১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

লেবাননে রাজনৈতিক সঙ্কট

সাদ হারিরি ও মিসেল ওউন - ছবি : এএফপি

লেবাননে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে। মধ্যে গত ৬ মে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকার গঠনে ব্যর্থতার কারণে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে এই সঙ্কট চলছে। এর আগে দেশটিতে আড়াই বছর ধরে কোনো প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের পদটি শূন্য ছিল। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত ছিল। আমরা জানি, দেশটি ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর দেশটিতে ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছিল। কিন্তু এখন আবার লেবাননের ভবিষ্যৎ মনে হয় কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে।

এ দিকে দেশটির মনোনীত প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি বলেছেন, শিগগির একটি নতুন সরকার গঠনের ব্যাপারে তিনি এখনো আশাবাদী। তবে তার এই আশাবাদের উৎস কী তা কেউ জানে না।

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় গোত্রের সমন্বয়ে একটি জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে লেবানন পরিচালিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন দল, গোত্র, ধর্মীয় গ্রুপ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দরকষাকষির মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক চুক্তি বা সমঝোতা ছাড়া লেবাননে সরকার গঠন করা অসম্ভব। তাই প্রতিটি পক্ষকে সন্তুষ্ট করে কবে এই সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হবে তা বলা কঠিন। দেশটিতে এখন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন এবং জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সেখানে একটি পার্লামেন্ট গঠিত হয়েছে। দেশকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য সরকার গঠন করা এখন অপরিহার্য। লেবানন এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। দেশটির অর্থনীতি ভালো অবস্থায় নেই। খারাপ ঋণসহ অন্যান্য কারণে অর্থনীতি এখন স্থবির। দরজার ওপারেই সিরীয় যুদ্ধ। এ ছাড়া ইসরাইল ও কয়েকটি আরব দেশের অস্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রভাবও সরাসরি লেবাননের ওপর এসে পড়ছে।

লেবাননের রাজনীতিবিদদের বাস্তবতা উপলব্ধি করে জেগে উঠতে হবে। জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া পার্লামেন্টকে নিয়মিত অধিবেশনে বসে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। একটি দল বা গোষ্ঠীর কাছে সরকার গঠনপ্রক্রিয়া জিম্মি হয়ে থাকলে চলবে না। লেবাননে রয়েছে মিসেল আউনের নেতৃত্বাধীন ফ্রি পেট্রিওটিক মুভমেন্ট (এফপিএম) দলÑ এটি একটি বড় দল। বর্তমান কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির নেতৃত্বাধীন আল মুসতাকবাল পার্টিÑ এটিও একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। এ ছাড়া ওয়ালিদ জানব্লাটের নেতৃত্বাধীন প্রগ্রেসিভ সোস্যালিস্ট পার্টি এবং সামির গিগার নেতৃত্বাধীন লেবানিজ ফোর্সেট পার্টির মতো ছোট ছোট দলও রয়েছে। জানা গেছে, লেবাননের নতুন সরকার গঠনের পথে ছোট দলগুলো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ওয়ালিদের প্রগ্রেসিভ সোস্যালিস্ট পার্ট পার্লামেন্টে ৯টি আসন পেলেও তাদের দল থেকে অধিক মন্ত্রী করার দাবিতে সরকার গঠনে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। অপর দল লেবানিজ ফোর্সেস পার্টিও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ান পার্টি থেকে বেশি মন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার দাবি জানাচ্ছে।

লেবাননের রাজনীতিতে ১৮টি গোষ্ঠী রয়েছে। এসব গোষ্ঠী লেবাননের রাজনীতিতে বিভাজন সৃষ্টি করে রেখেছে। আবার শিয়া ভোটকে কেন্দ্র করেও বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। পার্লামেন্ট স্পিকার নবী বারি সম্প্রতি পুনরায় পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করার কথা ভাবছেন। দুই দিনের এই অধিবেশনের মাধ্যমে খসড়া আইন প্রণয়নের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হবে। খসড়া আইনটি নিয়ে ইতোমধ্যেই কমিটি পর্যায়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। লেবাননের সংবিধানের ৬৯ নম্বর ধারা ব্যবহার করে বারি তার পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকার ক্ষমতা আছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, কার্যকর সরকারের অনুপস্থিতিতে এটা হচ্ছে একটি নির্বাহী সংস্থা। পার্লামেন্ট অধিবেশনের মাধ্যমে ডাটা প্রটেকশন, ওয়াস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং দুর্নীতি দমনসহ পাঁচটি বিল পাস করেছে। কিন্তু একটি কার্যকর সরকারের মাধ্যমে এসব আইন পুনরায় বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই আইন পাস করার সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট নিয়ে এখনো সংশয় আছে এবং তাই এ ব্যাপারে খোলাখুলি ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

এখনো অনেক কিছু সরকার পরিচালনা এবং সংবিধানের সাথে সম্পৃক্ত থাকায়, সেগুলো পাইপলাইনে অপেক্ষমাণ রয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি দুর্নীতি দমন খসড়া আইন পাস করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইউরোপীয়রা এই আইন পাস করলেই লেবাননকে ১১ বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা দেবে বলে জানিয়েছে। তাই সব পার্লামেন্ট সদস্য পার্লামেন্টের একটি অধিবেশনে বসে এই খসড়া আইনটি পাস করে দেয়ার ব্যাপারে সম্মত ও প্রস্তুত রয়েছে।

প্রত্যেক রাজনীতিক জানেন, এটা অগ্রাধিকার এবং এটা দ্রুত করতে হবে। তাই সাংবিধানিকভাবে তালগোল পাকানো বা বিশৃঙ্খল অবস্থা সত্ত্বেও কোনো চিন্তা না করেই সংসদ অধিবেশন ডাকার ব্যাপারে একটি ‘ঐকমত্য’ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট আউন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার’ গঠনের যে আহ্বান জানিয়েছেন, সে ব্যাপারেও সবাই হয়তো একমত হতে পারে। উল্লেখ্য, আমরা জানি ১৯৪৩ সালে লেবাননী পক্ষগুলোর মধ্যে যে চুক্তি হয় সে অনুযায়ী লেবাননের প্রধান প্রধান গোষ্ঠী- খ্রিষ্টান, সুন্নি মুসলিম এবং শিয়া ও দ্রুজদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া হয়।

ম্যারিনাইট খ্রিষ্টান প্রেসিডেন্ট মিসেল আউন নতুন সরকার গঠনে ফ্যাক্টর। এ ছাড়া, ইরান সমর্থিত লেবাননী গ্রুপের পক্ষ থেকেও হারিরিকে বিভিন্ন দাবিতে চাপ দেয়া হচ্ছে। দামেস্ক ও তেহরানের এসব দাবি পূরণ করেই হারিরিকে হয়তো সরকার গঠনে এগোতে হবে। হারিরি আঞ্চলিক কৌশল সামনে রেখে বিশেষত হিজবুল্লাহর সবুজ সঙ্কেত পেলেই সরকার গঠন করতে সক্ষম হবেন বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে।


আরো সংবাদ