১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি

হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি -

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত, অভিজ্ঞ, যদিও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তিনি অনেক উচ্চমানের বই রচনা করে গেছেন, যার মধ্যে চার খণ্ডে সমাপ্ত ‘এ হিস্ট্রি অব দ্য ইংলিশ স্পিকিং পিপলস’ অন্যতম। এ গ্রন্থের সূচনায় তিনি চারটি আপ্তবাক্য যোগ করেছেন, যেগুলো হলো- ০১. ‘ইন ওয়ার রেজলিউশন’ ০২. ‘ইন ভিক্ট্রি ম্যাগনেনিমিটি’ ০৩. ‘ইন ডিফিট ডিফাইয়েন্স’ এবং ০৪. ‘ইন পিস গুড ওইল’। বইটিতে সিজারের ব্রিটেন অভিযান থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু পর্যন্ত কালের ইতিবৃত্ত বিবৃত হয়েছে।

তবে সেটা এখানে আলোচ্য নয়। আমি এই গ্রন্থে উল্লিখিত আপ্তবাক্যগুলোর প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যুদ্ধ হয়, এর জয়-পরাজয়ও ক্ষেত্রবিশেষে নির্ধারিত হয় এবং এর জয়-পরাজয়ের ইতিহাস বিজয়ীরাই লিখে। এটা সত্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি বিজয়ী হলে এ যুদ্ধের ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতো। ঠিক তেমনি ১৯৭১-এর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতসহ মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হলে এর ইতিহাসও আজকের মতো করে আমাদের মুখে মুখে ফিরত না। ইতিহাস ভিন্ন কথা বলত। বাংলাদেশ যেহেতু যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে, তাই চার্চিলের ভাষায় বাংলাদেশীদের ‘ম্যাগনেনিমাস’ই হওয়াই উচিত ও রুচিসম্মত ছিল।


আমাদের নবী করিম সা: মক্কা বিজয়ের পর তার অহিংস চরিত্র মাধুর্যে বিমোহিত হয়ে মক্কাবাসী দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি কারো ওপর কোনো প্রতিশোধ নেননি। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। নবী করিম সা:-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করা মুসলমান হিসেবে আমাদের জন্য সুন্নত। বাংলাদেশ বিজয়ের পর আমরা কী তা অনুসরণ করতে পারতাম না? কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি। কারণ, এ যুদ্ধ বিজয় আমাদের একক মদদে হয়নি। সাথে প্রবলভাবে ছিল মুসলমানদের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ভারত। চিরশত্র“ পাকিস্তানও মুসলমানদের ভারত অভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে। তাই এ যুদ্ধের প্রতিপক্ষকে বিজয়ীরা পাকিস্তানি ও পাকিস্তানের দোসর বলে চিহ্নিত করল। বিজয়ীদের এ তত্ত্বের তোড়ে ‘ইন ভিক্ট্রি ম্যাগনেনিমিটি’ আপ্তবাক্যটি ভেসে গেল। যে কারণে বিজয়ের প্রথম থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে যে হিংসা ও প্রতিশোধের আগুন প্রজ্জ্বলিত হলো তা আজ সাতচল্লিশ বছরেও নিবল না।

মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে ও যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সংক্ষিপ্ত, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠভাবে যথার্থই বলেন : ‘১৯৬৬ থেকে ১৯৭১-এর মার্চের মাঝামাঝি সময়ে, দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আবহাওয়ায় এ দেশের শহরে-বন্দরে-গ্রামে একদল তরুণ নেতার জন্ম ঘটতে শুরু করে। মিছিলে, বিক্ষোভে, জনসভায় তাদের হাজার হাজার জ্বালাময়ী ভাষণ কোটি কোটি হৃদয়কে আগ্নেয় দীপ্তিতে প্রজ্জ্বলিত করেছিল। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের সামরিক অভিঘাত সেদিনের সেই ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ওপর আচমকা ছিটিয়ে দেয় স্বস্ত্যয়নের জলধারা। তাদের সব উদ্দীপনা স্তব্ধ হয়ে যায় চোখের পলকে, সারাটা জাতির জীবন থেকে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায় রাতারাতি; তাদের ন্যূনতম অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সবখান থেকে, যেন তারা ছিল না কেউ কোনোদিন এ দেশে কোথাও। দেশের এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে যারা হতে পারত জাতির শেষতম ধারক, অন্য একটি দেশের রাস্তায় তাদের সব আস্ফালন তখন বেদনাময় আত্মবিক্রয়ে অবসিত। যুদ্ধের অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ ততদিনে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছে প্রতিটি দেশপ্রেমিক হৃদয়।

