, তাহলে কাশ্মির ও আফগানিস্তানসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আপনার অবস্থান সম্পর্কে বিশ্ব জানার সুযোগ পাবে। ইমরান খান জবাব না দিতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মুহাম্মাদ কুরাইশি ‘না’ বাচক মাথা হেলানো শুরু করে দেন। খান সাহেব বলেন, আমেরিকায় যেতে একদিন, ভাষণ দানে একদিন, ফিরে আসতে একদিন- এভাবে তিন-চারদিন নষ্ট হয়ে যাবে। আমার কয়েকজন সঙ্গী বলে উঠল, এবার সাধারণ পরিষদের বৈঠকে নরেন্দ্র মোদিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতা অংশগ্রহণ করছেন না। আমি জোর দিয়ে বললাম, আপনি ওখানে মোদির সাথে সাক্ষাৎ করতে যাবেন না; আপনি যাবেন জাতিসঙ্ঘের ফোরামে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরতে। এবার আপনি উর্দুতে বক্তৃতা করে নতুন ধারাও সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু ইমরান বললেন, ওখানে যদি আমার সাথে ট্রাম্পের সাক্ষাৎ হয়ে যায়, আর তিনি আমাকে কিছু বলে ফেলেন, আমিও কিছু তাকে বলে ফেলি, তখন নতুন আরেকটি দেয়াল তৈরি হয়ে যাবে। এ কথা শুনে সবাই হেসে দিলেন। আবার খাওয়ার মানিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

বর্তমান এ সময়ে- যখন ভারত সরকার ইমরানের পক্ষ থেকে দেয়া আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল এবং ভারতের সেনাপ্রধান পাকিস্তানকে শিক্ষা দেয়ার হুমকিও দিয়ে ফেললেন, তখন এই দুটি পারমাণবিক শক্তির দিকে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি নিবদ্ধ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গফুর বেশ পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বলেছেন, যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, আলোচনার মাধ্যমে শান্তি আসে। তবে আলোচনার আগ্রহকে দুর্বলতা ভাবা উচিত নয়। অপর দিকে, প্রধানমন্ত্রী টুইটের মাধ্যমে বলেছেন, বড় পদে বসে ছোট ব্যক্তির চিন্তাভাবনা ছোটই থেকে যায়। কতিপয় বিশ্লেষকের ধারণা, ইমরান খানের টুইটের বাক্যগুলো তার পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে এ অধমের ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইমরান যা বলেছেন, ঠিক বলেছেন। অবশ্য তিনি যদি জাতিসঙ্ঘে নিজেই বক্তৃতা করতে যেতেন, তাহলে বড় পদে বসে থাকা ছোট ব্যক্তি আরো ছোট হয়ে যেত। হতাশার কথা, খান সাহেব এ সুবর্ণ সুযোগ হারিয়েছেন। সাধারণ পরিষদে ২৯ সেপ্টেম্বর শাহ মাহমুদ কুরাইশি বক্তৃতা করার কথা। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তৃতায় শুধু ভারতের পক্ষ থেকে যুদ্ধের হুমকির জবাব দেবেন, তা নয়। বরং তাকে কুলভূষণ যাদবের ব্যাপারেও বিশ্বকে অনেক কিছু বলতে হবে। কেননা কুরাইশি যখন বিরোধী দলে ছিলেন, তখন প্রায়শ এ অভিযোগ করতেন, নওয়াজ শরিফ জাতিসঙ্ঘে কুলভূষণ যাদবের নাম কেন নেননি?

