২২ অক্টোবর ২০১৮

ইসরাইল-সৌদি আরব সম্পর্ক কতটুকু স্বাভাবিক?

ইসরাইল-সৌদি আরব সম্পর্ক কতটুকু স্বাভাবিক? - ছবি : সংগ্রহ

আরব অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশের সাথে তেলআবিবের সম্পর্ক প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে, সৌদি আরবের সুস্পষ্ট উদাহরণ টেনে এমন খবর চাউর করার প্রত্যেকটি সুযোগ কাজে লাগান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার খুব কাছের মানুষরাই বলছেন, পর্যবেক্ষকরা কেবল বরফ খণ্ডের ওপরের অংশ দেখেই তেলআবিব ও রিয়াদের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।

লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, সৌদি আরবের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার খবরটি রিয়াদ কখনোই অস্বীকার করেনি। ইসরাইলের সাথে সম্পর্কই সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতির সরল সমীকরণ নয়। এটি স্পষ্ট কোনো লক্ষ্যও নির্দেশ করে না, যদিও তাদের পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থানগুলো কখনোই প্রকাশ করে না। এর অর্থ হলো, সৌদি-ইসরাইল চুক্তির কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতেই হবে, তা সৌদি আরবের স্বার্থেই। কেননা, আরব বিশ্বের অস্থির সময়ে নিজের পক্ষে দল ভারী করতে ইসরাইলকে চায় সৌদি আরব এবং তাদের প্রভাবও কাজে লাগাতে চায় দেশটি। এটাও ঠিক, ইরানকে ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয় এবং এই অঞ্চলে ইরানের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাব বিস্তার রোধ করাও সম্ভব নয়।

কোনো সন্দেহ নেই যে, সৌদি আরবের সাথে এ ধরনের চুক্তির সুফল ভোগ করবে ইসরাইলও। ইসরাইলের সাথে একটি কমন গ্রাউন্ড বা উভয়ের স্বার্থসংশিষ্ট একটি প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য সৌদি নেতাদের তৎপরতার অর্থ হলো, অন্যদের মতো ইসরাইলও এ সঙ্কট সমাধানের একটি অংশ। ফিলিস্তিনের সাথে দীর্ঘ দিনের সঙ্ঘাতে একটি আরব দেশের পক্ষ থেকে এমন কৃতজ্ঞতা ইসরাইল আগে কখনো পায়নি। সৌদি নেতারা বিশ্বাস করেন, ইসরাইলের সাথে এমন চুক্তি ইরানকে চটিয়ে দেবে। এর ফলে, সৌদি আরবের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে লড়বে ইসরাইল। আর এতে ইরানকে শায়েস্তা করা সহজ হবে। তবে মনে হয়, এমনটি কখনোই হবে না। কেননা ইরানের সাথে ইসরাইলের যে দ্বন্দ্ব, তা খুব পরিষ্কার। আর ইসরাইল এর জন্য সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীলও নয়। ইসরাইল এ ক্ষেত্রে একটি সীমারেখা চিহ্নিত করে রেখেছে। ইরান যদি এ সীমা লঙ্ঘন করে তবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে তারা প্রস্তুত। সাত বছর ধরে সিরিয়ায় সেটাই হয়ে আসছে।

এমনিতেই ফিলিস্তিনিদের নানাভাবে অধিকার বঞ্চিত করার ঘটনাগুলোতে সৌদি আরবের নীরব অবস্থান চায় ইসরাইল। তারপরও আরব বিশ্বের কেন্দ্রীয় একটি দেশের পক্ষ থেকে এমন একটি জটিল স্বীকৃতি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আরো হতাশা বিস্তারে ইসরাইলের জন্য আরো সহায়ক হবে। এই অঞ্চলের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে ইসরাইল বেশ অবগত। কেননা, তারা ভালো করেই জানে, সৌদি আরব থেকে শুরু করে বেশ কিছু আরব সরকারের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যুটি গুরুত্বের দিক দিয়ে এখন তলানিতে। সে কারণেই সৌদি-ইসরাইল চুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইসরাইলের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি সহজ করতে এবং শর্তহীন ছাড় দিতে ফিলিস্তিনিদের ওপর আরো চাপ প্রয়োগ করার জন্য সৌদি আরব আরো উৎসাহিত হবে।

কিছু দিন আগে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশলে ইয়ালন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন যা তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি ইসরাইলের সাথে চুক্তির বিষয়ে সৌদি আরবের আগ্রহ নিয়ে আলোচনা করেন। তার মতে, ইরানের সামনে নিজের দুর্বলতা ঢাকা ছাড়া সৌদি আরবের আর কোনো চাহিদা নেই। এ কারণেই ইরানকে টেক্কা দিতে ইসরাইলের সাথে চুক্তিতে সৌদি আরব আগ্রহী। এই যুক্তি মেনে নিলে, ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়ায়ও সৌদি আরব ভূমিকা রাখতে পারত, কিন্তু তারা আমাদের এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি যে, প্রক্রিয়াটি কিভাবে হতে পারে। আরবদের উত্থাপিত শান্তি প্রস্তাবের সবই এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানও ইসরাইল প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যভাবে বললে, ইসরাইল এমন একটি সহযোগী আরব দেশ খুঁজছে, যারা এই শান্তিপ্রক্রিয়া বন্ধ করাকেও সমর্থন দেবে। সেই সাথে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থসংশিষ্ট বিষয় বাদ দিয়ে ইসরাইলকে ইহুদিবাদী কার্যক্রম সম্প্রসারণেও জোগাবে সমর্থন।

পরিশেষে বলা যায়, লাভ-ক্ষতির বিষয় মাথায় রাখলে, সৌদি আরবের মতো বড় ও সম্মানজনক একটি দেশের সাথে ইসরাইলের যেকোনো প্রকার স্বাভাবিক সম্পর্ক তেলআবিবকেই লাভবান করবে। মনে হয় না যে, আরব-ইসরাইল সঙ্ঘাত বন্ধের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ইসরাইলকে বোঝানোর জন্য এমন চুক্তি করার মতো কোনো বিষয় সৌদি আরবের অ্যাজেন্ডাগুলোর মধ্যে আছে। বরং ফিলিস্তিন ইস্যুতে রিয়াদ যে তেলআবিবের সাথে একমত পোষণ করবে; এ কথাটি ইসরাইল ও সৌদি নেতারা ভালো করেই জানেন।
লেখক : রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক, নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘মিডল ইস্ট মনিটর’ থেকে ভাষান্তর- মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম


আরো সংবাদ