জাতির এ দুঃসময়ে একটা অভাবিত ব্যাপার দেখতে পেল দ্বিধাপন্ন দেশবাসী; দেশের অসংখ্য সুদূর পল্লীর অজ্ঞাত বুকের ভেতর থেকে তারা জেগে উঠতে দেখল হাজার হাজার নিষ্পাপ নিরপরাধ এক ধরনের অপরিচিত যুবককে, দেশের বিদগ্ধ নাগরিকেরা তাদের কোনোদিন আগে দেখেনি। গ্রামবাংলার মতোই তাদের হৃদয় নির্বোধ এবং লাঞ্ছনা-ব্যথিত। সেই সঙ্কটাপন্ন সময়ে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখা দিলো তারা সেদিন। তাদের মূল্যহীন জীবন ও রক্তে জাতিকে উপহার দিলো বেদনার্জিত স্বাধীনতা। যুদ্ধ শেষ না হতেই এই নির্বোধ যুবকেরা টের পেল এ বিজয় তাদের জন্য নয়। দেখতে না দেখতেই আগের সেই বাকসর্বস্ব পলাতক নেতারা মুক্তিযোদ্ধার বেশে প্রবেশ করল জাতির রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে। ওই নিষ্পাপ সরল যোদ্ধাদের দীর্ঘশ্বাসের ওপর দিয়ে তাদেরই সামনে জয় করে নিলো এই নগরী আর জাতির সব সম্ভাবনা। নিঃশব্দে মøানমুখে ওই সব নিরপরাধ যুবকেরা মুছে গেল বাংলার বুকের ওপর থেকে- ঠিক যেভাবে তারা একদিন জেগে উঠেছিল, সেভাবেইÑ ভুল দেশপ্রেমিকদের অলজ্জ স্বার্থলিপ্সার মুখে জাতীয় সংগ্রামের সমস্ত গৌরব আর অশ্র“ লজ্জিত হয়ে এল। সেই লজ্জা বাড়তে বাড়তে হয়ে উঠল জাতীয় অসম্মানের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত আত্মোৎসর্গ এসব রাষ্ট্রীয় দস্যুদের পায়ের নিচে আজো অশ্র“পাতরত। আমার জাতির নিয়তি আর কতবার ফিরে ফিরে এভাবে লজ্জিত হবে, হে বিধাতা!’ (২০.৭. ৯০, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বিস্রস্ত জার্র্নাল : ১৯৯৩, পৃষ্ঠা, ৫০-৫১)

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের পক্ষে জনসমর্থন ছিল একাট্টা। যুদ্ধকালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশীদের পাকিস্তানি সেনাদের হাওলায় পেছনে ফেলে প্রায় এক কোটি অমুসলিমের সাথে করে ভারতে চলে যায়। যুদ্ধের পর তারা দেশে ফিরে আসে। তবে যুদ্ধকালে মুসলিম দলগুলো যারা ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশে একটি আসনও পায়নি, তারা আওয়ামী লীগের পেছনে ফেলে যাওয়া বাংলাদেশের জনগণের নেতৃত্বে দাঁড়িয়ে তাদের পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করে। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস, যুদ্ধ শেষে এ নেতারাই পরিগণিত হলেন দেশদ্রোহী বলে, আর পলাতক নেতারা দেশে ফিরে হলেন দেশপ্রেমিক! আর আক্ষরিক অর্থেই যারা মুক্তিযোদ্ধা, যাদের কথা অধ্যাপক সায়ীদ বলেছেন, তারা হলেন বিলুপ্ত। এখানে একটি সত্য উল্লেখ্য, এই সুন্দর বাংলাদেশের মুসলমান জনগণ কোনো কালেই তাদের নিজ স্বাধীন জাতীয় সত্তাকে বিকশিত করতে পারেনি- না পাকিস্তান আমলে, না বাংলাদেশ আমলে।

পাকিস্তান আমলে সংখ্যালঘু উর্দুভাষীরা প্রভাব বিস্তার করেছে, আর বাংলাদেশ আমলে প্রভাব বিস্তার করছে সংখ্যালঘু সনাতন ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী এবং ভারতপন্থীরা। তবে উর্দুভাষীরা মুসলমান ছিল বিধায় পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রকৃতার্থে না ছিল পাকিস্তানের অনুগত, না তারা মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের প্রতি আন্তরিক; ভারতীয় আধিপত্যের প্রতি তাদের সমর্থন সুবিধিত- এটা তাদের পাকিস্তান আমলেও ছিল এবং এখনো আছে। ভারতকে তারা নিজেদের রক্ষক ও শক্তি বিবেচনা করে। ভারতও তাদের হাতে রাখে ও স্বার্থে লাগায়। যে কারণে বাংলাদেশী নেতারা দ্বিধাবিভক্ত। একপক্ষ বাংলাদেশের মুসলমানদের স্বাধীন আত্মবিকাশের পক্ষে বলে ভারতের বিরাগভাজন এবং অপরপক্ষ যুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল বলে ভারতের অনুগ্রহপ্রাপ্ত। গোলটা বেধেছে এখানেই।