আশা করা যায়, শাহ মুহাম্মদ কুরাইশী জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে যাদবের নাম বারবার উচ্চারণ করবেন। তিনি এ বিষয়টিও উত্থাপন করবেন, নবী করিম হজরত মুহাম্মদ সা:-সহ সব মহান ব্যক্তিদের সম্বন্ধে অবমাননাকর ও ঔদ্ধত্ব্যপূর্ণ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত এবং এ অপরাধের পথ রুদ্ধ করার জন্য আইন প্রণয়নের ওপর জোর দেয়া উচিত। কেননা এ অপরাধ থেকে উগ্রবাদ ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। অপর দিকে, ভারতের পক্ষ থেকে যুদ্ধের হুমকিকে শুধু ঘেউ ঘেউ আওয়াজ মনে করে উপেক্ষা করা সঙ্গত হবে না। এ বাস্তবতায় কোনো সন্দেহ নেই যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সৈনিক ও অফিসাররা আগামীতে স্বদেশের জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখবেন এবং কঠিন সময়ে প্রতিটি মুহূর্তে জাতির আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তবে এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্য প্রদর্শন করা জরুরি। যেভাবে ভারতের সাথে ক্রিকেট ম্যাচে পুরো পাকিস্তানি জাতিকে নিজের দলের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে, ওভাবে ভারতের যুদ্ধের হুমকির পরও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি। আর এ ব্যাপারে পার্লামেন্টকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান বেশ ভেবে-চিন্তেই যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন। ওই হুমকির পেছনে বড় পদে বসে থাকা ওই ছোট ব্যক্তি আছে, যিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজের জাতির ভবিষ্যতকে বাজি ধরতে মোটেও দ্বিধা বোধ করবেন না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাঝে অনেক জটিলতা দেখতে পাচ্ছেন। একদিকে পেট্রলের দাম বৃদ্ধির কারণে তাকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, অপর দিকে তিনি পেট্রল ক্রয়ের জন্য ইরানমুখী হলে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হয়ে যাচ্ছেন। ওদিকে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া ওঁলাদে তার ওপর সাক্ষাৎ আজাব হয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। ওঁলাদে ২০১৬ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওই সময় মোদি প্যারিসে এক ফ্রেঞ্চ কোম্পানি ড্যাসল্ট অ্যাভিয়েশনের কাছ থেকে ৭.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৩৬টি রাফায়েল বিমান ক্রয়ের চুক্তি করেন। ওঁলাদে কিছু দিন আগে এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য প্রকাশ করেন যে, ওই লেনদেনের আগে ভারত সরকার আমাদের বার্তা প্রেরণ করে জানায়, আপনারা আমাদের এ বিমান রিলায়েন্স ডিফেন্স নামের কোম্পানির মাধ্যমে বিক্রয় করবেন, যা মোদির গুজরাটি বন্ধু অনিল আম্বানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।

এর আগে আম্বানি সাবেক প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের পার্টনার জুলি গাইটের একটি ফিল্মে অর্থও বিনিয়োগ করেছিলেন। ভারত সরকার ও ড্যাসল্ট ওঁলাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর ভারতের মিডিয়া গ্র“প ইন্ডিয়া টুডে ওঁলাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী অ্যানিটুন রগ্যাটের সাথে যোগাযোগ করে এবং এই সাক্ষাৎকারের প্রমাণ চায়। রগ্যাট এ সাক্ষাৎকার মিডিয়ামার্ট ওয়েবসাইটের জন্য গ্রহণ করেছিলেন। কেননা কোনো বড় পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এ প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের ওপর সংবাদ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। রগ্যাট বলেন, তিনি ওঁলাদের সাথে একবার নয়, দুইবার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। আর এটা একেবারেই মিথ্যা কথা যে, এত বড় বাণিজ্যে ভারত সরকারের কোনোই ভূমিকা ছিল না। এ কেলেঙ্কারি ভারতের বিরোধীদলকে জোটবদ্ধ করেছে, আর জোটবদ্ধ সরকারকে বিভক্ত করে দিয়েছে। জোট সরকারের অন্তর্ভুক্ত শিবসেনা ২০১৯ সালের নির্বাচনে একাই লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বিজেপির ভেতরেই বেশ বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি বাহ্যত মোদির অনেক প্রিয় মানুষ। তবে বিজেপির ভেতর একটি পক্ষ ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী বানাতে চাচ্ছে তাকে। বিহারে মিত্র জনতা দল ইউনাইটেডের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও প্রধানমন্ত্রী পদে লড়াই করবেন। জম্মু-কাশ্মিরে বিজেপির জোটভুক্ত দল পিডিপি লাঞ্ছিত হয়েছে।

বিজেপির অভ্যন্তরীণ সঙ্কট এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, এ বছর দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনগুলো স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। অমিত শাহকে নির্বাচন ছাড়াই আরো এক বছরের জন্য দলের প্রধান বানিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে তিনি দলের ভেতরে মোদির বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভকে প্রতিহত করতে পারেন। এ সমস্যাগুলো মোদিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আর এসব সমস্যা থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনার পরিবর্তে যুদ্ধের রাস্তা অবলম্বন করেছেন। যদি মোদির জন্য সমস্যা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে, তাহলে বড় পদে বসে থাকা ছোট ব্যক্তি যা ইচ্ছা তাই করে ফেলতে পারেন। দুইটি বড় অস্ত্র নির্মাণকারী কোম্পানির এক অস্বচ্ছ ও সন্দেহযুক্ত বাণিজ্যের উদর থেকে জন্ম নেয়া কেলেঙ্কারি পাক-ভারত উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে; বাড়তি উত্তেজনা ও বাড়তি প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের পথকে সুগম করবে। সুতরাং পাকিস্তানকে সর্বদা সতর্ক ও সচেতন থাকা দরকার। কেননা দক্ষিণ এশিয়াতে উত্তেজনা দ্বারা সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়, তবে কিছু বড় পুঁজিবাদীর বেশ লাভ হয়।

* হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
[email protected]


আরো সংবাদ