২২ অক্টোবর ২০১৮

নাজুক অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

নাজুক অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক - ছবি : সংগৃহীত

অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় চলে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক। পরিস্থিতি এমন যে, সরকারি ভালো ব্যাংকও এখন খারাপের দিকে চলে গেছে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ সরকারি দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক জনতা। এক বছর আগে যে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত মূলধন ছিল, এখন সেই ব্যাংকেই মূলধন ঘাটতি ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের সিকি ভাগও আদায় করতে পারছে না। দুর্নীতি, জালিয়াতির মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদান এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতাকেই সরকারি ব্যাংকগুলোর নাজুক অবস্থার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। আগামীতে এই ব্যাংকগুলোকে ভালো দিকে নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর হবে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকেরা।

জানা গেছে, চলতি বছর অনেক ঘটা করে বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ের এক টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। এই লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের সাথে বছর শুরুতে সমঝোতা স্মারকও সই (এমওইউ) করা হয়। এই টার্গেট অনুযায়ী চলতি বছর শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে ৬০০ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ৪৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময় এসে দেখা গেছে এই টার্গেট পূরণ তো দূরের কথা এর ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই চিত্রটি ভালোভাবে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। 

গত জুন মাস পর্যন্ত শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে অর্ধেক ঋণ আদায়ের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন, অর্ধেক তো দূরে থাক তার ধারেকাছেও ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, ছয় মাসে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে সোনালী ব্যাংক অর্থ আদায় করেছে টার্গেটের ৩ দশমিক ২২ শতাংশ, জনতা ব্যাংক ১৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংক আদায় করেছে টার্গেটের শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ। 
সমঝোতা স্মারকে চলতি বছর রাষ্ট্র্রায়ত্ত ৫ ব্যাংককে ২০ শীর্ষ ঋণখেলাপি বাদে অন্য খেলাপিদের কাছ থেকেও আদায়ের টার্গেট দেয়া রয়েছে। এই টার্গেট অনুযায়ী এই ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু ছয় মাসে আদায়ের হার ১৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের টার্গেট এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায়ের হার ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের টার্গেট ৮০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকের টার্গেট ৬০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার মাত্র ১১ শতাংশ। আর বেসিক ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট রয়েছে ৭১৫ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায়ের হার ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। 

এখানেই শেষ নয়, ঋণ আদায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আরো ব্যর্থতার পরিচয় পাওয়া গেছে, ঋণ অবলোপন থেকে আদায়ের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে। যে প্রক্রিয়ায় ঋণ অবলোপন হচ্ছে তাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্সশিট ভালো দেখানোর জন্য অনেক কু-ঋণ তাদের মূল হিসাব থেকে বাদ দিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো যায়। কিন্তু এরপরও ব্যাংকগুলো এই অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে অবলোপনকৃত ঋণ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট ধরা রয়েছে এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এই হিসেবে ছয় মাসে (জুন পর্যন্ত) আদায় হওয়ার কথা ছিল ৫০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। কিন্তু ছয় মাসে প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। একইভাবে জনতা ব্যাংকের টার্গেট ৩২৮ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায় ১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের টার্গেট ৮১০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায় ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের টার্গেট ছিল ১৫৩ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। 

খেলাপি ঋণ আদায়ে চরম ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত যার পরিমাণ ৮ হাজার ৯ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের। এ সময় ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, গত বছর একই সময় এই ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল ১৭ কোটি টাকা। ছয় মাসে অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি ব্যাংকের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজনীতিবিদ-আমলা-ব্যাংকারদের যোগসাজশে এক অশুভ শক্তি গড়ে উঠেছে ব্যাংকি খাতে। এদের কারণে যারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য নয়, তাদেরকে বিশাল অঙ্কের ঋণ দেয়া হয়েছে। ফলে এসব ঋণ আদায় করাও সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়া হলে সামনে আরো খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।


আরো সংবাদ