আওয়ামী লীগ ও এর সমমনা দলগুলো কথায় কথায় এদের প্রতিপক্ষকে সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী ও মৌলবাদী বলে গালি দিয়ে বাংলাদেশের স্থলভাগের তিনদিক থেকে ঘিরে থাকা বিশাল ও প্রতাপান্বিত হিন্দুত্ববাদী ভারতকে খুশি রাখতে চায়। যদিও ভারত তাদের বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অতিরিক্ত কিছু না দিয়েই এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অনেক কিছুই আদায় করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ এতেই মহাখুশি। ভারতকে মুরব্বি জ্ঞানে তারা বাংলাদেশের ওপর ভারতের হাই-হ্যান্ডেডনেসের কোনো প্রতিবাদ করে না। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও তাতে খুশি থাকে। বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য ভারতের কোনো মাথাব্যথা নেই, তবে সংখ্যালঘুদের স্বার্থহানির অভিযোগ তুলে ভারতের কোনো কোনো হিন্দুত্ববাদী নেতা বাংলাদেশ দখল করারও হুমকি দেন (দেখুন : নয়া দিগন্ত, ২ অক্টোবর ২০১৮, পৃষ্ঠা ১, কলাম ২ ও পৃষ্ঠা ২, কলাম ৩)।

এ পরিস্থিতিতিতে ভারতের অনুগত বাংলাদেশী দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা কি সহজ কথা! তাই প্রতিপক্ষের প্রতি তাদের দেহের ও মুখের ভাষা এত উদ্ধত ও নোংরা। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে তারা তোয়াক্কা করেন না। নিজেদের মানি ও মাসল পাওয়ারের জোরে ক্ষমতায় যাওয়া ও তা আঁকড়ে রাখাই তাদের পছন্দ। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এরা নানা অপকৌশল আঁটেন। মুক্তিযুদ্ধ গেল সাতচল্লিশ বছর হলো, তবু দেশে শান্তি সুদূরপরাহত। এদের পরস্পরের প্রতি শান্তিকালীন ’গুডউইল’ কোথা থেকে সৃষ্টি হবে?

বাংলাদেশের বড় দু’টি দলের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে এ অসম প্রতিযোগিতা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশীদের হস্তক্ষেপ গ্রহণের পথ সুগম করে দেয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এ বিষয়ে ক্ষমতালোভী দলগুলো উদ্বিগ্ন তো নয়ই, উপরন্তু নিজেদের সৃষ্ট জাতীয় সঙ্কট নিরসনকল্পে বিদেশীদের দুয়ারে ধরনা দেয়া তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। দেশ পরিচালনায় নিজেদের যোগ্যতার বিদেশী সার্টিফিকেট আদায়ের জন্য ক্ষমতাসীন দল হন্যে হয়ে ছুটে। নিজেদের যোগ্যতার প্রতি দেশের জনগণের মূল্যায়নের অপেক্ষা ও তোয়াক্কা তারা করে না। শাসক দল নানাবিধ কৌশল ও কায়দা-কানুন করে দেশের জনগণকে দেশের শাসক নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। তাই তাদের ক্ষমতার লড়াই থেকে জনগণ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে।

এ সুযোগে দলগুলো একে অপরকে খোঁটা দেয় ‘তোমাদের সাথে কেউ নেই’। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বুঝা যেত, জনগণ কার সাথে আছে। শাসক দল জনগণ তাদের সাথে আছে দাবি করলেও নির্বাচন ব্যবস্থার এমন একটি অবস্থা করে রেখেছে যে জনগণের ভূমিকা সেখানে গৌণ, তাদের অর্থ ও পেশিশক্তির চালটাই মুখ্য। মোট কথা, দেশে এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে রাজনৈতিক যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এ যুদ্ধে কারো ’ভিক্ট্রি’ নেই, তাই উভয় পক্ষের সঙ্কল্প বা ‘রেজলিউশন’ই প্রধান্য পাচ্ছে, সমাধান নয়। তাই দেশে যেহেতু শান্তি নেই, দেশের জনগণের প্রতি আদের কারো কোনো সুভেচ্ছা বা ’গুডউইল’ও নেই। এখন প্রবল একের প্রতি অপরের ’ডিফাইয়েন্স’ মনোভাব।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার


আরো সংবাদ